ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং বা এমএলএম কোম্পানির নামে ১০ হাজার সদস্যকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলেন রাগীব আহসান। শরিয়াহভিত্তিতে লভ্যাংশ দেওয়ার কথা বলে প্রায় ১১০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে তা দিয়ে নিজসহ আত্মীয়স্বজনের নামে জমি কেনেন তিনি। সদস্য সংগ্রহে মাঠ পর্যায়ে ৩০০ জন কর্মী ছিল তার। ২০ শতাংশ হারে লভ্যাংশ দেওয়ার নামে তাদের নিয়োগ দিলেও তা মেটাতেও ব্যর্থ হন রাগিব। এসব ঘটনায় বেশ কয়েকটি জেলায় মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন ও বিক্ষোভসহ মামলাও হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে র্যাব রাজধানীর তোপখানা রোড এলাকা থেকে রাগীব আহসান ও তার ভাই মো. আবুল বাশারকে গ্রেফতার করে। এছাড়া বৃহস্পতিবার বিকালে পিরোজপুর সদর থানাপুলিশ শহরতলির খলিশাখালী গ্রামের বাড়ি থেকে এহসানের অপর দুই ভাই মাহমুদুল হাসান ও খায়রুল ইসলামকে গ্রেফতার করে।
গতকাল শুক্রবার বিকালে রাজধানীর কাওরান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে র্যাব-১০ ও সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা মিলে দুই জনকে গ্রেফতার করে। জিজ্ঞাসাবাদে রাগীব আহসান তার প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য দেন। জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, রাগীব আহসান ১৯৮৬ সালে পিরোজপুরের একটি মাদ্রাসায় অধ্যয়ন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি হাটহাজারীর একটি মাদ্রাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস ও খুলনার একটি মাদ্রাসা থেকে মুফতি সম্পন্ন করেন। পড়াশোনা শেষে পিরোজপুরে একটি মাদ্রাসায় চাকরি শুরু করেন। ২০০৬-২০০৭ সালে ইমামতির পাশাপাশি ‘এহসান এস মাল্টিপারপাস’ নামে একটি এমএলএম কোম্পানিতে ৯০০ টাকা বেতনের চাকরি শুরু করেন। মূলত এই প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুবাদে এমএলএম কোম্পানির কারসাজি রপ্ত করেন। পরবর্তী সময়ে নিজে ২০০৮ সালে ‘এহসান রিয়েল এস্টেট’ নামে একটি এমএলএম কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। জিজ্ঞাসাবাদের তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে র্যাবের এই কর্মকর্তা আরো বলেন, তিনি মূলত ধর্মীয় আবেগ-অনুভূতিকে অপব্যবহার করে এমএলএম কোম্পানির ফাঁদ তৈরি করেন। তিনি শরিয়তসম্মত সুদ বিহীন বিনিয়োগের বিষয়টি ব্যাপক প্রচারণা করে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করেন। তার প্রতিষ্ঠানটি আত্মীয়দের মাধ্যমে পরিচালনা করতেন। শ্বশুর প্রতিষ্ঠানের সহসভাপতি, বাবা উপদেষ্টা ও ভগ্নিপতি ম্যানেজার। এ ছাড়া রাগীব আহসানের তিন ভাইয়ের মধ্যে গ্রেফতার আবুল বাশার প্রতিষ্ঠানের সহপরিচালক, বাকি দুই ভাই সদস্য। এভাবে তিনি ব্যাপক অনিয়ম করেছেন বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন।
কমান্ডার মঈন বলেন, বিভিন্ন ভুক্তভোগীর তথ্য, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে আনুমানিক তিনি ১৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাত্ করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তিনি বলেছেন ১১০ কোটি টাকা। আর আত্মসাত্কৃত টাকা জঙ্গি কর্মকাণ্ডে ব্যবহার হয়েছে কি না বা উসকানির কাজে ব্যবহূত হতো কি না, সেটি গোয়েন্দারা খতিয়ে দেখবেন। তিনি বলেন, যেহেতু টাকার বিষয়টি জড়িত তাই এ বিষয়ে দুদক ও সিআইডি ব্যবস্থা নেবে।
এদিকে পিরোজপুর অফিস জানায়, বৃহস্পতিবার বিকালে রাগীবের দুই ভাই প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা কমিটির সদস্য পিরোজপুর পৌর বাজার মসজিদের ইমাম মাহমুদুল হাসান ও খায়রুল ইসলামকে সদর থানার পুলিশ শহরতলির খলিশাখালী গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে। গত বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাকে এহ্?সান গ্রুপের প্রতারণা নিয়ে একটি প্রতিবেদন ছাপা হলে প্রশাসন এ ব্যাপারে নড়েচড়ে বসে এবং খোঁজখবর নিতে শুরু করে।
পিরোজপুর সদর থানার ওসি আ. জা. মো. মাসুদুজ্জামান জানান, অধিক মুনাফা দেওয়ার লোভ দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলার পরিপ্রেক্ষিতে মাওলানা রাগীব আহসানের দুই ভাইকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে রিমান্ড আবেদন করা হবে।
মামলার বাদী গ্রুপের ভুক্তভোগী গ্রাহক হারুন-অর-রশিদ জানান, মাওলানা রাগীব আহসান প্রথমে ২০১০ সালে পিরোজপুর সদর উপজেলার খলিশাখালী এলাকায় এহ্?সান রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড বিল্ডার্স নামে কোম্পানি খুলে ধর্মের নামে সাধারণ মানুষদের অধিক মুনাফা দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে গ্রাহক বানিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেন। পরবর্তী সময়ে তিনি এহসান গ্রুপ নামে প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করে উক্ত প্রতিষ্ঠানের আড়ালে সাধারণ মানুষদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ দিয়ে আরো ১৪টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে পরিচালনা করেন। শুরুতে কিছু গ্রাহককে মুনাফার টাকা দিলেও পরে তা দেওয়া বন্ধ করে দেন মাওলানা রাগীব আহসান। পরে গ্রাহকরা তাদের জমাকৃত টাকা ফের চাইলে তা-ও দেওয়া হয় না।