অবশেষে কলকাতার আকাশে মেঘ কাটতে শুরু করেছে। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ছে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসের সুপ্রিমো মমতা ব্যানার্জির। কারণ মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার ছয় মাসের মধ্যে তাকে উপনির্বাচনে জয়ের বৈতরণী পার হতেই হতো। সেই উপনির্বাচনে জয়ের শেষ দিনক্ষণ ছিল ৫ নভেম্বর। ইতিমধ্যে চার মাস পার হয়ে গেছে। হাতে বাকি ছিল দুই মাস। আর তখনই সুখবর পেলেন মমতা ব্যানার্জি। নির্বাচন কমিশন শুধু মমতার জন্য একটি উপনির্বাচনের জন্যই দিনক্ষণ ধার্য করেছে। মমতা কলকাতার ভবানীপুর কেন্দ্রে উপনির্বাচনে প্রার্থী হবেন, আর সেই কেন্দ্রে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর। ফলাফল ঘোষণা করা হবে ৩ অক্টোবর। অর্থাত্ ৫ নভেম্বরের ডেডলাইনের অনেক আগেই মমতা বিধায়ক নির্বাচিত হয়ে মুখ্যমন্ত্রী পদে বহাল থাকার সুযোগ পাচ্ছেন।
পশ্চিমবঙ্গের পত্রপত্রিকায় বলা হয়েছে, ইতিপূর্বে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিব নির্বাচনের কাছে আর্জি জানিয়েছিলেন যে, অতি শীঘ্রই অন্তত একটি উপনির্বাচন না হলে পশ্চিমবঙ্গে ‘সাংবিধানিক সংকট’ তৈরি হবে। যদিও এই সাংবিধানিক সংকটের কথা অনেকেই মানতে চান না। যেমন পশ্চিমবঙ্গের সিপিআই (এম) সাংসদ বিকাশ ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘সাংবিধানিক সংকট হওয়ার কোনো কারণ নেই। এটা তৃণমূল দলের রাজনৈতিক সংকট হতে পারে, কোনোভাবেই সাংবিধানিক সংকট হতে পারে না। ভারতের সংবিধান এত ঠুনকো নয় যে একজন-দুজনের জন্য সংবিধান সংকটে পড়বে।’ উল্লেখ করা যেতে পারে যে, গোটা ভারতের ৩১টি বিধানসভা কেন্দ্র ও তিনটি লোকসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচন বকেয়া আছে। ভবানীপুর ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের দিনহাটা, গোসাবা, শান্তিপুর ও খড়দহ—এই চার কেন্দ্রে উপনির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এক মমতার ঐ উপনির্বাচনের ঘোষণা ছাড়া নির্বাচন কমিশন আর কোথাও উপনির্বাচন করছে না। হ্যাঁ, আরো দুটো কেন্দ্রে নির্বাচন হচ্ছে, সেখানকার প্রার্থী বিধানসভা নির্বাচনের আগেই মারা গিয়েছিলেন বলে। কিন্তু সেই দুটো ‘উপনির্বাচন’ নয়।
পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারের বিশেষ অনুরোধে কেবল ভবানীপুর কেন্দ্রের ‘উপনির্বাচন’ করতে রাজি হওয়ায় তৃণমূলের বাইরের আরো অনেকেই এর বিরোধিতা করেছেন। বিজেপি রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ বলেছেন, ‘রাজ্য সরকার ভুল রিপোর্ট দিয়ে নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবিত করেছে। নয়তো বাকি চারটি আসনে উপনির্বাচন হলো না কেন?’ একই সুর শোনা গেছে পশ্চিমবঙ্গের সিপিএম ও কংগ্রেস নেতাদের গলায়। তারা বলছেন—‘আমরা নির্বাচনের পক্ষে। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীকে জিতিয়ে আনার জন্য একটি কেন্দ্রে উপনির্বাচন হবে, আর বাকি চারটি আসনে হবে না কেন?’ মমতাকে পরাজিত করা সাবেক তৃণমূল ও বর্তমান বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, ‘বিজেপির কথায় চলে না নির্বাচন কমিশন। কিন্তু এটাই তৃণমূল বরাবর বলে এসেছে। আমরা কখনো উলটোটা বলিনি যে, তৃণমূলের কথায় চলে কমিশন। কী এমন কারণে শুধু ভবানীপুরে উপনির্বাচন করতে হবে তার উত্তর কমিশনই দিতে পারবে।’
এসব বিষয় নিয়ে যতই তর্কবিতর্ক হোক, ভবানীপুর কেন্দ্রে উপনির্বাচন ঘোষণা নিঃসন্দেহে তৃণমূলের জন্য অত্যন্ত স্বস্তির ঘটনা। মাত্র এক সপ্তাহ আগেও তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য এক অনিশ্চিত বাতাবরণ তৈরি হয়েছিল। দৈবদুর্বিপাকে পড়ে মমতা সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচনে হেরে গিয়েছিলেন তার দলেরই বিদ্রোহী প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে। মমতা হারলেও ২১৩ আসনে জয় লাভ করেছিল তৃণমূল কংগ্রেস, এর বিপরীতে বিজেপি পেয়েছিল মাত্র ৭৭টি আসন। এর পরও মমতার মনে শান্তি ছিল না একবিন্দু। কারণ, তিনি ব্যক্তিগতভাবে বিধানসভা নির্বাচনে হেরে মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিতে পারলেও ভারতের সংবিধান অনুযায়ী মমতাকে শপথ গ্রহণের ছয় মাসের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের যে কোনো একটি বিধানসভা আসন থেকে উপনির্বাচন জয়ী হয়ে আসতেই হবে। আর সেই থেকে ‘ছয় মাস সময়কাল’টি মমতার জন্য গলার কাঁটা হয়ে উঠেছিল। কারণ, করোনার কারণে ছয় মাসের মধ্যে উপনির্বাচন না হওয়ার সমস্ত সম্ভাবনা মজুত ছিল। একই সঙ্গে তৃণমূলের অভিযোগ ছিল, পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দল বিজেপি কিছুতেই চাইছিল না, ৫ নভেম্বরের আগে উপনির্বাচন হোক। মাত্র সপ্তাহখানেক আগে বিজেপির অন্যতম শীর্ষ নেতা তথাগত রায় টুইট করে বলেছিলেন—‘রাজ্যে দৈনিক সংক্রমণ (করোনা) বাড়ছে। এখন উপনির্বাচন কেন? সেপ্টেম্বরে তো বন্যা হবেই! অক্টোবরে দুর্গাপুজো। নভেম্বর মাসের ৪ তারিখে কালীপুজো, ৬ তারিখে ভাইফোঁটা, ১০ তারিখে ছটপুজো, ১৩ তারিখে জগদ্ধাত্রী পূজা। এসব পার করে উপনির্বাচন, পুর নির্বাচন (পৌরসভার নির্বাচন), সব হোক!’ পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষও বলেছিলেন—‘রাজ্যে শতাধিক পুরসভা ও পুরনিগমে এতদিন কোনো ভোট হয়নি। বিধানসভা উপনির্বাচন নিয়ে এত তাড়া কীসের? কোভিড বাড়লেও তৃণমূল নির্বাচন চাইছে। অথচ বিশেষজ্ঞরা সচেতন থাকতে বলছেন।’
অর্থাত্ বিজেপির নেতারা কিছুতেই চাইছিলেন না এখনই উপনির্বাচন হোক। অন্তত পক্ষে ৫ নভেম্বরের আগে। কিন্তু ভারতের নির্বাচন কমিশন দলনিরপেক্ষ ভূমিকা সব সময়ই পালন করে থাকে। এবারও তার প্রমাণ মিলল। সংসদীয় গণতন্ত্রের হিসাবে ভারত পৃথিবীর বৃহত্তম। অন্যান্য দেশের তুলনায় ভারতে প্রাপ্তবয়স্ক ভোটারের সংখ্যা অন্য যে কোনো দেশের চেয়ে বেশি। কিন্তু জনসংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করতে গিয়ে সমস্যার সম্মুখীনও হতে হয় বেশি। ঠিক সেখানেই প্রয়োজন পড়ে একটি নিরপেক্ষ, দায়িত্বশীল ও কার্যকরী নির্বাচন কমিশনের। প্রকৃতপক্ষে, একটি দেশের গণতন্ত্রের শক্তির অন্যতম প্রধান দিক হলো দেশটির নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা। ভারতে নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করা হলেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্তৃত্ব নিজের হাতে নিয়ে নেন। নির্বাচন কমিশনের হাতে অবাধ্য বা অমান্যকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের শাস্তির ক্ষমতা, বদলি করে দেওয়ার শক্তি থাকে এবং কমিশন সেটা পালনও করে থাকে। স্পষ্টতই নির্বাচন কমিশন ভারতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। লক্ষণীয় বিষয় হলো যে, ভারতেও ক্ষমতাসীন সরকারের সুপারিশেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দিয়ে থাকলেও দেশটির রাজনৈতিক নেতাদের প্রজ্ঞা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিত শক্ত থাকার কারণে নির্বাচন কমিশন আস্থার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ভারতের গণতন্ত্রের অপার সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর মধ্যে।
আবার মমতার উপনির্বাচনের প্রসঙ্গে ফেরা যাক। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আসন্ন ৩০ সেপ্টেম্বরের নির্বাচনের মাধ্যমে মমতার রক্তচাপ ক্রমশ স্বাভাবিক হতে যাচ্ছে। ভোট ঘোষণার তারিখ প্রকাশিত হতেই কলকাতার ভবানীপুরে মমতার পক্ষে ব্যানার, হোর্ডিং, ফ্লেক্স লাগানোর ধূম পড়ে গেছে। তৃণমূল নেতাকর্মীরা মনে করছেন—মমতার ভোটজয় এখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র। ভবানীপুরের অতীত পরিসংখ্যানও সে কথাই বলছে। ভবানীপুর কেন্দ্রে ২০১১ সাল থেকে জয়লাভ করতে একেবারেই বেগ পেতে হয়নি তৃণমূল কংগ্রেসকে। ২০১১ সালে ভবানীপুর কেন্দ্রে তৃণমূলের সুব্রত বক্সি ৬৪.৭৭ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। নিকটতম সিপিএম পেয়েছিল মাত্র ২৭.৯৭ শতাংশ ভোট। ২০১১ সালে বিধানসভা নির্বাচন জিতে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল। প্রথমবার সরকার গড়ে ঠিক সেই বছর। তখন মমতা ব্যানার্জি ছিলেন লোকসভার সাংসদ। তিনি ইস্তফা দিয়ে এই ভবানীপুর কেন্দ্রে উপনির্বাচনে বিধায়ক পদে লড়ে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েই মুখ্যমন্ত্রী হন। এরপর ২০১৬ সালে ফের সেই কেন্দ্রেই প্রার্থী হন মমতা। তখনো পেয়েছিলেন বিপুল ভোট।
২০২১ সালে এই কেন্দ্র ছেড়ে মমতা জেদবশত শুভেন্দুর বিপরীতে দাঁড়িয়েছিলেন নন্দীগ্রাম কেন্দ্রে এবং অল্প ব্যবধানে হেরে যান। আর ভবানীপুরে এবার দাঁড়িয়েছিলেন শোভন চট্টোপাধ্যায়। তিনি বিজেপি প্রার্থীকে যথারীতি বিপুল ভোটে পরাজিত করেন। অর্থাত্ ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের যা ট্রেন্ড, তাতে দেখা যাচ্ছে ২০১১ থেকেই এখানে অন্তত ২৫ হাজার ভোটে জিতেছে তৃণমূল প্রার্থী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না। আর প্রার্থী যেহেতু খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি, সুতরাং এখন থেকেই ফলাফল স্পষ্ট দেখছেন অনেকেই।
তবে অনেকেই মনে করেন, ৫ নভেম্বরের আগে ভোটে এত বিব্রতকর অবস্থা হতো না, যদি এবার হেরে যাওয়ার পরও মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ না নিতেন মমতা ব্যানার্জি। এতে তার স্বকীয় ও আপসহীন ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল হতো বলেই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে বিদ্বজ্জনেরা মনে করছেন, পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা এই উপমহাদেশের অতীতের অনেক উত্তাল ঘটনা মনে করিয়ে দেয়। এজন্য পশ্চিমবঙ্গের দিকে উপমহাদেশের সচেতন মহলের তীক্ষ নজর রয়েছে।
মাটিভাঙা, পিরোজপুর