আফগানদের ক্ষুধার তাপে শীতের বরফ কি জল হবে?

আফগানিস্তান এখন একটা দীর্ঘস্থায়ী খাদ্যসংকট এবং ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের নাম। তালেবানরা কাবুল দখলের পরে যে অরাজকতা তৈরি হয়েছে, তাতে বাজারঘাট করার পরিস্থিতি নেই। গণমাধ্যমে কয়েক দিন আগে প্রকাশিত হয়েছে, নারী ফুটবল ও ক্রিকেট দলের সদস্যরা তাদের সরঞ্জাম পুড়িয়ে ফেলছেন। বোরকার দাম বাড়ছে। বেচাকেনা বাড়ছে। কিন্তু তালেবানরা বলছে, তারা ইরানের আদলে শাসন প্রক্রিয়া চালাবে। কাউকে শাস্তি দেবে না। তার পরও তাদের কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না। সবাই পালাচ্ছে। কেন পালাচ্ছে?  বাংলাদেশের মধ্যেও যারা তালেবান শাসনকে মৌন সমর্থন দিচ্ছেন, তারা বলছেন, যারা বহুজাতিক বাহিনীর দালালি করেছে তারা পালাচ্ছে। আসলে কি তাই? সাধারণ মানুষ পালাচ্ছে। তারা রিফিউজি হচ্ছে পাকিস্তান, তাজিকিস্তানসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর। সেখানে যেমন খাদ্য ও পানির সংকটে বিপর্যয় নেমে এসেছে, এসেছে দেশের ভেতরেও।

এর প্রমাণ মেলে ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম তালেবানদের দখলদারিত্বের ক্ষেত্রে জরুরি সাহায্যের আহ্বান জানিয়েছে এবং তিন বছরের মধ্যে দ্বিতীয় ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতি তৈরি করবে বলে বিবৃতি দিয়েছে। তাহলে এই বিবৃতি কেন? জাতিসংঘের সংস্থাগুলো জরুরি সহায়তা তহবিল ছাড়াই সেপ্টেম্বরের শুরুতে আফগানিস্তানে খাদ্য ঘাটতির বিষয়ে সতর্ক করেছিল, কারণ এটি কাবুল বিমানবন্দরে নিষেধাজ্ঞার কারণে অস্ত্রোপচার সরঞ্জাম এবং গুরুতর অপুষ্টি কিটসহ প্রাথমিক চিকিত্সা সরবরাহ আটকে ছিল। এছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) গত সোমবার বলেছে যে, বিমানবন্দরটি বাণিজ্যিক ফ্লাইট বন্ধ করে দেওয়ার কারণে গুরুত্বপূর্ণ ডেলিভারি বন্ধ রয়েছে।

একই সঙ্গে ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডব্লিউএফপি) বলেছে, তারা এই মুহূর্তে চারটি ভিন্ন রুটে সরবরাহের মাধ্যমে খাবার পাচ্ছে, কিন্তু আগামী মাসের মধ্যে খাবার শেষ হয়ে যেতে পারে। আফগানিস্তানে ডব্লিউএফপির ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর অ্যান্ড্রু প্যাটারসন বলেছেন, তারা উজবেকিস্তানসহ মানবিক ক্রসিংয়ের মাধ্যমে খাদ্য পরিবহন করছিল, যদিও ৫০ শতাংশ সরবরাহ এসেছিল, সেই সঙ্গে পাকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের মাধ্যমে। প্যাটারসন আরো বলেছেন, খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা, ‘শীত আসছে, আফগানিস্তানের অনেক রাস্তা বরফে আচ্ছাদিত হয়ে যাবে। আমাদের খাদ্যগুদামে সরবরাহ বাড়াতে হবে। আমরা এখন দেশে ২০ হাজার মেট্রিকটন খাদ্যের মধ্যে ৭ হাজার মেট্রিকটন পেয়েছি।’ কিন্তু ডিসেম্বরের শেষ পর্যন্ত আফগান জনগণের আরো ৫৪ হাজার মেট্রিকটন খাদ্য প্রয়োজন। সেপ্টেম্বরের মধ্যে খাবার শেষ হওয়ার আগে খাদ্য মজুত প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। কিন্তু সেগুলো কীভাবে সম্ভব তা কেউ জানে না। তবে ক্ষুধার তাপ বাড়ছেই। তাতে বরফ গলে যায়, কিন্তু ক্ষুধার্ত আফগানদের পরিণতি কী হবে তা কেউ জানে না। আফগানদের ভবিষ্যত্ কোন দিকে যাচ্ছে, তা কেউ জানে না।

তবে এটা অনুমান করা যায়, বড় ধরনের অভাব তাদের মোকাবিলা করতে হবে। তার মানে, এখনকার যে অভাব সেটা অভাব নয়। এর চেয়ে ভয়ংকর দিন তাহলে কী হতে পারে? কোন সময় অপেক্ষা করছে আফগানদের জন্য? তাদের ক্ষুধার উত্তাপে শীতের বরফ গলে যাবে হয়তো, তার পরও কি কারো মনে মানবিকতার শেষ চিত্কার পৌঁছাবে না?

এমনিতেই ২০২১ সালের শুরুতে দেশের জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ সংকটের সম্মুখীন এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা এবং পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের অর্ধেক ছিল অপুষ্টিজনিত। ডব্লিউএফপি অনুসারে, এ বছর আফগানিস্তানের প্রায় ৪০ শতাংশ ফসল খরায় নষ্ট হয়ে গেছে এবং কোভিডে আর্থ-সামাজিক প্রভাব অনেক পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যকে নাগালের বাইরে রেখেছে। গমের দাম পাঁচ বছরের গড়ের চেয়ে ২৪ শতাংশ বেশি। তার বিপরীতে জাতিসংঘের মানবিক প্রতিক্রিয়ায় পরিকল্পনা শুধু ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ তহবিল। ৮০০ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতি রেখে, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট কমালা হ্যারিস আফগান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। এই অঞ্চলকে ভরসা দিতে তিনি তাদের বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়’। যুক্তরাষ্ট্রকে আরো একবার একহাত দেখেনোর জন্য চীন যেভাবে আফগানিস্তানের ওপর তাদের প্রভাব বিস্তার করছে, সেটাও  চোখে লাগার মতো। কারণ একটা কমিউনিস্ট রাষ্ট্র শুধুমাত্র মুনাফার লোভে মৌলবাদী প্রতিক্রিয়াশীলদের সঙ্গে এক টেবিলে বসছে। আবার  যুক্তরাষ্ট্রের চলে যাওয়া আফগানদের জন্য মায়াকান্না দেখে কারো কি মনে হয় যে আফগানকে একটা অনিরাপদ জায়গায় রেখে অযথা শোরগোল করছে? সবকিছুর মধ্যে যে সত্যটি একদম আলাদা তা হলো, আফগানিস্তান একটা দীর্ঘস্থায়ী খাদ্যসংকট ও ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের দিকে এগোচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে উন্নত বিশ্ব কি এসব মধ্যাঞ্চল ও এশীয় অঞ্চলের দেশগুলোর দুর্ভিক্ষের মাধ্যমেই তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ফায়দা লুটে তাদের দায়িত্ব শেষ করবে?

নাকি আফগানদের দুর্ভিক্ষের মধ্যে ফেলে আরেকটি নারকীয় দৃষ্টান্ত তৈরি করার প্রস্ততি চলছে? যার মধ্য দিয়ে আবারও প্রমাণিত হবে আসলেই উন্নত বিশ্ব বলে যাকে সবাই জানে, তারা মনুষ্যত্বের বিকাশে কখনোই সচল হবে না। তাহলে আফগানদের কোন অপরাধের শাস্তি হচ্ছে? নাকি আমেরিকা বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি করে যে জঘন্য ইতিহাস গড়েছিল আফগানিস্তানে তারই সংশোধিত আরেক সংস্করণ দেখবে বিশ্ববাসী? কেউ এগিয়ে আসবে না?

n লেখক :প্রতিষ্ঠাতা, আমাদের গৌরব