সাইরাস যখন পারস্যের রাজা ছিলেন, তখন ছেলেদের সত্য কথা বলা শেখানো হতো। বাড়িতে এবং বিদ্যালয়ে এটাই ছিল তাদের প্রথম শেখার বিষয়।
উতানের বাবা তাকে বললেন, ‘একজন কাপুরুষ ছাড়া আর কেউ মিথ্যা কথা বলে না।’
তার মাও বললেন, ‘সত্যই সুন্দর। আমি এটা সবসময় ভালোবাসি।’
উতানের যখন বারো বছর বয়স, তখন তার বাবা-মা একটি বিখ্যাত বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করার জন্য তাকে দূরের শহরের পাঠালেন। অনেক দূরের এই সফরটি বিপজ্জনক হওয়ার কথা। কাজেই তারা একদল বণিকের সঙ্গে ছেলেটির যাওয়ার ব্যবস্থা করলেন, তারাও ঐ শহরে যাচ্ছিলেন। বিদায়কালে ওর বাবা বললেন, ‘শুভযাত্রা উতান! সবসময় বুকে বল রেখো এবং সত্যবাদী থেকো।’ ওর মা বললেন, ‘বিদায় বাবা! যা সুন্দর তা ভালোবাসবে আর যা কদর্য তা এড়িয়ে চলবে।’
ছোট্ট কাফেলাটির দীর্ঘ সফর শুরু হলো। কেউ উটের পিঠে আর কেউ ঘোড়ার পিঠে চেপে রওয়ানা দিলেন। ওরা ধীরে ধীরে পথ চলছিলেন, কেননা তখন খুব গরম ছিল আর পথও ছিল এবড়োথেবড়ো।
সন্ধ্যার দিকে হঠাত্ একদল ডাকাত ওদেরকে ঘিরে ধরল। বণিকদের কেউ লড়াকু লোক ছিলেন না। সব মালামাল আর টাকাপয়সা ডাকাতদের হাতে তুলে দেওয়া ছাড়া তাদের আর কিছু করার ছিল না।
উতানকে ঘোড়া থেকে টেনে নামিয়ে একজন ডাকাত জিজ্ঞেস করল, ‘এই ছেলে, তোমার কাছে কী আছে?’
ছেলেটি উত্তর দিল, ‘আমার কাছে চল্লিশটা সোনার মোহর আছে।’
তার কথা শুনে ডাকাতটা তাচ্ছিল্যের সুরে হেসে উঠল। ছোট্ট একটা ছেলের কাছে এত টাকা থাকার কথা সে কখনো শোনেনি।
সে বলল, ‘ভালো গল্প শোনালে। তা এই সোনার মোহরগুলো কোথায় রেখেছো?’
উতান উত্তর দিল, ‘আমার টুপিতে, সেলাইয়ের নিচে।’
‘তা-ই নাকি! ভালো বলেছ! তবে একথা আমার বিশ্বাস হয় না।’ এই কথা বলে ডাকাতটা অন্য একজন ধনী বণিকের টাকা লুট করার জন্য ছুটে গেল।
একটু পরই আরেকজন ডাকাত তার কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘এই যে বাবা, তোমার কাছে কোনো স্বর্ণমুদ্রা আছে?’
উতান বলল, ‘হ্যাঁ, চল্লিশটা সোনার মোহর আছে।’
লোকটি বলল, ‘ডাকাতদের সাথে মশকরা করছো, তুমি তো বেশ সাহসী ছেলে।’ এই কথার পর সেও আরেক শাঁসালো মক্কেলের দিকে ছুটে গেল।
অবেশষে ডাকাতদলের সর্দার উতানের কাছে এসে বলল, ‘এই ছেলে, তোমার কাছে দামি কিছু নেওয়ার মতো আছে?’
উতান জবাব দিল, ‘আমি তো ইতিমধ্যে আপনার দুইজন লোককে বলেছি যে, আমার টুপির মধ্যে চল্লিশটা সোনার মোহর আছে। তবে ওরা আমার কথা বিশ্বাস করেনি।’
ডাকাত সর্দার বলল, ‘ঠিক আছে, তোমার টুপিটা খোল।’
ছেলেটি তার কথামতো টুপিটা মাথা থেকে খুলল। ডাকাত সর্দার টুপির প্রান্তের সেলাই খুলেই এর মধ্যে সোনার মোহরগুলো লুকানো পেল।
সে বলল, ‘কেন তুমি বললে কোথায় এগুলো খুঁজে পাওয়া যাবে? কেউ তো ভাবতেই পারত না যে, তোমার মতো এত ছোট একটা ছেলের কাছে সোনার মোহর আছে।’
উতান বলল, ‘আমি যদি আপনার প্রশ্নের জবাবে অন্য কিছু বলতাম, তাহলে আমাকে মিথ্যা কথা বলতে হতো। একজন ভিরু-কাপুরুষ ছাড়া আর কেউ মিথ্যা বলে না।’
তার উত্তর শুনে ডাকাত সর্দার স্তম্ভিত হয়ে গেল। সে তখন ভাবতে লাগল, সে নিজে কতবার কাপুরুষ ছিল। তারপর সে বলল, ‘তুমি সত্যি একজন সাহসী বালক। তোমার সোনার মোহরগুলো তুমি নিজের কাছে রাখতে পার। এই নাও মোহরগুলো। ঘোড়ায় চেপে বসো আর আমার লোকেরা তোমার সাথে সাথে যাবে, যাতে তুমি নিরাপদে তোমার সফরের গন্তব্যে পৌঁছাতে পার।’
পরবর্তীকালে উতান তার দেশের অন্যতম বিখ্যাত একজন ব্যক্তি হয়েছিলেন। তিনি রাজা সাইরাসের পরবর্তী দুইজন রাজার উপদেষ্টা এবং বন্ধু হয়েছিলেন।