প্রশ্নবিষয়ক জটিলতা ও আদিখ্যেতা

মানুষই একমাত্র প্রাণী যে সাজিয়ে-গুছিয়ে কথা বলতে পারে এবং প্রশ্ন করে। মানুষ ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোনো প্রাণী কথাও বলতে পারে না, প্রশ্নও করে না। মানুষ কেন প্রশ্ন করে, নিঃসন্দেহে সেটা একটা বড় প্রশ্ন। সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে, কৌতূহল নিবারণের জন্যই মানুষ প্রশ্ন করে থাকে। কারণ মানুষের আছে আদম্য কৌতূহল, সবকিছু জানা বোঝার অফুরন্ত বাসনা। এটা কী, ওটা কেন, এটা এমন হলো কেন, ওটা অমন হলো কেন ইত্যাদি হাজার রকম প্রশ্ন মানুষের মাথায় সারাক্ষণ কিলবিল করতে থাকে। এক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে না পেতেই আরো অনেক প্রশ্ন এসে ভিড় জমায়। মানুষের জীবনটা আসলে অন্তহীন প্রশ্ন আর এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়ার চেষ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। যদিও এক জীবনে সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না।

এটা ছলিম উদ্দিন, কলিম উদ্দিনের জীবনে যেমন সত্য; আইনস্টাইন, রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও সত্য। পৃথিবীতে কেউই কখনো সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পায় না। তার পরও কিন্তু মানুষ প্রশ্ন করার অভ্যাস ত্যাগ করে না। সবাই সারাক্ষণ প্রশ্ন করেই চলে। অজস্র, অসংখ্য বিচিত্র সব প্রশ্ন। কিছু কিছু প্রশ্ন আছে, যেগুলো খুবই সাধারণ, একেবারে দৈনন্দিন এবং সাদামাটা। যেমন, আমরা একজন আরেক জনকে দেখলেই জানতে চাই, কেমন আছেন? কোথায় যাচ্ছেন, কেমন চলছে, কী খবর কিংবা পরিবারের সবাই কেমন আছে ইত্যাদি। এ প্রশ্নগুলো এখন সৌজন্য বা ভদ্রতার উপকরণে পরিণত হয়েছে। এসব প্রশ্ন যারা করেন, তারা কিন্তু উত্তরটা জানার ব্যাপারে বড় বেশি আগ্রহী হন না। এসব প্রশ্নের উত্তর জেনে কারো কোনো সুবিধা বা লাভ নেই। যাকে এ জাতীয় প্রশ্ন করা হয়, সেও কিন্তু জানে যে তার কাছে যা জানতে চাওয়া হয়েছে, তা শুধু বলার জন্য বলা। সে ভীষণ কষ্টে বা অভাবে থাকলেও এবং তা বললেও প্রশ্নকারীর দিক থেকে কোনো সাহায্য-সহযোগিতা বা সহমর্মিতা পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই তো শত কষ্টে থাকলেও মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে আমরা দায়সারা উত্তর দিই—এই তো, ভালোই আছি, এক রকম চলে যাচ্ছে, সবাই মোটামুটি ভালো আছে ইত্যাদি। এসব প্রশ্ন করা বা না করার কোনো মানে নেই। যথার্থ উত্তরও কেউ দেন না। তার পরও এ ধরনের প্রশ্ন এবং উত্তর আমরা চালিয়ে যাই।

আবার কিছু কিছু প্রশ্ন আছে, যা মোটেও নিরীহ বা সাধারণ নয়, যথেষ্টই বিব্রতকর; জেনেবুঝেও আমরা অনেকে তেমন প্রশ্ন করি। অন্যকে বিব্রত করার জন্য অত্যন্ত সচেতনভাবেই অবশ্য আমরা এমন প্রশ্ন করে থাকি। যেমন কারো ছেলে বা মেয়ে পরীক্ষায় ফেল করার খবর নিশ্চিতভাবে জানার পরও আমরা ঐ অভিভাবককে জিগ্যেস করি, আপনার ছেলেকে যে কদিন ধরে দেখছি না? ওর অসুখ করেনি তো? হ্যাঁ ও যেন কী পড়ছে? অথবা সদ্য যার বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে, এমন কাউকে আমরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে খুঁজে বের করে জিগ্যেস করি, কী খবর ভাই, ভাবির শরীরটা ভালো তো? এদিকে বউয়ের শরীরটা আবার ইদানীং ভালো যাচ্ছে না। ডায়াবেটিস, সঙ্গে হাইপ্রেশার। বড় বিপদে আছি ভাই। সকাল-বিকেল হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে। তা ভাবিকে নিয়ে বাসায় আসুন না! ভাবির মিষ্টি হাসি কত দিন দেখি না। ভাবি বিষয়ে এমনি অজস্র অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রিয় প্রশ্ন আর আদিখ্যেতা দিয়ে সেই ব্যক্তিকে জর্জরিত করে ফেলি। এর মধ্য দিয়ে আমরা একধরনের বিকৃত আনন্দ পাই।

আবার কিছু প্রশ্ন আছে, যেগুলো সহজে উত্তর দেওয়া যায় না। কোনো যৌক্তিক পরিণতি টানাও কখনো সম্ভব হয় না। যেমন মানুষের জন্ম ও মৃত্যুরহস্য। ঈশ্বরের অস্তিত্ব। কিংবা বাঙালির ভবিষ্যত্। এসব প্রশ্ন নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন, বছরের পর বছর এমনকি যুগের পর যুগ তর্ক করে কাটিয়ে দেওয়া যায়; কিন্তু সর্বজনগ্রাহ্য কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না।

প্রশ্ন করা অবশ্যই ভলো জিনিস। যদিও সব সময় সবাইকে সব ধরনের প্রশ্ন করা সংগত নয়। এতে বিপত্তি বাড়ে। অনেক সময় অনেক প্রশ্ন কষ্ট বয়ে আনে। মনোমালিন্য, ঝগড়া-ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে। মনঃকষ্টও বাড়ায়। তবু আমরা চুপ করে থাকি না, চুপ থাকতে পারি না। প্রশ্ন করি। যে প্রশ্ন করি সে প্রশ্নের উত্তরও অনেক সময় আমাদের জানা থাকে। তবু করি। যাকে প্রশ্ন করি, তার মনোভাবটা একটু ঝালিয়ে নিতে চাই। প্রশ্ন করার মাধ্যমে তাকে সতর্কও করি অনেক সময়।

আমাদের জীবনে বিভিন্ন প্রশ্নের মাজেজা বিভিন্ন রকম। বাবা যখন বলেন, কোথায় গিয়েছিলে? সে প্রশ্নের তাত্পর্য একরকম। শিক্ষক যখন বলেন পড়া করোনি কেন? এর ভাব এক রকম। প্রেয়সী যখন বলে, আমরা কবে বিয়ে করব? এর মানে আরেক রকম। স্ত্রী যখন বলে, তোমার কি আজও ফিরতে দেরি হবে? এর মানে আরেক রকম? আবার স্নেহময়ী মা যখন বলেন, বাবা তুই কবে আসবি? এ প্রশ্নের গুরুত্ব, তাত্পর্য ও মানে আরেক রকম।

আমরা কমবেশি সবাই প্রশ্ন করি, প্রশ্নের সম্মুখীন হই। প্রশ্নের যথার্থ জবাব দিতে পারাটাই কৃতিত্ব বা যোগ্যতা। সবাই তা পারে না। লেখাপড়া বা চাকরির কথাই ধরা যাক। পরীক্ষায় যে যত বেশি, ঠিক এবং ভালোভাবে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, তার রেজাল্ট তত বেশি ভালো হয়। চাকরিক্ষেত্রেও একই অবস্থা। প্রশ্নের জবাব দিতে পারার ক্ষমতা বা যোগ্যতার ওপরই নির্ভর করে চাকরি পাওয়া কিংবা না পাওয়া। আমাদের দেশে অবশ্য চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে মেধা, যোগ্যতা, প্রশ্নের উত্তর সঠিকভাবে দেওয়ার ক্ষমতার চাইতে ঘুষ, দলীয় বিবেচনা, তদবির ও আত্মীয়তন্ত্র অধিক গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেটা অবশ্য ভিন্ন প্রসঙ্গ।

সবাই যেমন সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না, ঠিক তেমনই সবাই প্রশ্ন করতেও পারে না। প্রশ্ন করার মধ্যেও মুনশিয়ানা আছে, কৃতিত্ব আছে। মোক্ষম সময়ে মোক্ষম প্রশ্ন করতে পারাটা নিঃসন্দেহে একটি বড় গুণ। হাজার প্রশ্ন করেও যে উত্তর পাওয়া যায় না, মোক্ষম একটি প্রশ্নের মাধ্যমেই তা বের করে আনা সম্ভব। যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিরা এমন দু-একটি প্রশ্নতেই বাজিমাত করেন।

এমন কিছু প্রশ্ন আছে, যা মানুষকে ভীষণভাবে অপ্রস্তুত করে—এ কথা আগেই বলা হয়েছে। অনেকে অবশ্য বুদ্ধি খাটিয়ে এসব প্রশ্ন তৈরি করেন আরেক জনকে বিব্রত করার জন্য। যেমন এক চতুর ব্যক্তি ভরা মজলিসে এক ভদ্রলোককে বলেছিলেন, আপনি কি বউ পেটানো ছেড়ে দিয়েছেন? হ্যাঁ অথবা না বলুন। এ প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে ভদ্রলোকের অবস্থাটা কী হয়েছিল তা সহজেই অনুমেয়।

যাহোক, প্রশ্ন নিয়ে অনেক কথাই বলা হলো। এসব প্যাঁচালের কোনো মানে নেই। অবশ্য আমাদের জীবনে অনেক কিছুরই কোনো মানে নেই। এত কষ্ট করে বেঁচে থাকারই-বা কী মানে আছে বলুন? তার পরও আমরা বাঁচি, বাঁচার জন্য মরণপণ সংগ্রাম চালিয়ে যাই। আসুন, আমরা অবান্তর বা ফাউ প্রশ্ন করা অবান্তর কথা বলা ছেড়ে দিয়ে বৃক্ষের মতো বাঁচার সাধনা করি। তাহলে অন্তত টিভি চ্যানেলগুলো টকশোর পরিবর্তে নাচ বা গানের অনুষ্ঠান দেখাতে বাধ্য হবে। আর মোবাইল কোম্পানিগুলোও কথার ওপর চার্জ বসিয়ে আমাদের রক্ত জল করা টাকাগুলো হাতিয়ে নিতে পারবে না। শব্দদূষণও তাতে কমবে।

পুনশ্চ : সাংবাদিকের কাজ হচ্ছে, প্রশ্ন করে তথ্য বাগিয়ে আনা। কর্তাব্যক্তিদের মোক্ষম প্রশ্ন করতে পারাটা সাংবাদিকতার একটা বড় যোগ্যতা। তবে প্রশ্নের মাধ্যমে কাউকে বিভ্রান্ত করে সাংবাদিকরা কোনো কোনো সময় ‘ভিন্ন কিছু’ও বের করে আনেন। যদিও সেটা অপসাংবাদিকতা। এ প্রসঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধকালের একটি গল্প মনে পড়ছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গেছেন আমেরিকা সফরে। এয়ারপোর্টে সাংবাদিকরা তাকে ঘিরে ধরল। একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করল, ‘আমরা জানি, ক্রেমলিনে যৌনপল্লি নেই। আপনি কি ওয়াশিংটনে এসে যৌনপল্লিতে যাবেন?’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জবাব দিলেন না।

আরেক জন সাংবাদিক সরাসরি প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কি ওয়াশিংটনের যৌনপল্লিতে যাবেন?’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবারও এড়িয়ে গেলেন।

তৃতীয় একজন সাংবাদিক এবার জানতে চাইলেন, ‘মিস্টার মিনিস্টার, আপনাকে ওয়াশিংটনে স্বাগত। আপনি কি ওয়াশিংটনের যৌনপল্লিতে যাবেন?’

সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী এমন বিদঘুটে প্রশ্ন শুনে ভাবলেন, সাংবাদিকরা তাকে নিয়ে মজা করছে। তিনিও পালটা মজা করে জিগ্যেস করলেন, ‘আপনাদের ওয়াশিংটনের যৌনপল্লিটা কোথায়?’

ব্যস, পরের দিন সব পত্রিকার শিরোনাম হলো, ‘ওয়াশিংটনে নেমেই সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী যৌনপল্লির খোঁজ করলেন!’

n লেখক :রম্যরচয়িতা