ফিরে দেখা

জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুর আলজিয়ার্স যাত্রা

 

আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে আলজেরিয়া ছিল বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। কিন্তু আরব দেশগুলোর ওপর বিভিন্ন বিষয়ে নির্ভরশীলতার কারণে আলজেরিয়ার বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানে বিলম্বিত করেছিল। ১৯৭৩ সালে আলজেরিয়া বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের কূটনৈতিক তত্পরতা শুরু করে এবং ১৬ জুলাই স্বীকৃতি দান করে। একই বছরের ৫ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলীয় রাষ্ট্র আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে চতুর্থ জোটনিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান  যোগ দেন।

বঙ্গবন্ধু যখন বাংলাদেশ বিমানে তাঁর প্রতিনিধি দলসহ আলজিয়ার্স নগরীতে পৌঁছান, তখনো সম্মেলন শুরু হতে একদিন বাকি। এর মধ্যেই রাজধানী আলজিয়ার্স এক উত্সবমুখর নগরীতে পরিণত হয়েছিল। প্রতি ঘণ্টায় বিমানবন্দরে বিভিন্ন দেশের ভিআইপিরা এসে অবতরণ করছিলেন। বিমানবন্দরে উড়ছিল বাংলাদেশসহ ৯২টি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের জাতীয় পতাকা। বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে প্রেসিডেন্ট বুমেদিন দারুণভাবে সংবর্ধনা জানান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। পরদিন স্থানীয় পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত ছবিগুলোর মধ্যে বঙ্গবন্ধু-বুমেদিনের কোলাকুলির ছবি প্রাধান্য পেয়েছিল।

আলজিয়ার্স নগরীর উপকণ্ঠে এক বিশাল কনফারেন্স হলে নির্দিষ্ট সময়ে সম্মেলন শুরু হওয়ার আগেই মোট ৯২টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রশাসনিক প্রধানরা এসে পৌঁছেছিলেন। বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ছাড়াও ছিলেন যুগোশ্লোভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো, সৌদি আরবের বাদশা ফয়সাল, মরক্কোর বাদশা হাসান, ইথিওপিয়ার সম্রাট হাইলে সেলাসি, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হাফিজ আল আসাদ, ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন, তিউনিশিয়ার প্রেসিডেন্ট হাবিবরগুইবা, মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত, লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট গাদ্দাফি, পিএলও প্রধান ইয়াসির আরাফাত, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুহার্ত, কাম্পুচিয়ার প্রিন্স রাদম সিহানুক, নাইজেরিয়ার জোমো কেনিয়াত্তা, উগান্ডার ইদি আমিন, কিউবার ফিদেল ক্যাস্ট্রো, নেপালের রাজা বীরেন্দ্র, শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েক, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী প্রমুখ।

এক অবিশ্বাস্য ধরনের নিরাপত্তা বেষ্টনীর মাঝ দিয়ে তিন ধরনের পরিচয়পত্র দেখিয়ে কর্মকর্তাদের যথাসময়ে সম্মেলন কক্ষে প্রবেশ করতে হয়েছিল। কনফারেন্স হলের অদূরেই আলজেরিয়া বিমানবাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণে একটি রানওয়েতে তিনটি মিগ যুদ্ধ-বিমান স্টার্ট নিয়ে অতন্দ্র প্রহরীর দায়িত্বে দাঁড়িয়েছিল। এছাড়াও হলের সামনে হেলিপোর্টে সবসময়ের জন্য প্রস্তুত ছিল আরো তিনটি হেলিকপ্টার। সম্মেলনে যোগ দেওয়া কোনো ভিভিআইপিকে ইসরায়েলি কিংবা অন্য কারো অপহরণের সম্ভাব্য প্রচেষ্টা ব্যর্থ করার লক্ষ্যে এই অতিরিক্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা।

সম্মেলনের শুরুতেই বিভিন্ন দেশের নেতাদের পরিচয় করিয়ে দেন সম্মেলনের সভাপতি ও আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বুমেদিন। একজন করে নেতা মঞ্চে এসে দাঁড়ানোর পর প্রেসিডেন্ট বুমেদিন ছোট্ট বক্তৃতায় তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে হলে উপস্থিত সমস্ত প্রতিনিধি করতালি দিয়ে উষ্ণ অভিনন্দন জানান। পিএলও প্রধান ইয়াসির আরাফাতের পরিচিতির সময় করতালি দীর্ঘস্থায়ী হয়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের পরিচিতির সময় সম্মেলন কক্ষে অবতারণা হয় এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের। মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাঙালি পোশাকে শ্বেতশুভ্র পাজামা-পাঞ্জাবি আর কালো মুজিব কোট পরিহিত প্রায় ছ ফুটের এক হিমাচল সদৃশ ব্যক্তিত্ব শেখ মুজিব। মুখে শিশুর হাসি। সম্মেলন কক্ষের প্রতিটি মানুষ আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে চলছিল, সে করতালি যেন আর থামার নয়। এভাবেই সেদিন বিশ্বনেতারা বাঙালি নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে জানান প্রাণঢালা সংবর্ধনা। তিন মিনিটের বেশি সময় ধরে করতালির পর প্রেসিডেন্ট বুমেদিনের ইশারায় সবাই আবার আসন নিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আলজিয়ার্সে জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে যোগদান ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। এটি তার মুসলিম বিশ্বের প্রতি পররাষ্ট্রনীতির একটি মাইলফলকও বটে। এ সম্মেলনে বিশ্বের শান্তি আন্দোলন এবং পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক জোটের বাইরে একটি শক্ত জোরালো নিরপেক্ষ অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু মুসলিম বিশ্বের মনোযোগ কাড়তে সক্ষম হন। পাকিস্তানের মিথ্যা প্রচারণায় মুসলিম বিশ্ব বাংলাদেশ সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করত। বঙ্গবন্ধু মুসলিম বিশ্বের নেতাদের বাংলাদেশ সম্পর্কে সঠিক তথ্য ও ধারণা প্রদান করেন। এ সম্মেলনের পরপরই অনেক মুসলিম দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বুমেদিনের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক দুটি রাষ্ট্রের বন্ধুত্বকে আরো সুদৃঢ় করে। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লাহোরে অনুষ্ঠিত ওআইসির সম্মেলনে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের ব্যাপারে বুমেদিন মধ্যস্থতা করেন। বুমেদিনের সৌজন্যে ১৯৭৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২২ জন প্রতিনিধি নিয়ে আলজেরিয়ার বিশেষ বিমানে লাহোরে ওআইসির সম্মেলনে যোগ দেন। সম্মেলনের পরেই ১৯৭৪ সালের ৮ মার্চ বুমেদিন বঙ্গবন্ধুর আমন্ত্রণে বাংলাদেশ সফর করেন।