বন্যা মোকাবিলায় সমন্বিত নদী পরিকল্পনা

পদ্মা-মেঘনা-ব্রহ্মপুত্র বিধৌত বাংলাদেশ পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ। ছোট বড় মিলে প্রায় ৭০০ নদনদী দেশটিকে জালের মতো জড়িয়ে রেখেছে। এ দেশের বৃহত্ নদীগুলো উজানের বৃষ্টিপাত ও হিমালয়ের বরফ গলা পানি বয়ে এনে স্থলভাগকে প্লাবিত করে। বন্যা একটি ক্রমপুঞ্জিত জলবায়ু সম্পর্কিত ঘটনা। এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ যা নদীমাতৃক বাংলাদেশের কোনো না কোনো অঞ্চলে প্রায় প্রতি বছরই হয়ে থাকে।

বর্জ্য অব্যবস্থাপনা, নদীভাঙন ও নদীখননের অভাবে বাংলাদেশের নদীসমূহের পানি ধারণ ক্ষমতা কমে গেছে। যার দরুন অতিবৃষ্টি, ভারীবর্ষণ এবং উজানের দেশ ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীন হতে ঢল আকারে নেমে আসা পানি খুব সহজেই নদীর কূল ছাপিয়ে পার্শ্ববর্তী এলাকাকে প্লাবিত করে। অপরদিকে বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকা সমতল হওয়ায় এবং পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকায় বৃষ্টির পানি জমে নগর বন্যা দেখা দেয়। এগুলো হলো বাংলাদেশের বন্যার প্রধান কারণ।

প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ২৬ হাজার বর্গকিলোমিটার অঞ্চল অর্থাত্ ১৮ শতাংশ ভূখণ্ড বন্যাকবলিত হয়। ব্যাপকভাবে বন্যা হলে সমগ্র দেশের প্রায় ৫৫ শতাংশের বেশি ভূখণ্ড বন্যার প্রকোপে পড়ে। বন্যা শুধু মানুষের জীবনকেই বিপর্যস্ত করে না, এর ফলে দেশ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। রাস্তাঘাট, মত্স্য ও খেত-খামার ডুবে যায়, জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। নদীপ্রধান অঞ্চলগুলোতে বন্যায় মানুষের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নদীভাঙনের ফলে নদীগর্ভে ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে যায়। ফলে অনেক মানুষ গৃহ ও ভূমিহীন হয়ে পড়ে এবং শহরাভিমুখে অভিগমন করে। এই বন্যার ফলে প্রতি বছর নানা রকম ফসল নষ্ট হয়, ফলে খাদ্য নিরাপত্তায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। খাবার পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে নানাবিধ রোগ-ব্যধির প্রকোপ দেখা দেয়।

বন্যাকবলিত এলাকা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, নদীভাঙনের ফলে নদীর পানি এলাকায় ঢুকে বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। আবার ভাঙন এলাকায় বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন রোধের ব্যবস্থা করা হলেও নদীর পানি আবার বেড়ে গেলে ওসব স্থানে বা তার আশপাশে আবার ভাঙন দেখা দেয় ও বন্যার সৃষ্টি হয়।  এভাবে ক্ষণস্থায়ী বাঁধ মেরামত করে কি বন্যা মোকাবিলা করা সম্ভব? শুধু বাঁধ মেরামত করে এর সমাধান করা সম্ভব নয়। নদী যে হারিয়েছে তার চীরচেনা রূপ। বন্যা মোকাবিলা করতে হলে চাই সমন্বিত নদী পরিকল্পনা। দেশের নদনদীগুলোর গভীরতা ক্রমাগত কমছে। কারণ, উজানে বিভিন্ন স্থাপনার কারণে প্রবাহের গতি যখন শ্লথ হয়, তখন সিল্ট বা বর্জ্য সমুদ্রে যাওয়ার আগে মাঝপথেই আটকে যায় এবং তলানি পড়ে ঘন ঘন চর পড়ে। এজন্য বর্ষা মৌসুমে একটু ভারী বৃষ্টিপাত হলেই নদীর পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। একসময় তা তীরে আঘাত করতে থাকে এবং নদীতীর ভেঙে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বন্যার সৃষ্টি করে। তাই বন্যা মোকাবিলা করতে হলে নদীর প্রবাহ ঠিক রাখতে হবে। এজন্য নিয়মিত চর অপসারণ ও নদী খনন করে নদীপ্রবাহ যাতে মাঝনদী বরাবর থাকে সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এর পাশাপাশি ভাঙনপ্রবণ অঞ্চলগুলোতে অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়া এবং মজবুত করে বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। আবার যেসব এলাকায় পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, সেখানে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাই সমন্বিত নদী পরিকল্পনাই পারে বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে মুক্তি দিতে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।