বিবাহবিচ্ছেদ বৃদ্ধি অনাকাঙ্ক্ষিত ও উদ্বেগজনক

সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটির চেয়ারম্যান ও হাইকোর্টের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম এক ভার্চুয়াল কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় বলিয়াছেন যে, নারীরা কেন অধিক ডিভোর্স দিতেছেন তাহার কারণ অনুসন্ধান দরকার। তিনি এই সংক্রান্ত ইত্তেফাকের একটি রিপোর্টের রেফারেন্সও প্রদান করেন। সেইখানে বলা হইয়াছে, রাজধানী ঢাকায় দিনে ৩৮টি বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটিতেছে। চলতি বত্সরের জানুয়ারি হইতে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে ৪ হাজার ৫৬৫টি বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়িয়াছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে। এই হিসাবে প্রতি মাসে জমা পড়িতেছে ১ হাজার ১৪১টি বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন। গত বত্সর এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪২। ইহাতে বুঝা যায়, করোনাকালে ডিভোর্সের সংখ্যা বাড়িয়াছে। তবে তাহার চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হইল, এই ডিভোর্সের ৭৫ শতাংশই দিতেছেন নারীরা। ইহা অবশ্য রাজধানী ঢাকার একটি চিত্র। সমগ্র দেশে পুরুষরাই অধিক হারে নারীদের ডিভোর্স দিতেছেন বলিয়া জানা যায়।

সাম্প্রতিক কালে দেশে বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা বৃদ্ধি পাইবার পিছনে বহুবিধ কারণ রহিয়াছে। গত দেড় বত্সরে করোনা মহামারির কারণে আমাদের দেশে বেকারত্ব ও দারিদ্র্য বাড়িয়াছে। চাকুরিচ্যুতি বা বেতন হ্রাসসহ মানুষের আয়-উপার্জন কমিয়াছে নানাভাবে। ইহার জেরে বাড়িয়াছে পারিবারিক অশান্তি ও অস্থিরতা। ইহাতে খুব অধিক যে ডিভোর্সের সংখ্যা বাড়িয়াছে তাহাও নহে। তবে বিশেষত শহরাঞ্চলে নারীরা কেন অধিক হারে ডিভোর্স দিতেছেন তাহা গভীর চিন্তার বিষয় বটে। নারী সমাজকর্মীরা বলিতেছেন, যখন আর কোনো উপায় থাকে না, তখনই একজন নারী ডিভোর্স দিয়া থাকেন। ইহাতে বুঝা যায়, সমাজে নারী নির্যাতনও আগের তুলনায় বাড়িয়াছে। তবে শুধু নারী নির্যাতনই নহে, ইহার সহিত অন্যান্য কারণও জড়িত। যেমন—স্বার্থের সংঘাত, অর্থের অভাব, পর নর-নারী বা মাদকে আসক্তি, শ্বশুরবাড়ির অসহযোগিতা, যৌতুকের চাপ ও অত্যাচার, মতের অমিল বা আত্মসম্মানবোধে আঘাত ইত্যাদি। আমাদের দেশে গত কয়েক দশকে নারী শিক্ষার হার বাড়িয়াছে। বাড়িয়াছে নারী কর্মজীবীর সংখ্যাও। শিক্ষাদীক্ষা ও অর্থ-বৈভবে নারীর জাগরণ ঘটায় তাহাদের দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন হইয়াছে; কিন্তু পরিবারে যখন তাহাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা খর্ব করা হয়, তখন তাহারা অনেক সময় ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত লইয়া ফেলেন। তাহারা কিছুটা হইলেও স্বাবলম্বী হওয়ায় অনেক সময় ‘একলা চলো’ নীতির উপরই অটল ও অবিচল থাকেন। কর্মজীবী নারীর পরিবার ও ঘর-সংসারের দায়িত্ব পালন লইয়া নানা ঝুটঝামেলা, বিড়ম্বনা, বিসংবাদ ও টানাপড়েনের কারণে শেষ পর্যন্ত ইহার সহিত থাকিবার সমঝোতা ব্যর্থ হইয়া যায়। যে কোনো বিচ্ছেদ, ব্যবধান বা ছাড়াছাড়ি দুঃখজনক। ইহা প্রেম-প্রীতিময় পরিবার ও সমাজ গঠনের প্রতিবন্ধক। যৌবনের প্রারম্ভিক পর্যায়ে এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিচ্ছেদের ধকল অনেকেই কাটিয়া উঠিতে পারেন; কিন্তু শেষ জীবনের বিচ্ছেদ ও একাকিত্ব জীবন চলার পথে ডাকিয়া আনে অনাকাঙ্ক্ষিত অসহায়ত্ব। ইহাতে সন্তান-সন্ততিও অসহায় হইয়া পড়ে এবং তাহাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয়।

নারীরা আজ এনজিও, গার্মেন্টস, অনলাইন বিজনেস, আউটসোর্সিং—নানা খাতে কাজ করিতেছেন। এমনকি অর্ধশিক্ষিত ও অশিক্ষিত নারীরাও রাস্তাঘাট তৈরি, নির্মাণশিল্প, পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি কাজে জড়িত রহিয়াছেন। নারীর ঘরের বাহিরে এই কাজ করা কোনো সমস্যা নহে। এই জন্য পরিবারে যে উন্নত সহিষ্ণুতা, সমঝোতা ও বোঝাপড়ার দরকার তাহা গড়িয়া তুলিতে হইবে। এই সমস্যার সমাধানে নিজ নিজ ধর্ম অনুসরণ করাও বাঞ্ছনীয়। ইসলাম তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদকে ‘নিকৃষ্টতম হালাল’ হিসাবে আখ্যায়িত করিয়াছে। পবিত্র কোরআন শরিফে তালাক প্রদানের পূর্বে মিষ্টি ভাষায় বুঝানো, সামান্য ভুলত্রুটি ক্ষমা করা, বিছানা পৃথকীকরণ ও স্বামী-স্ত্রী উভয় পক্ষের একাধিক সালিশ বৈঠকে সমস্যা নিরসনের কথা বলিলেও আমরা তাহা অনুসরণ করি না। এমনকি বিবাহ ও তালাক প্রদানের যে পদ্ধতি রহিয়াছে তাহাও আমরা ভ্রুক্ষেপ করি না। আমরা মনে করি, হুটহাট করিয়া বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া কোনো পক্ষেরই উচিত নহে। বিচ্ছেদ ছাড়া আর কোনো পথ খোলা না থাকিলে, কেবল সেই ক্ষেত্রেই সকলের কল্যাণের জন্য এবং নতুন জীবন সাজাইয়া নেওয়ার জন্য এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবকাশ রহিয়াছে বইকি।