দেশব্যাপী ভেজাল, মানহীন ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্য উত্পাদন, মজুত ও বিক্রয়ের সহিত জড়িত অসাধু মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে একযোগে অভিযান পরিচালনায় নামিয়াছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন। ভেজালবিরোধী এই অভিযানে ৬৮টি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দুই শতাধিক অসাধু ব্যবসায়ীকে ইতিমধ্যে প্রায় কোটি টাকা জরিমানাও করা হইয়াছে। খাদ্যপণ্যে ভেজালের সমস্যা আমাদের দেশে নূতন কিছু নহে। ভেজাল খাদ্যের ব্যবসায় এই দেশে এক অতি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হইয়াছে। অথচ নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য মতে, বাংলাদেশে প্রতি বত্সর প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ খাদ্যে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হইয়া বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হইতেছে। খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে র্যাবের অভিযান প্রশংসনীয়; কিন্তু আমাদের মনে রাখিতে হইবে, যে কোনো সমস্যার সমাধান করিতে গেলে সেই সমস্যার গভীরে যাওয়া বাঞ্ছনীয়।
উন্নত বিশ্বের দেশসমূহে খাদ্য ও পণ্যদ্রব্যের মান নিয়ন্ত্রণ এবং ভোক্তার অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় যেই সকল সংস্থা কাজ করিয়া থাকে, তাহারা অত্যন্ত নিষ্ঠার সহিত দায়িত্ব পালন করে এবং তাহাদের কঠোর অবস্থানের কারণে সেই সকল দেশের ব্যবসায়ীরা পণ্যদ্রব্যের মানের কোনো হেরফের কিংবা ভোক্তার অধিকার ক্ষুণ্ন হয়—এইরূপ কোনো কাজ করা হইতে বিরত থাকে। আমাদের দেশেও পণ্যসেবা ও প্রক্রিয়ার জাতীয় মান প্রণয়ন, তদনুযায়ী পণ্য পরীক্ষণ ও পণ্যের গুণমান সনদ প্রদান এবং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম সার্টিফিকেট প্রদানের জন্য রহিয়াছে বিএসটিআই। আবার ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ, ভোক্তা অধিকারবিরোধী কার্য প্রতিরোধ, ব্যবসায়ী ও ভোক্তার সচেতনতা বৃদ্ধি, বাজার তদারকি, বিভিন্ন নীতি ও প্রবিধানমালা প্রণয়ন এবং ভোক্তাদের অভিযোগ অনুসন্ধান ও নিষ্পত্তির মাধ্যমে ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় রহিয়াছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হইতে শুরু করিয়া সহকারী পরিচালক পর্যন্ত কর্মকর্তা রহিয়াছেন। রহিয়াছে বিভাগীয় ও জেলা অফিস এবং সরকারের নিয়োজিত কর্মকর্তা কর্মচারী। জেলা অফিসগুলিকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া আছে তাহাদের কর্মকাণ্ড কী হইবে। অন্যদিকে বাংলাদেশে ভেজাল প্রতিরোধে রহিয়াছে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ এবং উহার অধীনে নিরাপদ খাদ্য, খাদ্যদ্রব্য জব্দকরণ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ পদ্ধতি বিধিমালা, ২০১৪। নিরাপদ খাদ্য আইনের অধীনে বিভিন্ন অপরাধে এক হইতে পাঁচ বত্সরের কারাদণ্ড ও ৪ লাখ হইতে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হইয়াছে। এত কিছুর পরও যখন ভেজাল কারবারি ও অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ হয় না, তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেজালবিরোধী অভিযানগুলি প্রশংসার দাবিদার হইলেও ইহা কি পক্ষান্তরে হতাশারও বহিঃপ্রকাশ নহে? কারণ ভেজালবিরোধী অভিযানে সাময়িকভাবে অসাধু ব্যবসায়ী ও ভেজাল কারবারিদের কার্যক্রম সীমিত হইয়া গেলেও কিছুদিন পর তাহারা আবার সক্রিয় হইয়া উঠে।
সুতরাং ভেজাল কারবারি ও অসাধু ব্যবসায়ীদের দমন করিতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বিএসটিআই প্রভৃতি সংস্থাকে আইন অনুযায়ী সক্রিয় ভূমিকা পালন করিতে হইবে। দেশে ভেজালবিরোধী যেই সকল আইন রহিয়াছে সেই সকল আইনের কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করিতে হইবে। পৃথিবীর কোনো কোনো দেশে ভেজাল কারবারি ও অসাধু ব্যবসায়ীদের দমন করিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এমনকি মৃত্যুদণ্ডেরও বিধান রহিয়াছে। আইনের ফাঁকফোকর গলাইয়া যাহাতে কোনো অবৈধ কারবারি পার পাইয়া না যায়, সেই জন্য প্রয়োজনে নূতন আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন করিতে হইবে। জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় ভেজাল খাদ্যের অসাধু ব্যবসায় নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নাই।