করোনা কি সিনডেমিক হয়ে উঠেছে?

বিগত বছরের মার্চ থেকে দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়েছে করোনা; কখনো নিজের বা পরিবারের সামান্য উপসর্গ, কখনো প্রিয়জনের করোনায় আক্রান্ত সংবাদ কখনো বা মৃত্যুসংবাদ আতঙ্কিত করে তুলেছে পুরো বিশ্বকে। কোভিড-১৯ একটি ভাইরাসজনিত রোগ কিন্তু এ রোগটির ব্যাপ্তি এতই বেশি যে তা শারীরিক স্বাস্থ্যের বিপন্নতাকে অতিক্রম করে মানসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিকভাবে আমাদের বিপর্যস্ত করে ফেলছে। সেপ্টেম্বর ২০২০-এ ল্যানসেটের সম্পাদক ড. রিচার্ড হর্টন তার ‘কোভিড-১৯ ইজ নট আ প্যানডেমিক’ শীর্ষক বিশেষ নিবন্ধে বলেছেন, কোভিড-১৯ বৈশ্বিক প্যানডেমিক নয়, বরং এটি সিনডেমিক। কমপক্ষে দুই ধরনের রোগ বা সমস্যা যদি মহামারি হিসেবে আবির্ভূত হয়ে কোনো বিপুলসংখ্যক মানুষের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তাহলে তাকে সিনডেমিক বলা যায়। মহামারির কারণে আর্থসামাজিক বড় ধরনের পরিবর্তনও সিনডেমিক হতে পারে।

এপ্রিল ২০২১ সালে ল্যানসেটে প্রকাশিত এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী করোনা থেকে সেরে ওঠার প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই প্রতি তিন জনে এক জনের মধ্যে এমন মানসিক সমস্যা দেখা গেছে, যেটার চিকিত্সা প্রয়োজন। প্রায় ১৭ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশের মধ্যে অতি উদ্বেগ, ১৪ শতাংশের মধ্যে মুড ডিসঅর্ডার আর ১.৫ শতাংশ থেকে ২.৭ শতাংশের মধ্যে গুরুতর মানসিক রোগ (সাইকোসিস) দেখা গেছে। করোনার মনঃসামাজিক প্রভাব এত এত বেশি যে, এটি প্যানডেমিককে অতিক্রম করে সিনডেমিক হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যারা কাজ করেন তারা জানিয়েছেন যে, কিছু বদ্ধমূল সামাজিক ধারণার কারণে এখনো অনেকেই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে পেশাদার চিকিত্সকের শরণাপন্ন হতে চান না। বাংলাদেশে ২০১৮ সালে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক জাতীয় জরিপে দেখা যায়, দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মানসিক রোগের হার ১৮.৭ শতাংশ। এর মধ্যে ৬.৭ শতাংশ বিষণ্নতা আর ৪.৭ শতাংশ ছিল অ্যাংজাইটি সমস্যা। কোভিডকালে বাংলাদেশে পরিচালিত কিছু গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রায় ৩৩ শতাংশের মধ্যে অ্যাংজাইটি আর ৪৬ শতাংশের মাঝে বিষণ্নতার লক্ষণ পাওয়া গেছে। অর্থাত্ সাধারণ সময়ের চেয়ে কোভিডকালে মানসিক সমস্যা বাংলাদেশেও বেড়ে যাচ্ছে। গত এক বছরে বাংলাদেশে আত্মহত্যা ঘটেছে প্রায় ১৪ হাজার, যা বিগত বছরের চেয়ে বেশি।

করোনা সংক্রমণের আতঙ্ক, চিকিত্সা নিয়ে অনিশ্চয়তা, মৃত্যুভয়, অর্থনৈতিক বিপর্যস্ততা, বেকারত্ব, করোনা নিয়ে ভ্রান্ত-নেতিবাচক সামাজিক বৈষম্যের কারণে বাড়ছে মানসিক সংকট। আর করোনা চিকিত্সায় নিয়োজিত সকল পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রভাব পড়ছে শিশু-কিশোর আর তরুণদের ওপরেও। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, জীবন যাত্রার রুটিন পরিবর্তন, আত্মীয়স্বজন বন্ধুদের সান্নিধ্য না পাওয়ায় তাদের মানসিক বিকাশ বিঘ্নিত হচ্ছে, বাড়ছে অনলাইন আসক্তি। অনাগ্রহ সত্ত্বেও পারিবারিকভাবে বিয়ের চাপ, বেকারত্বের প্রভাব তরুণ-তরুণীদের মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসমস্যার তুলনায় চিকিত্সা ও চিকিত্সক কম। মহামারির কারণে মানসিক চিকিত্সাও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের বহির্বিভাগে মহামারি শুরুর আগে দৈনিক গড়ে ৩০০ রোগী চিকিত্সার জন্য আসত। এখন তা অর্ধেকের কম বলে জানিয়েছে ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষ। মহামারি শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সি মানুষকে নতুন বাস্তবতা, নতুন মানসিক সংকটের মধ্যে ফেলেছে। এই বাস্তবতায় অফিসের কাজ করতে হচ্ছে ঘরে বসে। শিশুরা স্কুল করছে বাড়িতে। এই ভয় দূর করে নতুন ব্যবস্থায় সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পেরে অনেকে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছেন বলে ধারণা করছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা। যেখানে স্বাভাবিক অবস্থাতেই এ দেশের মানুষ তাদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে চাইত না, সেখানে মহামারিকালীন এত পরিমাণে মানসিক বিপর্যয় কীভাবে সামলে স্বাভাবিক জীবন যাপনে ফিরে আসবে, তা আসলেই উদ্বেগের বিষয়।

এদিকে করোনাবিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটিও করোনাকালে মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে সরকারকে পরামর্শ দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কমিটি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির খতিয়ান তৈরি করেছে, পজিটিভ রোগীদের রিপোর্ট দেওয়ার সময় মুঠোফোনে কাউন্সেলিং করার সিদ্ধান্ত হয়েছে, চিকিত্সকদের জন্য নির্দেশিকা তৈরির কাজ চলছে।

এভাবে ছোট ছোট উদ্যোগের মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ও মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে সরকার করোনার টিকা দেওয়ার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করলে এবং নিজেদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে আমরা করোনা পরবর্তী সময়ে খুব দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব বলে আশা রাখি। তাই অবহেলা না করে একে অপরের পাশে থেকে মহামারিকে জয় করে সুস্থ জীবনে দ্রুত ফিরে আসাই হোক আমাদের লক্ষ্য।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা