যেন দিন বদলের হাওয়া লেগেছে। পৃথিবীর সবকিছুরই একটা শেষ আছে। আমরা জানি, করোনা মহামারিও একসময় এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হবে। সেই দিন আর বেশি দূরে নয়। ইতিমধ্যে ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়েছে, পৃথিবীর অনেক মানুষই তা গ্রহণ করেছে। করোনাকে পুরোপুরি বিলীন করার উপায় এখনো বের না হলেও এর সঙ্গে ঠিকই সমপরিমাণে যুদ্ধ করে যাচ্ছি আমরা। যার কারণে মৃত্যু থেকেও সুস্থ হয়ে ওঠার হার অনেক বেশি।
কথা ছিল করোনা শনাক্তের হার ১০ শতাংশ হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হবে। সরকার কথা রেখেছে। ১২ তারিখে খুলে দেওয়া হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দুই বছর আমরা অন্যরকম জীবনে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ায় স্কুলে ফিরে মানিয়ে নেওয়া হয়তো একটু কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বলতে হবে, স্কুলে ফেরাটা খারাপ সময় থেকে হাফ ছেড়ে বাঁচার শুরুর ইঙ্গিত। আমরা আবার প্রাণের স্রোতে তাল মেলাব। এটাই বড় পাওয়া। একটা দেশের শিশু-কিশোরেরা শিক্ষা থেকে দূরে থাকা মানে দেশের মেরুদণ্ডকে বাঁকা করে রাখা। করোনা পেন্ডামিকে শিশু-কিশোরেরা শিক্ষা থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। এই দূরে সরে যাওয়ায় প্রচুর ব্যাঘাত ঘটিয়েছ তাদের মানসিক স্বাস্থ্যেও। বিদ্যালয় শুধু যে পাঠ্য শিক্ষা গ্রহণের স্থান তা কিন্তু নয়। বিদ্যালয় হচ্ছে সেই সামাজিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে সামাজিকতা আদান-প্রদান হয়। বেশির ভাগ শিশু-কিশোরের জীবনে বন্ধু কথাটি আসে বিদ্যালয় থেকেই। মানুষ একা বাঁচতে পারে না। মানুষকে তার ভাবনা আদান-প্রদান করতে হয়। এই আদান-প্রদানের অন্যতম স্থান হলো বিদ্যালয়। আর সেই জায়গা থেকেই প্রায় দীর্ঘ ১৮ মাস দূরে ছিল আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা, যার ফলে যেমন পড়ালেখায় অনীহা সৃষ্টি হয়েছিল, তেমনি সৃষ্টি হয়েছিল মানসিক অসুস্থতা, বেড়েছিল আত্মহত্যা। আত্মহত্যার মূল কারণ বিষণ্নতা। আর বিষণ্নতা সৃষ্টি হয় একাকিত্ব থেকে। দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে দূরে থাকা ঘরবন্দি জীবন শিশু-কিশোরকে একা করে ফেলেছিল।
সরকার বাধ্য হয়েছিল অটো পাশের মতো সিদ্ধান্ত নিতে। আমরা জানি যে এমন সিদ্ধান্ত এর আগে এসেছিল যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে, ৫০ বছর আগে। এখনো আমরা যুদ্ধে আছি, তবে তা অদৃশ্য প্রাকৃতিক শক্তি করোনার সঙ্গে। যার সঙ্গে লড়াই করতে প্রয়োজন আমাদের মানসিক দৃঢ়তা। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার কাছে রাখতে ব্যবস্থা হয়েছিল অনলাইন শিক্ষার। কিন্তু এভাবে দিনের পর দিন যন্ত্রের সঙ্গে বসবাস শুধু মানসিক অসুস্থতার কারণ নয়, যা অনেক ভয়াবহ শারীরিক অসুস্থতারও কারণ। তাছাড়া অনলাইন শিক্ষা গ্রহণের জন্য স্মার্ট ডিভাইস কেনার সামর্থ্য আমার দেশের অনেক পরিবারেরই হয়ে ওঠেনি। প্রত্যন্ত অঞ্চলে রয়েছে নেটওয়ার্কের সমস্যা। সব মিলে অনেক শিক্ষার্থী অকালে ঝরে পড়েছে।
ইতিমধ্যে বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা সেশনজটের মতো বিপর্যয়ে আছে। গ্র্যাজুয়েশন প্রত্যাশী অনেক শিক্ষার্থী এখনো প্রতীক্ষারত। আশা করি বিদ্যালয়ের পর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাক্ষেত্রেও খুব শিগিগর সুদিন আসবে, যা খুবই জরুরি। এবং করোনাও পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে খুব তাড়াতাড়ি।
n লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়