অর্থনীতির ক্ষতি কাটাতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে করোনার টিকা

 রেজাউল করিম খোকন

 

অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে করোনা ভাইরাসের টিকাদান কার্যক্রম। করোনা মহামারির ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে বেরিয়ে আসতে সহায়তা করছে করোনা প্রতিরোধী টিকাগুলো। শুরুতে এক আর দুই ডোজের টিকায় প্রাধান্য দেওয়া হলেও এখন বুস্টার ডোজের কথা ভাবছে সংস্থাগুলো। এমনিতেই টিকা প্রদানের ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর চেয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলো বেশ পিছিয়ে। আবার টিকাদান কার্যক্রমও ধীরগতিতে চলছে এই দেশগুলোতে। এভাবে বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের টিকাদান কার্যক্রম ধীরগতিতে চলতে থাকলে ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতি হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ)। এই ক্ষতির মুখে পড়বে মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলো। ওদিকে বুস্টার ডোজ নিয়ে কোটি কোটি ডলারের মুনাফা কামানোর স্বপ্ন দেখছে টিকা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো।

অপ্রিয় হলেও নির্মম বাস্তব সত্যি হলো, সাধারণ মানুষের টিকাপ্রাপ্তির বিষয়টি মানবিক দিক থেকে বিবেচনা করা হচ্ছে না। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর টিকাদান কার্যক্রম ধীরগতিতে চলতে থাকলে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে টিকার সুষম বণ্টন না হলে শুধু পশ্চিমা দেশগুলোতে বুস্টার ডোজ প্রয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হলে বিশ্ব জুড়ে করোনায় মৃত্যুহার আরো বাড়বে। কারণ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো তাদের নাগরিকদের জন্য এখনো করোনা টিকার প্রথম ডোজই নিশ্চিত করতে পারেনি। এজন্য বুস্টার ডোজ স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

ইকোনমিস্ট  ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে  জানানো হয়েছে, বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের টিকাদান কার্যক্রম ধীরগতিতে চলতে থাকলে ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ক্ষতির মুখে পড়বে মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলো। টিকা প্রদানের ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর চেয়ে উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলো অনেক পিছিয়ে আছে। ইতিমধ্যে উন্নত দেশগুলো তাদের নাগরিকদের বুস্টার ডোজ দিতে শুরু করেছে, যেখানে দরিদ্র দেশগুলোর জন্য টিকা সরবরাহের আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা অপ্রতুল রয়ে গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দেশ ২০২২ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত তাদের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ টিকা দিতে ব্যর্থ হবে, তারা ২০২২-২৫ মেয়াদে ২ ট্রিলিয়ন ইউরোর সমান ক্ষতির সম্মুখীন হবে। ইআইইউ বলেছে, উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো এই ক্ষতির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বহন করবে এবং উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে তাদের অর্থনৈতিক দূরত্ব বেড়ে যাবে। তারা সতর্ক করেছে, টিকা বিলম্বিত হওয়ায় অসন্তোষ বাড়তে পারে এবং উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়বে। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা প্রায় মোট ক্ষতির তিন-চতুর্থাংশ। গবেষণায় বলা হয়েছে, দরিদ্র দেশগুলোর মাত্র ১ শতাংশের তুলনায় উচ্চ আয়ের দেশগুলোর প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ আগস্টের শেষ পর্যন্ত কমপক্ষে একটি ডোজ পেয়েছে। বেশির ভাগ টিকার ক্ষেত্রে দুটি ডোজ নিতে হয়। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে টিকাদান কার্যক্রম মন্থর গতিতে এগিয়ে চলেছে।

এই সময়ের  বাস্তব পারিপার্শিক অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, সাধারণ মানুষের টিকাপ্রাপ্তির ব্যাপারে মানবিক দিক বিবেচনা করা হচ্ছে না। এমনিতেই টিকা প্রদানের ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলো অনেক পিছিয়ে আছে। আর টিকাদান কার্যক্রম ধীরগতিতে চলতে থাকলে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতির সম্মুখীন হবে এই দেশগুলো। তাই সাধারণ মানুষ যাতে টিকা নিতে পারে, জীবন বাঁচাতে পারে, সেজন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে আরো সোচ্চার হতে হবে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন ফার্মাসিউটিক্যালস জায়ান্ট কোম্পানি ফাইজার ও তার জার্মান অংশীদার বায়োএনটেক এবং মডার্না ২০২১ ও ২০২২ সালে করোনা প্রতিরোধী টিকা বিক্রিতে ৬ হাজার কোটি ডলারের চুক্তি করেছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, কোভিড-১৯ টিকা বিক্রি করে ২০২৩ সালে ফাইজার ও বায়োএনটেক ৬৬০ কোটি ডলার ও মডার্না ৭৬০ কোটি ডলার আয় করবে। এ আয়ের বেশির ভাগই আসবে টিকার বুস্টার ডোজ থেকে। এরপর এই টিকার বার্ষিক বাজার হবে প্রায় ৫০০ কোটি ডলারের বেশি। মার্কিন সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ফ্লু টিকার প্রতি ডোজের দাম ১৮-২৫ ডলার। চলতি বছর টিকা প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো ৪ থেকে ৫ শতাংশ দাম বাড়িয়েছে ফ্লু টিকার। আর ফাইজার যুক্তরাষ্ট্রে ১৯ ডলার ৫০ সেন্ট এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে ১৯ ইউরো ৫০ সেন্ট মূল্যে প্রতি ডোজ করোনার টিকা সরবরাহ করছে। বলা হচ্ছে যে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো কোভিড টিকা তৈরি ও সরবরাহ করছে, তারা অতি মুনাফা না করলে মানুষ হয়তো পাঁচ ভাগের এক ভাগ দামে টিকা পেত। সব দিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের টিকাদান কার্যক্রম ভালো অবস্থায় নেই। সেই হিসাবে দেশের অর্থনীতির ক্ষতিটা বড়ই হবে। কারণ দেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগও খুব বেশি আসছে না। যত দিন না টিকা প্রদান শতভাগ হচ্ছে, তত দিন বিনিয়োগ পরিস্থিতি খারাপ হতেই থাকবে।