শরিকে-শরিকে ও নেতায়-নেতায় দূরত্ব, জোটের ভেতরে উপজোট

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এখনো দুই বছরের বেশি সময় অবশিষ্ট থাকলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে নির্বাচনকেন্দ্রিক আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব এরই মধ্যে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে দলের নেতাকর্মীদের নির্দেশনা  দিয়েছেন।  তবে

ক্ষমতাসীনদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বলয়ের ছবিটা ভিন্ন। খালেদা জিয়া সাজাপ্রাপ্ত এবং তারেক রহমান লন্ডনে থাকায় একধরনের নেতৃত্ব সংকটে ধুঁকছে বিএনপি। অন্যদিকে দলটির নেতৃত্বাধীন দুটি জোট—২০ দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে অভ্যন্তরীণ বিবাদের অন্ত নেই। নানা ইস্যুতে শরিকে-শরিকে আর নেতায়-নেতায় বেড়েছে দূরত্ব। গড়ে উঠেছে ঘোষিত-অঘোষিত উপজোট। শরিকদের কেউ কেউ সঙ্গ ছেড়েছে বিএনপির। একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর থেকে ২০ দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের তেমন কোনো কার্যক্রম দৃশ্যমান না থাকলেও ভেতরের দ্বন্দ্ব-মতবিরোধ সক্রিয়।

বিএনপির নেতৃত্বাধীন মূল জোট ২০ দলের শরিক বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির সভাপতি সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, দীর্ঘদিন যাবত্ ২০ দলের মিটিং হচ্ছে না। এখন ২০ দলীয় জোট আছে বললেও সঠিক, নেই বললেও সঠিক। আর এ বিষয়ে আমার দলের অবস্থান ‘দুই পা দুই দিকে’ যেমন। সৈয়দ ইবরাহিম এ-ও বলেন, ‘আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো বিএনপি জোটের অংশীদার। তবে বিএনপি যদি জোটকে সক্রিয় করতে চায়, অতীতের ভুলগুলোর আত্মসমালোচনা করে পরিবেশ ভিন্ন করতে পারে, তাহলে আমরা একসঙ্গে পথ চলব।

সর্বশেষ গত ১৪ জুলাই ২০ দল ছেড়ে যায় কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক দল জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামীর একাংশ। ঐদিন বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেন জমিয়ত নেতা বাহাউদ্দিন জাকারিয়া। অবশ্য একই নামে জমিয়তের আরেকাংশ এখনো ২০ দলে আছে, এই অংশটির নেতৃত্বে রয়েছেন মনসুরুল হাসান রায়পুরী (ভারপ্রাপ্ত সভাপতি) ও মাওলানা গোলাম মহিউদ্দিন ইকরাম (মহাসচিব)। একাদশ সংসদ নির্বাচনের কিছুদিন আগে, ২০১৮ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির বিরুদ্ধে জোটের অন্য শরিক দলগুলোকে অন্ধকারে রাখার অভিযোগ এনে ২০ দল থেকে বেরিয়ে যায় জেবেল রহমান গাণির বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ও খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি)। এই দুটি দলেরও আরেকাংশ এখনো ২০ দলে আছে। ২০১৮ সালের ২৬ অক্টোবর ২০ দল ছাড়ে লেবার পার্টি। ২০১৬ সালের ৭ জুন ২০ দল ছেড়ে যায় প্রয়াত মুফতি ফজলুল হক আমিনীর প্রতিষ্ঠিত ইসলামী ঐক্যজোট। লেবার পার্টি ও ইসলামী ঐক্যজোটেরও পৃথক দুটি অংশ ২০ দলে থেকে যায়। ফলে জোট থেকে কেউ কেউ বেরিয়ে গেলেও ২০ দলীয় জোটের শরিকের সংখ্যায় কোনো হেরফের হয়নি।

সৈয়দ ইবরাহিমের মন্তব্য এবং সর্বশেষ জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামীসহ কয়েকটি দলের ২০ দল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল রবিবার ইত্তেফাককে বলেন, ‘প্রথম কথা হলো ২০ দল আছে। দীর্ঘ দেড় বছর যাবত্ করোনা সংক্রমণের কারণে জোটের কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালিত হতে পারেনি। ২০ দল কেন, এই সময়ে কোনো জোটেরই তো কার্যক্রম ছিল না। ২০ দল বলেন আর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বলেন সবখানেই শরিক দলগুলো নিজেদের মতো করে আছে। বর্তমান সরকারকে বিদায় করতে আমরা একটি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার জন্য কাজ করছি।’

বিএনপির ২০ দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সমান্তরালে ২০১৯ সালের ২৭ জুন ‘জাতীয় মুক্তি মঞ্চ’ নামে পৃথক মঞ্চের ঘোষণা দেন ২০ দলের শরিক এলডিপি সভাপতি অলি আহমদ। এরপর থেকেই ২০ দলের সঙ্গে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন তিনি। অবশ্য অলির নেতৃত্বাধীন এলডিপির মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ নিয়মিত ২০ দলের বৈঠকে অংশ নেন। অলি আহমদ বলেছেন, বিএনপির সঙ্গে একেবারে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন—এটা ঠিক না। তবে নির্বাচনের পর থেকে ২০ দলের কোনো বৈঠকে আমি যাইনি।

পৃথক মঞ্চ ঘোষণার সময় অলি আহমদের সঙ্গে ছিলেন ২০ দল শরিক বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, জাগপার প্রতিষ্ঠাতা মরহুম শফিউল আলম প্রধানের মেয়ে তাসমিয়া প্রধান ও খেলাফত মজলিসের নেতা মাওলানা আহমদ আলি কাসেমী। এখনো বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অলি আহমদের সঙ্গে সৈয়দ ইবরাহিম উপস্থিত থাকেন। পৃথক মঞ্চ গঠন করার কিছু দিনের মাথায় এলডিপিও ভেঙে দুই টুকরা হয়। এলডিপির একাংশের জাতীয় কাউন্সিলে অলিকে বাদ দিয়ে পৃথক কমিটি ঘোষণা করা হয়। কাউন্সিলে আবদুল করিম আব্বাসী সভাপতি ও শাহাদাত হোসেন সেলিম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। আব্বাসী-সেলিমের নেতৃত্বাধীন এলডিপি ২০ দলে সক্রিয়।

২০ দলের সামগ্রিক বিষয়ে জোটের সমন্বয়ক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘করোনার কারণে কোনো জোটেরই কাজকর্ম নেই। জোটের বৈঠক ডাকা যায়নি, তবে সবার সঙ্গে যোগাযোগ তো হয়। এখন লকডাউন না থাকলেও স্বাস্থ্যবিধি রয়েছে। পরিবেশ, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হোক; ২০ দলের সভা নিশ্চয়ই ডাকা হবে।

এদিকে একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে রাজনীতিতে চমক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ বর্তমানে আছে কি নেই—সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলতে পারছেন না খোদ এর উদ্যোক্তারাই। তবে ড. কামাল হোসেন শনিবার ইত্তেফাককে বলেন, ‘এতদিন করোনা, লকডাউন ছিল। এখন পরিবেশ হয়েছে, কয়েক দিনের মধ্যে ঐক্যফ্রন্টের বৈঠক ডাকব।’

নানা টানাপোড়েনের পর অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্পধারাকে বাদ দিয়ে বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে ২০১৮ সালের ১৩ অক্টোবর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ঘোষণা দেন ড. কামাল। বিএনপি ও গণফোরাম ছাড়াও ঐক্যফ্রন্টের শরিক আ স ম আবদুর রবের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি, মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য ও ড. নুরুল আমিন ব্যাপারীর বিকল্পধারার একাংশসহ কয়েকটি দল। বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ নানা নাটকীয়তা শেষে ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিলেও ভোটের পর ফ্রন্ট থেকে সরে যায়।

কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকলেও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ঐক্যফ্রন্টের শুরু থেকেই সম্পৃক্ত ছিলেন। তবে জাফরুল্লাহ এখন বলছেন, ঐক্যফ্রন্ট আসলে ঐ অর্থে এখন আর নেই। তারেক রহমানকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা নিয়েও প্রকাশ্যে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ও গণস্বাস্থ্যের ট্রাস্টি জাফরুল্লাহ। এছাড়া ভাসানী অনুসারী পরিষদ, মাহমুদুর রহমান মান্না, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নূরকে নিয়ে সম্প্রতি পৃথক মোর্চা গড়েছেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

ঐক্যফ্রন্টের বিষয়ে ড. কামাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা সবসময়ই বলেছি বৃহত্তর এই ঐক্য রক্ষা করব। গণতন্ত্র ও সংবিধানকে সমুন্নত রাখতে আমাদের সেই বক্তব্য এখনো অটুট রয়েছে।’ ঐক্যফ্রন্ট গঠনের আরেক উদ্যোক্তা এবং নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না ইত্তেফাককে বলেছেন, ‘ঐক্যফ্রন্ট আছে-এটা বলার মতো অবস্থায় নেই। আবার ঐক্যফ্রন্ট নেই-তাও বলতে পারছি না।’

ঐক্যফ্রন্টের বৈঠক ডাকা হবে বলে ড. কামালের বক্তব্যের বিষয়ে মির্জা ফখরুল ইত্তেফাককে বলেন, ‘ঐক্যফ্রন্ট আছে। তবে উনি (ড. কামাল) বৈঠক ডাকবেন কি না, জানি না। দেখা যাক কী করেন।’