প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, নির্বাচন আসছে, কাজেই দলকে আরো শক্তিশালী করে তোলার বিষয়ে আমাদের মনোযোগী হতে হবে। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে দলকে তৃণমূল পর্যায় থেকে আরো শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি নির্দেশ প্রদান করে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেন তিনি। শেখ হাসিনা গতকাল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের সভার প্রারম্ভিক ভাষণে এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে তার সরকারি বাসভবন গণভবনে দলের এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।
এবারের করোনা ভাইরাসের সময় আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা যেভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, সেভাবে আর কোনো রাজনৈতিক দল মানুষের পাশে দাঁড়ায়নি বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনা ভাইরাসের সময় সরকারের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই খুব আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছে। তবে, কখনো সরকারের একার পক্ষে এই ধরনের পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব ছিল না।
তিনি বলেন, জানি এ কথা কেউ হয়তো বলবেও না লিখবেও না, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এককভাবে শুধু সরকারি লোক দিয়ে সবকিছু করা সম্ভব হয় না। তারাও করেছে খুব আন্তরিকতার সঙ্গে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, হাজার হাজার ডাক্তার এবং নার্স আমরা নিয়োগ দিয়ে চেষ্টা করেছি করোনা মোকাবিলা করার জন্য। আবার ভ্যাকসিন কেনার ব্যাপারে আমরা সবার আগে উদ্যোগ নিয়েছি। আমাদের বিপদ হয়ে গিয়েছিল যে, ভারতে এত ব্যাপকহারে করোনা দেখা দিল যে, চুক্তি থাকা সত্ত্বেও তারা ভ্যাকসিন সাপ্লাই দিতে পারছিল না। তারপরেও আমরা পৃথিবীর যেখান থেকে পেরেছি ভ্যাকসিন সংগ্রহ করেছি এবং এখন আর সমস্যা হবে না। এ সময় তিনি দলের বহু নেতাকর্মীর মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, কত মানুষকে যে আমরা হারালাম।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে যাই বলে বলুক, আমাদের আত্মবিশ্বাস আছে এবং আমরা সেই আত্মবিশ্বাস নিয়েই চলি। ২০০৮ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে আমরা ঘোষণা দিয়েছিলাম ২০২১ সালে বাংলাদেশকে আমরা এই পর্যায়ে নিয়ে আসব। সেটা আমরা করতে পেরেছি বলেই আজকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ।
সরকারের ‘আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের’ কর্মসূচিতে অনিয়ম সৃষ্টির অপচেষ্টাকারীদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে এ ব্যাপারে দলের নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। প্র্রধানমন্ত্রী কতিপয় অসাধু মানুষের মনোবৃত্তিকে ‘জঘন্য’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো প্রত্যেকটা মানুষকে ঘর দেব বলেছি কিন্তু আমি কয়েকটা জায়গায় দেখলাম ঘর ভেঙে পড়ছে। বিভিন্ন জায়গার এমন ছবি দেখার পর সার্ভে করালাম কোথায় কি হচ্ছে। প্রায় দেড় লাখ ঘর আমরা বিভিন্ন এলাকায় তৈরি করে দিয়েছি। ৩০০টি ঘর কিছু মানুষ বিভিন্ন এলাকা থেকে গিয়ে হাতুড়ি শাবল দিয়ে ভেঙে তারপর মিডিয়ায় ছবি তুলেছে। এদের নাম-দাম তদন্ত করে সব বের করা হয়ে গেছে। আমার কাছে পুরো রিপোর্টটা আছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এক জায়গায় যেমন ৬০০ ঘর করা হয়েছে, সেখানে প্রবল বৃষ্টিপাতে মাটি ধসে কয়েকটা ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর ৯টা জায়গায় কিছুটা দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেটা মাত্র ৯টা জায়গায় কিন্তু অন্যত্র আমি দেখেছি যে, প্রত্যেকেই আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসবে, ততই নানামুখী ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত বৃদ্ধি পাবে। সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের পাশাপাশি দেশে-বিদেশে বিভিন্ন সংস্থার নামে মিথ্যা অপপ্রচার চালানো হতে পারে। এ ব্যাপারে সর্বদা সজাগ ও সতর্ক থেকে এসব ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত ও মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে সত্য তথ্য-উপাত্ত দিয়ে জবাব দিতে হবে, উকিল নোটিশ প্রদানসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। আর আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন থেকেই নির্বাচনি ইশতেহার প্রণয়নের কাজ শুরু করতে হবে। দলের মধ্যে থাকা দ্বন্দ্ব-বিবাদ দ্রুত নিরসন করে একদম তৃণমূল পর্যন্ত দলকে আরো শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে হবে। দলের মতের বিরুদ্ধে কাজ করলে যত বড় নেতাই হোন না কেন, তাত্ক্ষণিকভাবে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে কাউকেই ন্যূনতম ছাড় দেওয়া হবে না। প্রায় এক বছর পর গতকাল বৃহস্পতিবার গণভবনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের দীর্ঘ রুদ্ধদ্বার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের এমন নির্দেশনা দিয়েছেন বলে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে।
বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে তার সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক শুরু হয়। নামাজ ও মধ্যাহ্ন ভোজের বিরতিসহ বিকাল সোয়া ৩টার দিকে বৈঠকটি শেষ হয়। বৈঠকে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের ৫৩ জন নেতা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে শোক প্রস্তাব উত্থাপনের পর সাত বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকরা তাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগের সাংগঠনিক লিখিত রিপোর্ট প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন দেশের বাইরে থাকায় চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ ঐ বিভাগের সাংগঠনিক রিপোর্ট বৈঠকে তুলে ধরেন।
বৈঠক সূত্র জানায়, করোনা ভাইরাসের কারণে দীর্ঘদিন পর অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে সাংগঠনিক এবং আগামী নির্বাচনকে নামনে রেখে দলীয় প্রস্তুতির বিষয়গুলো রুদ্ধদ্বার বৈঠকে প্রাধান্য পায়। বৈঠকে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হওয়ায় স্থবির হয়ে পড়া সাংগঠনিক কার্যক্রমে গতি ফেরানোর নির্দেশ দেন সভাপতি শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে একটি সেমিনার আয়োজনের মাধ্যমে আগামী নির্বাচনের জন্য দলের নির্বাচনি ইশতেহার প্রণয়নের কাজও শুরুর নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। সরকারবিরোধী অপপ্রচার সাংগঠনিকভাবে মোকাবিলা করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে বৈঠকে। এছাড়া দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী হলে তাকে দল থেকে বহিষ্কারের পাশাপাশি ভবিষ্যতে কখনো নৌকার মাঝি করা হবে না বলেও সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে বৈঠক থেকে।
বৈঠক শেষে গণভবনের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানান, পরবর্তী (দ্বাদশ) নির্বাচনের প্রস্তুতির লক্ষ্যে আমাদের অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রণয়ন করার নির্দেশনা দিয়েছেন দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা। দলের বিভিন্ন উপ-কমিটিগুলোর সেমিনারের মাধ্যমে পরবর্তী নির্বাচনের যে ইশতেহার হবে, সেখানে যে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হবে; সেগুলো আপডেট করার জন্য উপ-কমিটিগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৈঠক সূত্র জানায়, দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের সাংগঠনিক রিপোর্টে সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে তৃণমূলে এমপিদের সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের দূরত্বের বিষয়টি উঠে আসে। এর জবাবে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, এমপিরা এমপিত্ব করবে, দলও করবে। কিন্তু খবরদারি করবে না। জেতার জন্য অনেককেই মনোনয়ন দেওয়া হয়। তার অর্থ এই নয় যে, তারাও দলে খবরদারি করবে। এমপিরা যেন দলের ভেতরে দল তৈরি না করে—সে বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, কমিটি কমিটির গতিতে হবে। দলের ভেতরে গ্রুপিং বা উপদল তৈরি করা যাবে না। সভায় দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকের বসে যেখানে যেখানে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-কোন্দল আছে তা দ্রুত নিরসনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে নোয়াখালীর ব্যাপারে কোনো কথা হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের জানান, বৈঠকে কোনো কথা হয়নি নোয়াখালীর ব্যাপারে। সকলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে একটা কাঠামো দাঁড় করিয়েছি সমাধানের জন্য। এ ব্যাপারে নেত্রী অবগত রয়েছেন। জাতীয় সম্মেলন নিয়ে কোনো কথা হয়েছে কি না, প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটার কোনো এজেন্ডাই ছিল না।
এমপিদের ওপর শেখ হাসিনার ক্ষোভ প্রকাশ
বৈঠকে উপস্থিত তিন জন নেতা জানান, সাংগঠনিক সম্পাদকদের রিপোর্টে কমপক্ষে ৩০ জেলায় এমপিদের সঙ্গে নেতাকর্মীদের দূরত্ব, কোন্দল, উপদল গঠন করার প্রসঙ্গ উঠে আসে। এ নিয়ে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, নানা সমীকরণে এমপি মনোনয়ন দেওয়া হয়। তারা দলের মনোনয়নে এমপি হন। এমপি হয়েই দলকে ইচ্ছেমতো পরিচালনায় মরিয়া হয়ে ওঠেন কেউ কেউ। এতে তৃণমূলের দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের দূরে ঠেলে দেওয়া হয়। আবার সব কর্তৃত্ব নিতে কেউ কেউ উপজেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক বনে যান। সবকিছু এমপিদের নিতে হবে কেন? দলের ওপর এমপিদের খবরদারি চলবে না। দল চলবে নিজস্ব গতিতে। কমিটি হবে নেতাদের সমন্বয়ে। এমপি দলকে সহযোগিতা করবেন। কোনো বাড়াবাড়ি বরদাস্ত করব না।
আলোচিত তিন জেলা সম্মেলনের তারিখ
রাজবাড়ী জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন ১৬ অক্টোবর, নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন আগামী ৬ নভেম্বর ও পাবনায় ৭ নভেম্বর জেলা সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। এছাড়াও নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, শরীয়তপুরসহ বিভিন্ন মেয়াদ উত্তীর্ণ জেলাগুলোকে দ্রুত সম্মেলনের তাগিদ দেন শেখ হাসিনা।