পল্লিগ্রামের নিভৃত পাড়া মুকসুদপুর। এক নিশ্চুপ বিকেলে উঠান ঝাড়ু দিতে দিতে খানিক বাদে চোখ মুছছে জমিলা। গেল কয়েক মাস আগেই হারিয়েছে প্রিয় স্বামীকে। সৌদিতে পাঁচ বছরের প্রবাসজীবন কাটিয়েছিল তার স্বামী। প্রবাসজীবনের গোটাকয়েক বছর তার ঋণ আদায় করতেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। অবশেষে ঋণের বোঝা আদায় করার আগেই করোনা কেড়ে নিল তার স্বামীকে। তার বিশ-ত্রিশ হাজার টাকার মতো দেনা। আর এগুলোই এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে জমিলার।
২০২১ সালে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক রাষ্ট্র হওয়ার পিছনে যে প্রবাসীদের অবদান অনেক, তা আমরা বেমালুম ভুলে যাই। তাদের রেখে যাওয়া পরিবারের কথা ভুলে যাই।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বর্তমানে ১৭৪টি দেশে বাংলাদেশ শ্রমিক প্রেরণ করছে, যা ১ কোটি ২০ লাখের বেশি। প্রবাসী বাংলাদেশিরা নিজ জন্মভূমির মায়া ত্যাগ করে পাড়ি জমায় প্রবাসে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করাই থাকে তাদের মূল টার্গেট। প্রবাসীগণ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশের সমৃদ্ধির জন্য রেমিট্যান্স পাঠান। তাঁদের রেমিট্যান্সে মজবুত হয় বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত। বর্তমান জিডিপিতে প্রায় ১২ শতাংশ অবদান রাখে এই সেক্টর।
বহু প্রবাসী তাঁর জীবনের বড় একটা সময় কাটিয়ে দেন প্রবাসে। তাঁদের দীর্ঘজীবনে ততদিনে হয়তো বড় হয়ে বিয়ের উপযুক্ত হয়ে যায় রেখে যাওয়া তিন বছরের মেয়েটা। ছেলেটাও ততদিনে স্কুল থেকে কলেজ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে। এতদিন সমস্ত আঘাত সয়ে সন্তান লালন করেন তাঁর স্ত্রী। বাংলাদেশের শত-শত মেয়ের প্রবাসী ছেলের সঙ্গে বিয়ে হয়। প্রবাসীরা বিয়ের জন্য ১৫-৩০ দিনের জন্য আসে আবার চলে যায়। তারপর ২-৩ বছর পর-পর আসে, কেউবা আসে ৫-৬ বছর পর। বিয়ের ১০ বছর পার হয়ে গেলেও প্রবাসীর বধূরা বড়জোর ১ বছর স্বামীকে কাছে পায়। দিনশেষে একজন দিনমজুরের বধূর চেয়েও মানসিকভাবে ঢের চাপে থাকে প্রবাসীর বধূরা।
এত বিপুল সংখ্যক মানুষ দিন-রাত পরিশ্রম করলেও দেশে রেখে যাওয়া তার পরিবারের জন্য দেশ যেন কিছুই করে না! চিকিত্সা, শিক্ষা বা জীবনযাত্রার মান, কোনো কিছুতেই তাদের তেমন সুযোগ-সুবিধা নাই বললেই চলে! রেমিট্যান্সযোদ্ধারা যখন দেখবে দেশে তার পরিবার ভালো আছে, অনয়াসেই তাঁর কাজে মনোযোগ আসবে।
প্রবাসীদের দুর্দশা লাঘব ও স্বার্থ সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত না রাখলে অনায়াসে ভেঙে পড়বে রেমিট্যান্স নামক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নিয়ামক। তাই উচিত পল্লিগ্রামের যার স্বামী এদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রেখে গেছেন তাঁদের জন্য কিছু করা, তাদের জন্য ভাবা। তাহলেই অদূর ভবিষ্যতে আমরা পাব আরো দক্ষ জনশক্তি যারা বিদেশে শুধু কর্মচারী হয়ে কাজ করবে না বরং তাদের শিল্প-কারখানাগুলোর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থাকবে। যাদের কারণে অর্থনৈতিক ইমার্জিং টাইগারে পরিণত হয়েছে প্রিয় দেশ, সেই প্রবাসীর বধূ সর্বোপরি প্রবাসী পরিবারের দিকে কর্তৃপক্ষের আলাদা দৃষ্টি বা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া সময়ের দাবি।
শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়