১২ সেপ্টেম্বর মৃত্যু দিবস

‘ভাটির পুরুষ’ শাহ্ আবদুল করিম

দিনটি ছিল ১৫ ফেব্রুয়ারি, কৃষক মোহাম্মদ ইব্রাহীম আর নাইয়রজান বিবির কোল জুড়ে এলো প্রথম সন্তান। তার নাম আবদুল করিম। দাদা নসীব উল্লাহ ফকির জিকিরে মগ্ন থাকতেন। উদ্দেশ্য ছিল আত্মসাধন। তিনি ছিলেন শান্তমতি, ত্যাগী, ঊর্ধ্বগতি, জ্ঞানী। দাদার আদর্শে স্নেহভরা কোল জুড়ে ছিল এই শিশুটি। দাদার মুখে শুনা এই গানটি তার কচি মনে দোলা দেয়—  

‘ভাবিয়া দেখ মনে,

মাটির সারিন্দানে বাজায় কোনজনে’।

 হাওর-বাঁওড়, খাল-বিল, কালনীর ঢেউ, ভাটির গানের হোগলা-হিজল, নলখাগড়া, হাওরে কচু, শাপলা, সিঙ্গারা, কোড়া-সারসের কিচিরমিচির শব্দের সঙ্গে যেন সখ্য গড়ে তোলে দিনে দিনে বেড়ে উঠেছেন। অভাব তার নিত্য সঙ্গী। অর্ধাহারে, অনাহারে আবার কখনো বা কেবল পানি খেয়ে দিনাতিপাত করেছেন। জীবিকার অন্বেষণে রাখালের চাকরি করেছেন এই বালক। তিনি মুরিদ হলেন সুনামগঞ্জের মৌলা বক্স মুন্সির কাছে। তখন জানলেন পির-মুর্শিদ ভজিতে হলে আপনাকে জানতে হয়। পেতে চাইলেন মুর্শিদের সন্ধান। গুরু বলেন, আগে নিজের মন ঠিক কর, পরে এ কাজে ব্রতি হও। আশিক হয়ে খুঁজলে মাশুকপুরে তার সন্ধান মিলবে।

 আজ তার দেহ নেই, তবে রেখে গেছেন তার নিঃশ্বাস স্পন্দন অসংখ্য ভক্তানুরাগীর জন্য। তাই প্রতিদিন অসংখ্য ভক্ত ও সংগীত পিপাসুদের  পদচারণায় মুখরিত উজানধল গ্রাম। আমি সে লোভ সামলাতে না পেরে ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ইং তারিখে ছুটে গেলাম সুনামগঞ্জের মরমি কবি হাসন রাজার মিউজিয়ামে। প্রবেশ পথেই দেখলাম, প্রথমেই হাসান রাজার গানের উত্সবের সংগীতে বিভোর বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের জীবন্ত একখানা ছবি। ছবির সামনে দাঁড়িয়ে দু’চোখ বুলিয়ে দেখলাম এবং কিছক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম ছবির পাশে। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানালাম মিউজিয়ামের প্রতিষ্ঠাতা সামারিন দেওয়ানকে। এত সুন্দর একটি ছবি সম্মুখে রাখার জন্য। এখানেই শেষ নয়, পাশের দেওয়ালেই আর্ট করা রয়েছে মরমি কবি হাসন রাজার বিরাট করে একটি ছবি, কক্ষ জোড়েই রয়েছে তার ব্যবহূত বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রী। 

পরদিন গেলাম শাহ আবদুল করিমের গ্রামের বাড়িতে। আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না আমি তারই বাড়িতে। শ্রদ্ধা জানালাম সে মাটিকে, যেখানে শায়িত আছেন শাহ আবদুল করিম তারই একমাত্র সন্তান শাহ নূর জালাল ও তার সহধর্মিণীর হূদয় স্পর্শ করা ভালোবাসায়। শহরের যান্ত্রিকতায় আমরা যে রোবটে পরিণত হয়েছি তা এই ভাটির মানুষের সান্নিধ্যে না আসলে বোঝার সাধ্য নেই। আমি অধীর আগ্রহে জানতে চাইলাম তার আরো কিছু। তারই একমাত্র পুত্র নূর জালাল বললেন- বাবা ১১ দিন ছিলেন পানি না খেয়ে, আর ৪০ দিন চিল্লায় থাকতেন, কেবল দুধ আর হাল্কা খাবার খেয়ে। তিনি প্রায় সময় গভীর ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। কারো সঙ্গে কোনো কথাই বলতেন না। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণসংগীত, সমাজে নিপীড়িত মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরেছেন তার গানে। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম তার কথাগুলো।

মরমি ধারায় যেসব বাউল কবি বাঙালির চিন্তা-চেতনা ও দর্শনে লোক সাহিত্যের সমন্বয় ঘটিয়েছেন বাউল সম্রাট ‘শাহ আবদুল করিম’ তাদের অন্যতম। তিনি ২০০০ সালে রাগীব-রাবেয়া সাহিত্য পদক, ২০০১ সালে একুশে পদক, ২০০৪ সালে মেরিল প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা, ২০০৫ সালে নিউ ইয়র্ক হাসন রাজা লোক উত্সব সম্মাননা, সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড আজীবন সম্মাননা ছাড়াও অনেক সম্মাননা পদক পেয়েছেন।

  ‘কোন মিস্ত্রি নাও বানাইছে কেমন দেখা যায়’ বিকালে এই গানটি শুনলাম মনোযোগ সহকারে। চমত্কার উপস্থাপনা। এরপর শাহ আবদুল করিমের আরো কিছু আমার প্রিয় গান শুনালেন তারই শিষ্য ড. কাইয়ুম, উবেদ পাগলা, দুখু মিয়া, শাহ নূর জালাল, শ্যামলা ও অনেকে। বাউল ঢঙে নেচে গেয়ে বাড়ির মহিলারা আমাকে আরো অনুপ্রাণিত করেছে। আমি বিশ্বাস করতে পারছি না যে তেজোদীপ্ত শরীরে ফর্সা ত্বক আর সাদা চুলের অধিকারী অসাধারণ রূপের পুরুষটিকে আর কেউ দেখতে পাবে না। তবে, তার সৃষ্টির সাগরে  ডুবলেই আমরা খুঁজে পাব এই প্রেমের মানুষটিকে। শুনে দুঃখ পেলাম যে, তার জীবনের বড় স্বপ্ন ছিল, তার বাড়িতেই ‘শাহ আবদুল করিম সংগীতালয় হবে। অর্থের অভাবে আজ সেই সংগীতালয়টি অসমাপ্ত রয়ে গেছে। বিভিন্ন খাতে যা অনুদান পেয়েছেন তা প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য। অন্তত আমরা সংগীতপ্রিয় মানুষগুলো কি পারি না, দেশবিদেশের ভক্তের হূদয় কাঁপানো বাউল সম্রাট ‘শাহ আবদুল করিমের’ শেষ ইচ্ছানুযায়ী তার অসমাপ্ত সংগীতালয়ের কাজটি  সম্পন্ন করতে? আমার দৃঢ় বিশ্বাস এই সংগীতালয়ের কার্যক্রম শুরু হলে, এখানে শুদ্ধ বাউল গানের চর্চা হবে। দেশবিদেশের অগণিত ভক্ত ছুটে আসবে বাউল গান শুনতে এবং গবেষণা করবে নবীন বাউলরা।

১২ সেপ্টেম্বর ২০০৯ ইং সকাল ৭.৫৮ মিনিট অগণিত ভক্ত/ শিষ্য আর সংগীতপ্রিয় মানুষ শোক সাগরে ভাসিয়ে হূদয় সম্রাটের জীবন দীপ নির্বাপিত হলো। তিনি যুগে যুগে অমর হয়ে থাকবেন ভক্তের হূদয়ে তারই সৃষ্টির মাধ্যমে। হয়তো নিজের জন্যই লিখেছিলেন—

‘কেন পিরিতি বাড়াইলায়রে বন্ধু

ছেড়ে যাইবা যদি,

কেমনে রাখিব তোর মন

আমার আপন ঘরে বাঁধি’।

n লেখক :সাংবাদিক-কলামিস্ট