এমন কোনো সেক্টর নেই যেখানে কোভিডের প্রভাব পড়েনি। তবে তার সঙ্গে এনজিও বা বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসমূহের একটু পার্থক্য আছে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নসহ কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে এনজিওর অবদান অনস্বীকার্য। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা, নারী ক্ষমতায়ন, জেন্ডার সমতা, অপুষ্টি দূরীকরণ, স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা তৈরিতে সিএলটিএস (Community Led Total Sanitaion) কার্যক্রম, হাত ধোয়া বা পরিষ্কার-পরিচ্ছনতা বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা, পাঠ্যপুস্তকে এসআরএইচআর বিষয় অন্তর্ভুক্তিকরণ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ সামগ্রিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের আলোকে বৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় এনজিওরা কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন সাফল্যের পেছনেও এনজিওদের অংশীদারিত্ব রয়েছে। তবে এসব বিষয় অনেকাংশে স্বীকৃতির মুখ দেখে না। মাঠ পর্যায়ে অনেক কাজ আজ জিও এবং এনজিওদের (সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি সংগঠনের) পার্টনারশিপে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের প্রকোপ থেকে মানুষকে রক্ষা করতে মাঠ পর্যায়ে এনজিওদের মাস্ক বিতরণ, খাদ্যদ্রব্য ও সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণসহ সচেতনতামূলক প্রচারণা চোখে পড়ার মতো। অনেক ক্ষেত্রে এনজিও-কর্মীরা লকডাউনে সচেতনতা কার্যক্রমে যুক্ত থেকেছেন। কিন্তু ফন্ট লাইনার বা সম্মুখ সারির করোনা যোদ্ধা হিসেবে এনজিও-কর্মীদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। করোনাকালে এনজিও-কর্মীরা যতটুকু ভীত বা শঙ্কিত তাদের চাকরি নিয়ে, স্বাধীনতার পর তেমনটা এত দেখা যায়নি। শঙ্কিত হওয়ার কারণও যথেষ্ট। বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট এনজিও সংগঠনসমূহ তাদের ফান্ডপ্রাপ্তি অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এক একটি প্রকল্প শেষ হওয়ার পর নতুন প্রকল্প পেতে বেগ পেতে হচ্ছে। কারণ যারা ফান্ড দেবে তারাই আজ আক্রান্ত। ফলে কর্মহীন বা চাকরিচ্যুত হচ্ছেন অনেকেই। মানুষ করোনাকালে শুধু ঋণ পেতে চেয়েছে, কিন্তু লকডাউন বা অন্য যে কোনো কারণে পরিশোধ না করতে পারলেই যেন মহাখুশি। তার সঙ্গে এনজিওবিরোধী কুচক্রী মহলের প্রচারণা ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী সংগঠনসমূহকে বেকায়দায় ফেলার কূটকৌশলে লিপ্ত।
এনজিও সেক্টরের প্রধান সুবিধাভোগী বা অংশীদার নারীসমাজ আজ অবরুদ্ধ। তাদের অনেকেই আজ কর্মহীন হয়ে ঘরে বসা। তাছাড়া নারী নির্যাতন বা বাল্যবিয়ের হারটাও কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেকাংশে বেড়েছে। সে বিষয়টিও ভেবে দেখার সময় এসেছে!
আসলেই কি বাংলাদেশে এনজিওদের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে গেছে? কোভিড ১৯-এর প্রভাব, মধ্যম আয়ের দেশে পদার্পণ কিংবা বিদেশি সহায়তার সীমাবদ্ধতা সবকিছুর পরেও তৃণমূলের একজন এনজিও কর্মী হিসেবে আমি বলব কোভিড-১৯ এনজিওদের জন্য কাজ করার নতুন দ্বার উন্মোচন করে দিয়েছে।
জাতিসংঘ বলছে করোনায় কোটি কোটি মানুষ বেকার হওয়ায় দারিদ্র্য বাড়ছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। করোনা পরবর্তী কিংবা বর্তমানে চলমান করোনা পরিস্থিতির মধ্যেই এনজিওদের কাজকে আরো গতিশীল করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে সচেতনতা বৃদ্ধি, হাত ধোয়া বা মাস্ক ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে দারিদ্র্যবিমোচন, পরিবার পর্যায়ে পুষ্টি নিশ্চিত করতে শাকসবজি চাষে উদ্বুদ্ধ করা, মানুষের কুসংস্কার দূর করে টিকা গ্রহণে আগ্রহী করা, নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করা, মান সম্পন্ন শিক্ষা এবং বৃহত্ নারীশ্রেণিকে তাদের কাজের অনুকূল পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে কর্মে নিয়োজিত করে ক্ষমতায়নের মাধ্যমে নারীর পূর্ণ বিকাশসহ বিভিন্ন সেক্টরে এনজিওদের প্রয়োজনীয়তা আজ সময়ের দাবি। আশা করি, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগসহ এনজিও প্রধানগণ বিষয়টি সুনজরে নিয়ে এনজিও সেক্টরের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে উঠতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
নেত্রকোণা