জগতের কেহই ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নহেন

কথায় আছে—কর্মেই মুক্তি; কিন্তু কর্ম করিলে তাহার সহিত আলোচনা বা সমালোচনা বিনা মূল্যে পাওয়া যায়। ইহা কর্মদীপ্ত ও কর্মসফল সকল মানুষের জন্যই প্রযোজ্য। শিল্পী-সাহিত্যিক-ফুটবলার-ক্রিকেটার কিংবা রাজনীতিক— প্রত্যেক কর্মসফল মানুষের জীবনেই নানান সময়ে বিপুল নিন্দা বা সমালোচনার ঝড় উঠিয়াছে। তবে বুদ্ধিমান মানুষ মাত্রই নিন্দা বা সমালোচনাকে রাজমুকুটের পালকের মতো সৌন্দর্য বলিয়া বিবেচনা করেন। যদিও সমালোচনা হজম করা সকলের পক্ষে সম্ভব হয় না। ডিমের কুসুমের ন্যায় নরম চামড়া যাহাদের, তাহারা কখনো সমালোচনার প্রবল ঝড় উপেক্ষা করিয়া বেশি দূর অগ্রসর হইতে পারেন না। সেই জন্য বলা হয়, আপনি যদি সার্থক শিল্পী, সাহিত্যিক, খেলোয়াড় বা রাজনীতিবিদ হইতে চাহেন, তবে আপনাকে সহ্য ও ধৈর্যশক্তি গন্ডারের চামড়ার ন্যায় মোটা করিতেই হইবে। গন্ডারের চাইতেও যদি মোটা চামড়ার কোনো প্রাণী থাকে, তবে সেই স্তরে লইয়া যাইতে হইবে সমালোচনা সহ্যের শক্তিমত্তা।

যাহারা কর্মঠ, সাহসী, বলিষ্ঠ, তাহারা উদয়াস্ত কর্ম না করিয়া থাকিতে পারেন না। ইহারই প্রতিধ্বনি আমরা পাই সংস্কৃত প্রবাদে। প্রবাদে আছে—‘কুর্বন্নেবেহ কর্মাণি জিজীবিষেত্ শতং সমাঃ।’ অর্থাত্, কর্ম করিতে করিতেই শত বত্সর বাঁচিয়া থাকিতে ইচ্ছা করিবে। আর কর্মের সহিত যেহেতু নিন্দা বা সমালোচনা ফ্রি পাওয়া যায়, সুতরাং উহা মাথায় পাতিয়া লওয়া ছাড়া আর কী উপায়? আমরা দেখিয়াছি সাহিত্যে এশিয়ার প্রথম নোবেল লরিয়েট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবত্কালে কী ভয়াবহ সমালোচনা ও নিন্দার শিকার হইয়াছিলেন! এই কারণে উনি একপর্যায়ে শ্লেষ করিয়া লিখিয়াছেন, ‘নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভালো/ যুগ-জনমের বন্ধু আমার আঁধার ঘরের আলো।/ সবাই মোরে ছাড়তে পারে বন্ধু যারা আছে/ নিন্দুক সে ছায়ার মতো থাকবে পাছে পাছে।’ ইহার পর তিনি নিন্দুকের দীর্ঘায়ু কামনা করিয়া বলিয়াছেন, ‘বিনা মূল্যে ময়লা ধুয়ে করে পরিষ্কার,/বিশ্বমাঝে এমন দয়াল মিলবে কোথা আর?/নিন্দুকে সে বেঁচে থাকুক বিশ্ব হিতের তরে; আমার আশা পূর্ণ হবে তাহার কৃপা ভরে।’ পারস্য কবি শেখ সাদি তো স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছেন—‘যিনি সত্ হন, নিন্দা তাহার কোনো অনিষ্ট করিতে পারে না।’

তবে মহামতি গৌতম বুদ্ধ গভীর দার্শনিক বোধ হইতে বলিয়াছেন, ‘প্রাজ্ঞ ব্যক্তি কখনো নিন্দা বা প্রশংসায় প্রভাবিত হয় না।’ বস্তুত নিন্দা না থাকিলে পৃথিবীতে জীবনের গৌরব কি থাকিত? একটা ভালো কাজে হাত দিলাম, তাহার নিন্দা কেহ করে না, সেই ভালো কাজের দাম কী! এমনটিই মনে করেন বিদ্বজ্জনেরা। সুতরাং সমালোচনা সহ্য করিতেই হইবে। নইলে তিনি হইয়া উঠিবেন দুর্বল ফুলের ন্যায়। দুর্বল ফুলের বোঁটা যেমন আলগা হয় এবং ফল ফলিবার পূর্বেই খসিয়া পড়ে, তেমনই সমালোচনা সহ্য করিবার মতো নার্ভ না থাকিলে তিনি ঝরিয়া পড়িবেন। অন্যদিকে একপাক্ষিক প্রশংসাকে বিজ্ঞজনেরা বিপজ্জনক বলিয়া মনে করেন। শরীরের জন্য পানি অত্যন্ত উপকারী বটে; কিন্তু কেহ যদি অধিক পরিমাণে পানি বারবার পান করিতে থাকেন, উহা শরীরের পক্ষে মোটেই হিতকর হইবে না। একইভাবে প্রশংসার বিরিয়ানি প্রতিদিন খাইতে খাইতে যে কাহারো মুখে অরুচি আসিবেই। সুতরাং প্রশংসা অধিক হইলে মানুষ তখন আরো ভালো কিছু করিবার আগ্রহ পায় না। এই জন্য ফিদেল কাস্ত্রো বলিয়াছেন, ‘আমার নিন্দা করুন।’ এই ব্যাপারে আরো এক ধাপ আগাইয়া ব্রিটিশ লেখক ও রাজনীতিক উইন্সটন চার্চিল বলিয়াছেন, ‘আপনার সমালোচক আছে, তাহা ভালো বিষয়। তাহার মানে আপনি কাজ করিতেছেন, আপনার জীবন কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যের দিকে ধাবিত হইতেছে।’

সুতরাং নিজেকে বিশেষ উদ্দেশ্যের দিকে ধাবিত করিতে হইলে লক্ষ্যে অবিচল থাকাটাই শেষ কথা। যেহেতু কর্ম করিলে তাহাতে খুব সামান্য হইলেও ভুলত্রুটি হইবে এবং এই জগতে একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে, সমালোচনার ঊর্ধ্বে, সুতরাং জগতের কেহই দোষত্রুটি বা সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠিতে পারিবেন না। এই অবস্থায় বিশিষ্ট মানুষের স্ব স্ব কর্মে ব্যাপৃত থাকিতেই হইবে, সমালোচনা যতই আসুক।