মানব শরীরে রক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যে কোনো দুর্ঘটনায় দেহের অভ্যন্তরে অন্ত্র বা অন্য কোনো অঙ্গ থেকে রক্তক্ষরণ হলে অস্ত্রোপচারের জন্য রক্তের খুব প্রয়োজন। প্রসবজনিত কিংবা অন্যান্য জটিল অপারেশনের সময় বা বড় ধরনের দুর্ঘটনার মতো নাজুক অবস্থাতেও রক্ত দেওয়া অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়ে। সঠিক সময়ে রক্ত সংগ্রহে ব্যর্থ হয়ে অনেক রোগী পরপারে পাড়ি জমান। কিন্তু চাইলেই এক জন সুস্থ সবল মানুষ স্বেচ্ছায় রক্তদান করে একটি প্রাণ বাঁচাতে এগিয়ে আসতে পারেন। রক্তদানের মতো মহত্ কাজ পৃথিবীতে খুব কমই আছে।
উন্নত দেশগুলোতে প্রতি হাজারে প্রায় ৪৩ জন স্বেচ্ছায় রক্তদাতা। কিন্তু বাংলাদেশে এ সংখ্যা প্রতি হাজারে মাত্র তিন জন। তবে আশার কথা হলো, বর্তমানে কিছু উদ্যমী তরুণের নিরলস পরিশ্রমের ফলে স্বেচ্ছায় রক্তদানে অপার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। অনলাইনে ও অফলাইনে অসংখ্য স্বেচ্ছায় রক্তদান সংক্রান্ত সংগঠন গড়ে উঠেছে। এসব গ্রুপে তরুণদের স্বেচ্ছায় রক্তদানে নানাভাবে উত্সাহিত করা হয়। এখন অসংখ্য তরুণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রক্তদানের মতো মহত্ কাজে অংশগ্রহণ করছে। কিন্তু এখনো দেশের মোট চাহিদার তুলনায় একটা বড় অংশ ঘাটতিই থেকে যাচ্ছে।
পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে রক্তের ঘাটতি পূরণ হলেও বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে রক্তদাতার পরিমাণ যথেষ্টই কম। রক্তদান স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো বলছে, বছরে মোট চাহিদার ৬০ শতাংশ রক্ত পাওয়া যায়, ঘাটতি থাকে আরো ৪০ শতাংশ। বিশেষ করে করোনাকালীন এই সময়টিতে এই সংকট আরো বেড়েছে। কোভিড-১৯ কেন্দ্রিক আতঙ্ক থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে ও সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা রোধে রক্তদানের মতো মহত্ কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে অনেকে। ফলে রক্তের অভাবে মৃতের সংখ্যাও বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র এক ভাগ নিয়মিত রক্তদান করলে এই ঘাটতি অনায়াসেই পূরণ করা সম্ভব।
২০২০ সালের একটি অনলাইন প্রতিবেদন অনুসারে ২০১৯ সালে বাংলাদেশে সর্বমোট প্রায় ১৩ লাখ ব্যাগ বিশুদ্ধ রক্তের চাহিদা ছিল। এই চাহিদার বিপরীতে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মিলে প্রায় ১০.৫ লাখ ব্যাগ রক্ত সরবরাহ করতে সক্ষম হয়। সরবরাহকৃত এই রক্তের বেশির ভাগ ছিল রিলেটিভ ডোনার, ৩০-৩৫ শতাংশ ছিল বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হতে।
বর্তমানে আমাদের সমাজে রক্তদানকে কেন্দ্র করে অনেক বিভ্রান্তি ছড়িয়ে আছে। অনেকে মনে করেন কাউকে রক্ত দিলে নিজের শরীরে অনেক ঘটতি হয় যা একেবারেই সঠিক নয়। বরং রক্তদান করলে বাড়তি নিজেরই অনেক উপকার হয়। যে কোনো সুস্থ-সবল মানুষ রক্তদান করলে রক্তদাতার স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি হয় না। এমনিতেই রক্তের লোহিত কণিকাগুলো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় চার মাস পরপর নষ্ট হয়ে যায়। তাই অকারণে নষ্ট করার চেয়ে তা স্বেচ্ছায় অন্যের জীবন বাঁচাতে দান করলে মানুষের জীবনও বাঁচানো যায়। সামান্য পরিমাণে রক্তদানের মাধ্যমে একটি জীবন বাঁচানো নিঃসন্দেহে মহত্ কাজ।
নিয়মিত রক্তদান করা একটি ভালো অভ্যাস। রক্তদান করা কোনো দুঃসাহসিক বা স্বাস্থ্যঝুঁকির কাজ নয়। বরং এর জন্য একটি সুন্দর মন থাকাই যথেষ্ট। রক্তদাতার শরীরের কোনো ক্ষতি তো হয়ই না, বরং নিয়মিত রক্তদান করলে বেশ কিছু উপকারও পাওয়া যায়। শরীরে রক্তকণিকা তৈরির কারখানা হলো অস্থিমজ্জা। নিয়মিত রক্তদান করলে অস্থিমজ্জা থেকে নতুন কণিকা তৈরির চাপ থাকে। এতে অস্থিমজ্জা সক্রিয় থাকে। এতে যে কোনো দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো কারণে হঠাত্ রক্তক্ষরণ হলেও শরীর খুব সহজেই তা পূরণ করতে পারে।
রক্তদানে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমে এবং রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রাও কমে যায়। ফলে হূদেরাগ, স্ট্রোক ইত্যাদি মারাত্মক রোগের সম্ভাবনা হ্রাস পায়। হার্ট ভালো থাকে এবং রক্তদাতা সুস্থ ও প্রাণবন্ত থাকেন। স্বেচ্ছায় রক্ত দিলে শুধু অন্যের জীবন বাঁচানো নয়, বরং নিজের জীবনও ঝুঁকিমুক্ত রাখা সম্ভব হবে। রক্ত নিয়ে একটি প্রাণ বেঁচে উঠবে, এর চেয়ে বড় প্রশান্তির আর কী আছে। তাই প্রত্যেক সুস্থ ও রক্তদানে সক্ষম ব্যক্তির উচিত স্বেচ্ছায় বিনা মূল্যে রক্তদান করা এবং অন্যকে স্বেচ্ছায় রক্তদানে উত্সাহিত করা।
n লেখক :শিক্ষার্থী, দারুননাজাত সিদ্দিকীয়া কামিল মাদ্রাসা, ডেমরা, ঢাকা