রাজধানীর কাছে সাভার উপজেলার সাভার ও আশুলিয়া থানা এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। এই এলাকায় চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, কিশোর গ্যাংয়ের উত্পাত, ঝুট ব্যবসার আধিপত্য নিয়ে মারামারি, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, হত্যার মতো নানা অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে প্রায় প্রতিদিন। সম্প্রতি উপজেলায় ডাকাতির ঘটনা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এলাকাবাসী প্রশ্ন তুলছেন, থানা পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে। অনেকের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং স্থানীয় রাজনীতিকদের আনুকূল্য পেয়ে অপরাধীরা এখানে বেপরোয়া।
উপজেলার পাড়া মহল্লায় উঠতি মাস্তানদের উত্পাতে সাধারণ মানুষের জনজীবন অতিষ্ঠ। কোথাও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়, আবার কোথাও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সহযোগী হিসেবে সক্রিয় থাকছে এসব মাস্তান। এলাকাভিত্তিক গড়ে উঠছে অপরাধী গ্যাং। তারা উত্ত্যক্তকরণ, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি থেকে শুরু করে জড়িয়ে পড়ছে ছিনতাই-রাহাজানির সঙ্গে। তাদের অনেকের কাছে রয়েছে ধারালো অস্ত্র থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক পিস্তল ও রিভলবার। মাঝেমধ্যে দু-একটি ঘটনায় আসামি গ্রেফতার ও অস্ত্র উদ্ধার হয় বটে। কিন্তু প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে থেকে যায়।
সাভার এবং আশুলিয়ায় ফেনসিডিল, হেরোইন, ইয়াবা, গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকের বিস্তার বেড়েছে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও অলিগলিতে ইয়াবা অতি সহজলভ্য বস্তুতে পরিণত হয়েছে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ এমনকি নারীরাও এতে আসক্ত হয়ে পড়েছে। এছাড়া এলাকার শতাধিক যুবক ভ্রাম্যমাণ ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। মূলত এসব মাদকের কারবার থেকে অর্জিত অর্থ দিয়েই এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছে একটি মহল।
শিল্পনগরী সাভার ও আশুলিয়ায় চলছে নীরব চাঁদাবাজি। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ, পরিবহন সেক্টরের নামধারী শ্রমিকনেতা, রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দ পাল্লা দিয়ে চাঁদাবাজিতে নেমেছে। এ চাঁদাবাজির হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না বিভিন্ন সরকারি-আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরাও।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক পোশাক কারখানার মালিক বলেন, কতিপয় অসাধু পুলিশ, রাজনৈতিক নেতা ও ভুঁইফোঁড় শ্রমিকসংগঠন বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে থাকে। তাদের দাবিকৃত টাকা দেওয়া না হলে দেখে নেওয়ার হুমকি দেয়। অপর দিকে ঝুট ব্যবসার আধিপত্য নিয়ে একাধিক গ্রুপ প্রায়শই মোটরসাইকেল মহড়া ও মারামারিতে লিপ্ত হয়। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটে থাকে। এ ঘটনায় গার্মেন্টস সেক্টরে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এলাকায় বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তি, চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে পুলিশের সামনে ঘুরে বেড়ায়। অপরাধের শিকার ভুক্তভোগীরা থানায় গিয়ে প্রতিকারের বদলে বিড়ম্বনা এবং হয়রানির শিকার হচ্ছেন, এমন অনেক আভিযোগ পাওয়া গেছে। এমনকি একই রাতে একই এলাকার একাধিক বাড়িতে দুর্বৃত্তরা হানা দিচ্ছে। বাড়তি ঝামেলার ভয়ে অনেকেই পুলিশে অভিযোগ করা থেকে বিরত থাকে।
সন্ধ্যার পর বিভিন্ন অলিগলির মোড়ে ছিনতাই নিত্যদিনের ঘটনা। বাদ যাচ্ছে না সড়ক মহাসড়কও। ইতিপূর্বে গভীর রাতে সড়কে চলাচলরত গাড়িতে পাথর, ইটের টুকরা নিক্ষেপ বা সড়কের ওপর গাছের গুঁড়ি ফেলে গতিরোধ করে যাত্রী ও চালকদের সর্বস্ব ছিনিয়ে নেওয়ারও ঘটনা ঘটেছে।
এদিকে পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে পরিবহন শ্রমিকনেতা নামধারী চাঁদাবাজ ও ট্রাফিক পুলিশরা। ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, বাইপাইল-উত্তরা সড়ক, নবীনগর-কালিয়াকৈর সড়কসহ বিভিন্ন সংযোগ সড়কে বেপরোয়া চাঁদা আদায় করছে চাঁদাবাজরা। একাধিক পরিবহন মালিকের অভিযোগ, উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গ থেকে আসা পণ্যবোঝাই ট্রাক আটক করে হাইওয়ে পুলিশ প্রতি রাতেই মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
শিল্প অঞ্চল হওয়ার কারণে সাভারে শ্রমিকের বেশে অনেক বহিরাগত সন্ত্রাসী এখানে আত্মগোপনে রয়েছে। ফলে বেশির ভাগ অপরাধী বহিরাগত হওয়ায় তারা বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত করলেও রয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সাভারে সম্প্রতি সংঘটিত অপরাধের খণ্ডচিত্র:
গত রবিবার দিবাগত গভীর রাতে উপজেলার পাথালিয়া ইউনিয়নের নয়ারহাট বাজারের একটি জুয়েলারি মার্কেটের ১৮টি দোকানে পুলিশ পরিচয়ে গণ ডাকাতি হয়। সশস্ত্র ডাকাতের দল বাজারের নিরাপত্তাকর্মী ও দোকান কর্মচারীদের মারধর করে একটি কক্ষে আটকে রেখে প্রায় কোটি টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায়।
এর কয়েক দিন আগে সাভার পৌর এলাকার ব্যাংক কলোনি মহল্লার আওয়ামী লীগ নেতা কামরুল আহসান সোনাহরের বাড়িতে দুর্বৃত্তরা হানা দিয়ে বাড়ির সবাইকে চেতনানাশক স্প্রে করে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট করে।
গত বুধবার সাভার পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের কোর্টবাড়ী এলাকায় একটি টিনশেড বাড়ি থেকে এক অজ্ঞাত নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত ঐ নারী ঐ এলাকায় ফেরি করে কাপড় বিক্রি করতেন। লাশ উদ্ধারের এক দিন আগে ঐ নারী এক ব্যক্তির সঙ্গে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ঐ ভাড়া বাসায় উঠেছিলেন। পরদিন সকালে ঐ নারীর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
সম্প্রতি আশুলিয়ায় দই-মিষ্টির সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে নিজ ঘরে ডিশ ব্যবসায়ী স্বামী ইলিম সরকারকে (৪২) কুপিয়ে হত্যা করে তার স্ত্রী ও পরকীয়া প্রেমিক। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী ক্যামিলি ও পরাকীয়া প্রেমিক রবিউল করিম পিন্টুকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পরকীয়ার জের ধরে স্ত্রীর যোগসাজশেই পরিকল্পিতভাবে ব্যবসায়ী ইলিম সরকারকে হত্যা করা হয়।
রবিবার সকালে সাভারের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন গেরুয়া বাজার এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে এক যুবকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহত ঐ যুবকের নাম শাহিন (২৫)। শাহিন ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের মৃত আবুল কালামের ছেলে।
গত ২২ আগস্ট সকালে আশুলিয়ার শ্রীপুর একতা কাঁচামালের আড়তের একটি কক্ষ থেকে লেবু মিয়া (৪৫) নামের এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত লেবু মিয়া সিরাজগঞ্জের কাজীপুর থানার শুভগাছা গ্রামের মৃত নূর নবীর ছেলে। তিনি আশুলিয়ার শ্রীপুর এলাকার হারুনের ভাড়া বাসায় থেকে কাঁচামালের ব্যবসা করতেন।
যা বলছেন পুলিশ কর্মকর্তা ও অন্যরা
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন সরদার বলেন, মাদক, দখলবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যত শক্তিশালী মহলই জড়িত থাকুক না কেন—কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। যে কোনো মূল্যেই তা নির্মূল করা হবে।
ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আবদুল্লাহ হিল কাফি জানান, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সড়কে টহল জোরদার করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাভার নাগরিক কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. রফিকুল ইসলাম মোল্লা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি উল্লেখ করে বলেন, কিছুদিনের মধ্যেই বেশ কয়েকটি ডাকাতির ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। জনগণের জানমাল রক্ষার্থে পুলিশ প্রশাসনকে আরো তত্পর হওয়ার জন্য তিনি আহ্বান জানান।
ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাসুদ চৌধুরী বলেন, সরকার মাদক, জঙ্গি, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি বন্ধে জিরো টলারেন্স অবস্থানে রয়েছে। অপকর্মকারী যে দলের বা পরিচয়েরই হোক না কেন—ছাড় না দেওয়ার জন্য তিনি প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান।