২০১৯ সালের শেষের দিকে করোনা মহামারি দেখা দিলে ধস নামে বিশ্ব অর্থনীতিতে। দফায় দফায় লকডাউনে গৃহবন্দি হয়ে পড়ে কোটি কোটি মানুষ। থেমে যায় ব্যবসায়-বাণিজ্য, কলকারখানা, যোগাযোগব্যবস্থা। বাংলাদেশও বাদ পড়েনি করোনার ভয়াল থাবা থেকে। অন্যান্য দেশে করোনা মহামারি সহনীয় পর্যায়ে এলেও বাংলাদেশ কবে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাবে তা বলা মুশকিল। বাংলাদেশ এমনিতে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ। বিশাল সংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করে, তার ওপর করোনা মহামারি মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনায় কাজ হারিয়ে অনেকে হয়েছেন নিঃস্ব। অনেকে ব্যবসার ক্ষতি পোষাতে না পেরে হয়েছেন দেউলিয়া। তবে করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি। মহামারিতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ত্রাণসহায়তায় এগিয়ে এলেও মধ্যবিত্তরা লোকলজ্জার ভয়ে থেকেছেন আড়ালে। বড় বড় ব্যবসায়প্রতিষ্ঠান সরকারি সুবিধা পেলেও ছোট ছোট ব্যবসায়প্রতিষ্ঠানকে সরকারি সুবিধার আওতায় আনা যায়নি। মূলধনের অভাবে করোনার ক্ষতি কাটিয়ে নতুন করে পুনরায় ব্যবসা শুরু করতে পারছেন না অনেকে, ফলে বাধ্য হয়ে ব্যবসায়প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। ১৭ মাস ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও দিতে হচ্ছে স্কুল-কলেজের ফি। পরিবারের ভরণপোষণের খরচ চালাতে গিয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারের সঞ্চয় ফুরিয়ে নিতে হয়েছে ঋণ। ঋণের কিস্তির সঙ্গে সুদ বহন করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে মধ্যবিত্ত পরিবারকে। করোনা কালীন সময়ে অনেকে হারিয়েছেন চাকরি। বিআইডিএসের জরিপ অনুযায়ী বলা হয়, করোনায় ১ কোটি ৬৪ লাখ মানুষ নতুন করে গরিব হয়েছেন, দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের হিসাবে, করোনার কারণে বাংলাদেশে চাকরি হারানোর তালিকায় যুক্ত হতে পারেন অন্তত দেড় কোটি মানুষ। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি চাকরি হারিয়ে পরিবারের তিন বেলা আহার জোটাতে অক্ষম হয়ে পড়েছেন অনেকে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় অংশ আসে রেমিট্যান্স থেকে। করোনাকালীন সময়ে অনেকে ছুটিতে দেশে এসে আটকে পড়েছেন। ভ্যাকসিন নিতে না পারায় অনেকে ভুগছেন অনিশ্চয়তায়। করোনায় কর্মী ছাঁটাইয়ে অনেকে চাকরি হারিয়ে হয়ে পড়েছেন বেকার। প্রবাসীদের একটি বিশাল অংশ আসে মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে। কয়েক মাসে চাকরি হারিয়ে এবং ভিসা জটিলতায় দেশে ফিরে এসেছেন প্রায় ৩০ হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি। অনেকের আবার আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে ফিরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
উচ্চবিত্ত, নিম্নবিত্তের পাশাপাশি মধ্যবিত্তের দিকে সরকারের বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। কারণ দেশের অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার সব হারিয়ে পথে বসেছে। না পারছেন নিজের টাকায় কিনে খেতে, না পারছেন কারো কাছে চাইতে। এই মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে দেশের করের একটি বড় অংশ আদায় হয়। এদের ক্ষুদ্র সঞ্চয় থেকে গড়ে ওঠা ছোট ছোট ব্যবসাতে তৈরি হয় কর্মসংস্থানের। এদের ব্যাংকে জমানো ক্ষুদ্র সঞ্চয় দিয়ে বড় বড় কোম্পানির লোনের টাকার যোগান দেয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। তাই এই শ্রেণির দিকে নজর দেওয়া না গেলে দেশের অর্থনীতিতে চরম বিপর্যয় নেমে আসবে। সরকারের উচিত করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করার জন্য বিনা সুদে বা কম সুদে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঋণসুবিধা দেওয়া। প্রবাসীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা প্রদানসহ সব জটিলতা কাটিয়ে যাতে তাড়াতাড়ি নিজ কর্মস্থলে যোগদান করতে পারেন তার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া। সর্বোপরি যারা লোকলজ্জার ভয়ে সাহায্য নিতে পারছেন না স্থানীয় সরকার বা ইউনিয়ন পর্যায়ের মাধ্যমে তাদের সবাইকে সাহায্যের আওতায় নিয়ে আসা।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া