বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা

শ্রীলঙ্কা দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপবেষ্টিত একটি দেশ। পর্যটননির্ভর এ দেশ অর্থনৈতিকভাবে এখনো সুনাম অর্জন করতে পারেনি। অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির হার অনেক কম যা বংলাদেশ থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। সাম্প্রতিক সময়ে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপক্ষে বিভিন্ন দেশের প্রধানদের কাছে আর্থিক সহযোগিতা চেয়ে হাত বাড়িয়েছেন। বিগত মার্চ মাসে মাহিন্দা রাজাপক্ষে ঢাকায় আগমন উপলক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে ছয়টি দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতাবিষয়ক সমঝোতা স্মারক সই হয়। শ্রীলঙ্কাতে ব্যবসা পরিচালনা ব্যয় বেশি হওয়ায় তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এ পর্যন্ত তারা ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ করেছে বাংলাদেশে। এই দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক মোটামুটি সন্তোষজনক। অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন হলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো জোরদার হবে।

অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি বিষয়ে কথাবার্তা চলছে। ২০১৮ সালে ১৩৩ মিলিয়ন এবং ২০০০ সালে শ্রীলঙ্কা থেকে ১০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য বাংলাদেশে রপ্তানি করা হয়। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, শ্রীলঙ্কার রপ্তানি আয় নেই বললেই চলে। আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য বিভিন্ন দেশ থেকে এখন ঋণ নেওয়া শুরু করেছে। ঋণ নেওয়া প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এ দুই দেশের মধ্যে কোস্টাল শিপিং চুক্তি সম্পন্ন হলে বাংলাদেশ কলম্বো বন্দর ব্যবহার করার মাধ্যমে ২৫ শতাংশ পরিবহন ব্যয় কমাতে পারবে। যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ভালো থাকায় অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রার মজুত থেকে শ্রীলঙ্কাকে ২০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ হিসেবে দিয়েছে। এ ঋণের মেয়াদ তিন মাস। অর্থাত্ তিন মাস পরে শ্রীলঙ্কা তার স্থানীয় মুদ্রায় (ডলারে নয়) সুদে-আসলে বাংলাদেশকে ফেরত দেবে। এ ঋণ যে চুক্তির মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে তাকে বলা হয় ‘কারেন্সি সোয়াপ চুক্তি’। যেসব অর্থনীতিতে প্রয়োজনের তুলনায় বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কম সেসব অর্থনীতিকে ‘কারেন্সি সোয়াপ চুক্তির’ মাধ্যমে এ ধরনের আর্থিক সহযোগিতা করা হয়। উল্লেখ্য, কারেন্সি সোয়াপ চুক্তির ধারণা সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে নতুন নয়। এটা প্রথম সূচনা করেছিল দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি ভারত। সার্ক কারেন্সি সোয়াপ সুবিধার প্রথম যাত্রা শুরু হয় ২০১২ সালের ১৫ নভেম্বর। শ্রীলঙ্কা কারেন্সি সোয়াপ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ থেকে ঋণ নেওয়ার আগে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া থেকে ৪০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ নেয়। ভালো সংবাদ এই যে, কলম্বো গত ফেব্রুয়ারি মাসে সুদে-আসলে এ ঋণ পরিশোধ করতে সক্ষম হয়েছে। এ ঋণ পরিশোধের পরপরই শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপক্ষে ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার ঋণ চেয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছিলেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার প্রস্তাব নাকচ করে দিতে বাধ্য হন। এমনকি দ্বিতীয় বারের জন্য ঋণ নবায়ন করেননি। কারণ, বর্তমানে শ্রীলঙ্কা সারা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম ঋণগ্রস্ত দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি অত্যন্ত ভঙ্গুর প্রকৃতির। ক্রেডিট রেটিং সূচকে শ্রীলঙ্কার অবস্থান অনেক নিচে। এছাড়াও চীনের কাছ থেকে শ্রীলঙ্কা ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ নিয়েছে। অথচ এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক মুদ্রার মজুত দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। চীন থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধের পর ভারত এবং বাংলাদেশের দায় প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কীভাবে পরিশোধ করবে? আমার কাছে মনে হয় শ্রীলঙ্কা ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশকে অনুরোধ করবে। এ বছরের শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে কারেন্সি সোয়াপ চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ এবং রাশিয়ার মধ্যে আমদানি-রপ্তানি ব্যয় মেটানো হবে দুই দেশের স্থানীয় মুদ্রার মাধ্যমে। এ আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে কিনা জানি না। ইতিমধ্যে চীন প্রস্তাবনা দিয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে কারেন্সি সোয়াপ চুক্তির বিষয়ে। এসব আলোচনার মূল বিষয় হলো বৈদেশিক মুদ্রার মজুত থেকে ডলারে ঋণ প্রদান করা। অর্থাত্ বৈদেশিক মুদ্রার মজুত হ্রাস পাবে। অত্যন্ত ভালো সংবাদ এই যে, বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত এখন ৪৬ বিলিয়ন ডলার। ২০১০ সালে এ মজুতের আকার ছিল মাত্র ৯ বিলিয়ন ডলার। এ মজুতের ওপর ভর করে কয়েক মাস আগে দেশের বড় বড় চলমান উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণ দেওয়ার উদ্দেশ্যে ‘বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ফান্ড’ সৃষ্টি করা হয়েছে। সরকারের এ উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই। কারণ এখানে কোনো ঝুঁকি নেই। এ ঋণ আদান-প্রদান হচ্ছে শুধু সরকারের মধ্যে। কোনো ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এখানে জড়িত নয়। বৈদেশিক মুদ্রার মজুত থেকে তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতার ভিত্তিতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এখন বাংলাদেশের হাতে থাকা মজুত দিয়ে ১১ মাসের বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব (প্রতি মাসে ৪০০ কোটি ডলার ধরে)।

বৈদেশিক মুদ্রার এই মজুত দেখে আনন্দিত হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। কেননা করোনা ভাইরাসের কারণে সামনের দিনে অর্থনৈতিক ভাবে অনেক চ্যালেঞ্জের সন্মুখীন হতে হবে। রেমিট্যান্সের প্রবাহ সামনের দিকে কমে যেতে পারে। অনেক কারণে এ প্রবাহ কমবে। বর্তমান বিশ্বে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশ থেকে যে শ্রমিক বিদেশে পাঠানো হয় তার অধিকাংশ অদক্ষ। জনশক্তি আমদানিকারক দেশগুলো এখন নানা অজুহাতে অদক্ষ শ্রমিক দেশে প্রেরণের চেষ্টা করছে। একমাত্র কূটনৈতিকভাবে এটা থামানো সম্ভব। করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ্বে রপ্তানি বাজারগুলো সংকোচিত হওয়া শুরু হয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব কয়েক বছর পর টের পাওয়া যাবে। এলডিসি উত্তরণে রপ্তানি আয়ে অনেক প্রভাব পড়বে। রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং রপ্তানি আয় কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত নিশ্চয় কমবে। যদিও প্রবাসী আয়ের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ৪৪তম (৪ হাজার ৬০০ কোটি ডলার)। এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান।

উন্নত দেশের অর্থনৈতিক আচার-আচরণ সম্পর্কে আমরা অনেকেই অবগত আছি। জাপান, সুইজারল্যান্ড, কোরিয়া, রাশিয়া, ভারত, চীন সব সময় বৈদেশিক মুদ্রার মজুত রাখতে স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করে। আর্থিক বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা, আমদানি ব্যয় মেটানো, স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন রোধ এবং বৈদেশিক দায় পরিশোধের জন্য বৈদেশিক মুদ্রার মজুত অত্যাবশ্যকীয়। করোনাকালীন অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা মজুতের বিকল্প নেই।

n লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক এবং বাংলাদেশ জাতিসংঘ সমিতির সহযোগী সদস্য