এই মাসের ৯ তারিখে অস্ট্রেলিয়ায় একটি অভিনব দিবস পালিত হয়ে গেল। আমি ঠিক জানি না দুনিয়ার আর কোনো দেশ বা সমাজে এমন কোনো দিন পালনের সংস্কৃতি আছে কি না। দিবসটির নাম ‘আর ইউ ওকে?’ এর বাংলা তর্জমা হওয়া উচিত, ‘আপনি ঠিক আছেন তো?’ সম্পর্কভেদে এটা তুই তুমিকেও সেভাবে বলা যেতে পারে। কেন এই দিবস? ওরা বলছে, এর মধ্য দিয়ে এমন একটা বিশ্ব গড়ে তোলা, যেখানে সবাই সবার সঙ্গে যুক্ত থাকবেন এবং এই নিবিড় আত্মীয়তা বা সৌজন্য মানুষকে আত্মহননের পথ থেকে মুক্ত রাখবে। পরিসংখ্যান বলছে, অষ্ট্রেলিয়ার মতো ধনী, সচ্ছল ও উন্নত দেশ বা সমাজে গড়ে প্রতিদিন আট জন তাদের জীবন থেকে নিজেই বিদায় নেন, যার নাম আত্মহত্যা। পরিসংখ্যান এ-ও বলছে, গড়ে ৩০ জন আত্মহত্যার চেষ্টা করেন প্রতিদিন। কিন্তু কেন?
তার বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে আসুন একবার বাংলাদেশের দিকে তাকাই। করোনাকালে গেল এক বছরে সারা দেশে আত্মহত্যা করেছে ১৪ হাজার ৪৩৬ জন নারী-পুরুষ। পারিবারিক জটিলতা, সম্পর্কের অবনতি, পড়াশোনা নিয়ে হতাশা, আর্থিক সংকট এসব আত্মহত্যা ঘটনার মূল কারণ। খেয়াল করুন, এই কারণগুলোর সঙ্গে করোনা রোগের কোনো সম্পর্ক নেই। এসব মানুষ জীবন বিসর্জন দিয়েছে স্বেচ্ছায়। বাধ্য হয়েছে, এই সুন্দর পৃথিবীকে বিদায় জানাতে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষ হতাশ হলে ঠুনকো কারণে নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারে না। তখন সে নিজেকে একা মনে করে এবং আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। আপাতদৃষ্টিতে অন্যদের কাছে মৃত্যুর কারণ ছোট মনে হলেও ঐ কারণ ঐ মুহূর্তে ঐ ব্যক্তির জন্য অনেক বড় কারণ হয়ে সামনে এসেছিল।
দেখা যাচ্ছে, ধনী, গরিব বা মধ্যবিত্তের ব্যাপার নয়, নানা কারণে মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নেয়। শিল্প-সংস্কৃতিতেও এর প্রভাব দেখেছি আমরা। বাংলাদেশের মেধাবী কবি জীবনানন্দ দাশ আত্মহননের জন্য ট্রামের মতো শ্লথগতির যান বেছে নিয়েছিলেন। এমন কাজ তিনি একা করেননি, বাংলা গানের সেরা গীতিকারদের একজন পুলক বাবুও জীবন দিয়েছিলেন নিজের মতো করে।
আত্মত্যাগ ও আত্মহত্যা কিন্তু এক বিষয় নয়। বহু মানুষ দেশ, সমাজ বা জনগণের জন্য নিজের জীবন দান করে শহিদ হন। তাদের কথা আলাদা। যাদের কথা বলছি, তাদের একজন মুনিয়া নামের মেয়েটি। এখনো স্পষ্ট নয়, তবে এটা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে, সে আত্মহত্যা করেছিল। তার বোন বিচার চেয়ে বলেছে, মুনিয়া নাকি গর্ভবতী ছিল সে সময়। তাই যদি হয়, তো কী করার ছিল তার? তবে এটাই মানতে হবে এমন দুর্ঘটনা বা অসম্মান এড়ানোর জন্য জীবন থেকে পালানোই একমাত্র বিকল্প। অথচ তখন যদি তার পাশে কেউ থাকত বা তাকে অভয় দিত কিংবা তাকে মনিটর করত, তরুণীটি হয়তো জানে বেঁচে যেত।
ফিরে আসি অস্ট্রেলিয়ার কথায়। এই ‘আর ইউ ওকে’র শুরুও বেদনা দিয়ে।
এর শুরু হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার এক ল্যার্কিন ফ্যামিলি থেকে। কর্তা ব্যারি ল্যার্কিনকে তার পরিবার ও বন্ধুরা যে পছন্দ করত না তা নয়। কিন্তু তিনি একদিন সবাইকে অবাক ও বিস্মিত করে আত্মহত্যা করলেন। কেউ ভেবে পেল না কী এমন হয়েছিল যে তাকে জীবন দিতে হলো। বহু বছর পর ২০০৯ সালে তার ছেলে গ্যাভিন ল্যার্কিন উপলব্ধি করলেন, তার পিতাকে কেউ কখনো বলেনি, ‘আর ইউ ওকে?’ শুধু এটুকু বলা বা তার খোঁজখবর নেওয়াটাই জরুরি ছিল। পরে একটি ডকুমেন্টারিতে তিনি এ কথা তুলে ধরেন। সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য একটি ছক তৈরি করেন। সেই থেকেই এই দিবসের সৃষ্টি।
মনে রাখতে হবে, যে দেশ যত উন্নত কিংবা যে সমাজ যত এগিয়ে, যত প্রতিযোগিতা, সেখানে মানুষ ততটাই সেলফিশ। ততই আত্মকেন্দ্রিক। এই আত্মকেন্দ্রিক মানুষে ভরা কলকাতা শহর। সেখানে আত্মহননের হার ভয়াবহ। ঢাকাও পিছিয়ে নেই। অথচ আমাদের দেশ বা সমাজে মানুষ অস্ট্রেলিয়া কিংবা ইউরোপ-আমেরিকার মতো বিচ্ছিন্ন নয়। এখনো ঘরে ঘরে তরকারি, মিষ্টি বিনিময় বহাল। গাঁওগেরামে তো সবাই সবার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ। তবে ঢাকার মতো বড় শহরে তা তেমন সুখকর কিছু নয়। তবু এক ভাষা, এক সংস্কৃতি ও পরিচয় বলে অন্য সব দেশের তুলনায় মানুষ একে অপরের সঙ্গে বেশি জড়িয়ে।
অন্যদিকে টাকাপয়সা ও সমাজ-নিরাপত্তা, পরিবেশ, খাদ্যে উন্নত দেশগুলোর মানুষ মূলত একা। এখানে এমন লোকজনও আছেন, যারা স্বামী-স্ত্রী ছাড়া কেউ কাউকে চেনেন না। ব্যাংকে কাজ করার সময় এক নারী এসেছিলেন ব্যাংক চেক নিয়ে। কথা বলে জানলাম, তার স্বামী মারা গেছেন। কেউ নেই তাদের। তিনি এই চেক জমা দিলে দাফন কোম্পানি সব ঠিক করে দেবে। কেউ নেই? এ নিয়ে কথা বলতে বলতে ভদ্রমহিলার চোখ ছলছল করছিল। আহা! বেদনা, সেই ভদ্রলোকের কেউ বেঁচে নেই আর। বহু বছর আগে অন্য এক দেশ থেকে এসেছিলেন তারা। ধীরে ধীরে সব ঘনিষ্ঠজন চলে যাওয়ার পর তাদের আর কেউ ছিল না। এই কাহিনি শোনার পর আমার দুই চোখ বেয়ে দুই ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়েছিল। তা দেখে ভদ্রমহিলা বলেছিলেন, এই যে তুমি তৃতীয়জন, যে তার জন্য কাঁদলে। এমনই বিষণ্ন একা সমাজ এখানকার। এখানে এমন একটা ‘আর ইউ ওকে’ দিবস দরকার।
কিন্তু আজকের বাংলাদেশের অবস্থাও কি তেমন নয়? মানুষে মানুষে আজ না আছে ভালোবাসা, না কোনো আন্তরিকতা। বড় বড় শহরে মানুষের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব যোজন যোজন। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, ডিজিটাল বা বায়বীয় জগত্ খোলার পর মানুষ কবে কার মুখ ভালো করে দেখেছে জানে না। মা-বাবা আর সন্তানদের মধ্যেও এখন বিস্তর দূরত্ব। ডিজিটাল জগতে হাই-হ্যালো কিংবা আই লাভ ইউর তোড়ে আসল ভালোবাসা পালিয়েছে জানালা খুলে। না কেউ কারো হাতে হাত রাখে, না কাঁধে। আলিঙ্গনের মতো বিষয়টাও আজ আর চলে না। এই বাস্তবতায় মানুষ মানুষের কাছ থেকে ক্রমাগত দূরে যাবে, এটাই স্বাভাবিক।
একবার চন্তা করেন তো, কবে কখন কোথায় আপনি কাউকে চোখে চোখ রেখে জানতে চেয়েছেন, সে বা তিনি আসলে কেমন আছেন? কে খবর রাখে আমাদের অন্তরের খবর? মেকি সভ্যতা আমাদের জোর করে হাসতে ও কাঁদতে, আহা-উহু করতে শিখিয়েছে বটে, কেড়ে নিয়েছে আবেগ। এই কঠিন সময়ে ‘আর ইউ ওকে’ বা আপনি বা তুমি কেমন আছেন বা আছো—এটা জানতে চাওয়া একধরনের ওষুধ বৈকি। এর নাম সহমর্মিতা। এর নাম ভালোবাসা।
কেন এই দিবস আমরা পালন করি না? অন্তত একটা দিন বা এই দিনের কারণে নানা দিন আমরা কি আমাদের কাছের-দূরের মানুষের কাছে জানতে চাইতে পারি না আসলেই কেমন আছেন তারা? তাদের অন্তর বা মন কি ভালো আছে? তারা আমাদের বা আমরা কি তাদের বাহুতে মুখ রেখে একটু কেঁদে হালকা হতে পারি না?
এই ‘আর ইউ ওকে’ যদি কোনো মানুষের প্রাণ বাঁচায়, তো এর ব্যবহারে কী অসুবিধা? কেউ কি ভেবে দেখবেন? একবার হলেও জানতে চাইবেন, কেমন আছি আমরা সবাই?
n সিডনি