রিকশায় উঠে মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। বেটা নতুন রিকশা চালাতে এসেছে। পিছনের রিকশাকে সাইড দিচ্ছে না। অথচ আগেও যেতে পারছে না। আমি বললাম ‘এই মিয়া রিকশা চালানো কিছু শিখছো?’
রিকশাঅলা কোনো জবাব দেয় না। আমার মেজাজটা আরো বেশি খাট্টা হয়ে গেল। রিকশাঅলার বয়স ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ। মাথা গোঁজ করা। যেন কারো দিকে তাকাতেই জানে না। আমি অফিস থেকে ফিরছি। অফিসের গাড়ি বাসা অব্দি যায় না। বড় রাস্তার মোড়ে নামিয়ে দিয়ে যায়। রিকশাস্ট্যান্ড থেকে বাসায় যাচ্ছি। মিনিট আটেকের পথ। ওঠার আগে বুঝতে পারিনি, এটা যে নতুন চালক। সব সময়ই দেখি ফাটা চাক্কা রিকশা, ব্রেক নষ্ট রিকশা, বুড়া রিকশাঅলা আমার কপালে জোটে। আজো তা-ই। এই বেটাও মনে হয় দু-চার দিন ধরে রিকশা চালায়। সিঙ্গারের মোড়ে আরেক কাণ্ড ঘটাল। পিছন থেকে একটা পিক-আপ আসছিল হর্ন দিতে দিতে। বাঃ দেখি আমার পাইলট সেসব তোয়াক্কাই করছে না। আমার লাগছে ভয়। আমি ধমকে উঠি, এ্যাই বেটা মারবি নাকি? সাইড দে। বয়রা নাকি? হর্ন মারতাছে শোনো না?
রিকশাঅলা শুধু আমার মুখের দিকে একবার তাকায়, তারপর আবার যেমনটা চালাচ্ছিল তেমনটাই চালাতে লাগল। পিক-আপ বিপজ্জনকভাবে গতি বাড়িয়ে আমার রিকশা কাটিয়ে চলে যায়। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পিক-আপের ড্রাইভার আমার রিকশাওলাকে বাপ তুলে গালি দেয়। আমার মনে হলো উচিত কাজটাই করেছে। এরকম বেয়াড়া রিকশাঅলা আমার চোখে পড়েনি। আমি বললাম, এই তুই কি ঘাস খাইয়া রিকশা চালাতে আসছস? কিন্তু ওর মুখে কোনো কথা নাই। আমার বাসায় যেতে হলে বাম দিকে যেতে হয়। ডানদিকের রাস্তাটা সামনে গিয়ে বাজারে ঠেকেছে। মোড়ের সামনে আসতেই বললাম, এই বাম দিকে। কিন্তু রিকশাওলা চলল ডানদিকে। মেজাজ আর ঠিক রাখতে পারলাম না চিল্লিয়ে উঠলাম, এই ছাগল কানে শুনছ না, বয়রা? তোরে না বললাম বামদিকে। আচ্ছা ঘাউড়া তো!
এবার রিকশাঅলা চুপচাপ রিকশা ঘুরিয়ে বামদিকে নিয়ে চলল। নেমে কী কী বলবো ওকে, তার একটা খসড়া তৈরি করে নিলাম। বাসার গেটের সামনে নেমে ভাড়া মিটিয়ে প্রথমেই বললাম, ঐ কয়দিন থেকে রিকশা চালাস?
রিকশাঅলা মাটির দিকেই তাকিয়ে বলল, স্যার আমি কানে খুবই কম হুনি। বয়রা।
আমি বাক্যহারা হয়ে যাই। সেই যে মার্ক টোয়েন বলেছিলেন, ‘সহমর্মিতা’ হলো এমন একটা ভাষা যা বধিরগণ শুনতে পায় আর অন্ধেরা দেখতে পায়।
আমার মনে হলো, আমি যেন এই গত আট মিনিটে অমানুষের মতো সেই ‘সহমর্মিতা’কে বিসর্জন দিয়েছি! আমি রিকশাঅলার হাত দুটো চেপে ধরি, ভাই আমাকে মাপ করে দিস।
রিকশাঅলা কিছু বলে না। মাথা নিচু করে হাত দুটো ছাড়িয়ে রিকশা নিয়ে চলে যায়...
অলংকরণ :অবিনাশ আচার্য