আফগানিস্তানের ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে এখন তালেবান। সরকার গঠন করেছে। শপথ না নিলেও সরকারের কার্যক্রম চলছে ঢিলেতালে। ব্যাংক খোলা, কিন্তু টাকা নেই। এটিএম বুথের সামনে দিন-রাত মানুষের অপেক্ষা, কখন টাকা ঢুকবে মেশিনে। অর্থের অভাবে মানুষ জীবন বাঁচানোর জন্য ঘরের আসবাবপত্র পর্যন্ত বিক্রি করছেন। জাতিসংঘও আফগানিস্তানকে ৬০ কোটি ডলার সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে। যদিও সংস্থাটি বলেছে, ক্ষমতায় আসার পর তালেবান কোনো অঙ্গীকারই রক্ষা করেনি। এদিকে তালেবান তার সদস্যদের দায়িত্ব পালনকালে ইউনিফর্ম বা উর্দি পরার নির্দেশ দিয়েছেন।
চরম অর্থসংকটে
আফগানিস্তানের অধিকাংশ পরিবারই এখন অর্থের অভাবে ভুগছেন। তালেবান ক্ষমতায় এলেও তাদের অর্থসংকট দূর করতে পারেইনি, বরং আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যাংক খোলা থাকলেও টাকা নেই, এটিএম বুথগুলোও খোলা, কিন্তু টাকা নেই। গ্রাহকরা দিন-রাত বসে আছেন কখন বুথগুলোতে টাকা ঢোকানো হবে এবং তারা তুলে নিয়ে বাজার করবেন। গত বছরের খরা, করোনা মহামারি এবং তালেবানের ক্ষমতা দখল অর্থসংকটকে বাড়িয়েছে। বিশেষ করে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর বিশ্ব স্বেচ্ছাসেবা সংস্থা এবং বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফ অর্থসহায়তা বন্ধ করে দিয়েছে। ১১ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভও আটকে গেছে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে। বিশেষ করে ৯ বিলিয়ন ডলারই আছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। তালেবানের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেছেন, দেশের অর্থনৈতিক সংকট পুনরুদ্ধারে চীন ও রাশিয়ার সহায়তার ওপর নির্ভর করা হচ্ছে। কিন্তু দেশ দুটি অঙ্গীকার করলেও কোনো অর্থ এখনো আসেনি। চীন ইতিমধ্যে ৩ কোটি ডলারের বেশি আফগানিস্তানকে অর্থসহায়তা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ সতর্ক করেছে, ২০২২ সালের মধ্যে দেশটির ৯৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবে। এরই মধ্যে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ৬০ কোটি ডলার সহায়তা চেয়েছে। এর বেশির ভাগই যাবে আফগানদের খাদ্য সরবরাহ করতে। গত মাসে আফগানিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আজমল আহমাদি জানিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করে তাহলে জিডিপি ২০ শতাংশেরও নিচে নেমে যাবে। বিশ্বব্যাংক বলছে, কোনো দেশের জিডিপির ১০ শতাংশ যদি বিদেশি তহবিলের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে বিদেশিদের ওপরই তারা নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। আর আফগানিস্তানের জিডিপির ৪০ শতাংশই গত ২০ বছর ধরে বিদেশি তহবিলের ওপর নির্ভরশীল। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশটির অর্থনীতি একেবারেই ধসে পড়বে।
আসবাবপত্র বিক্রি করছেন আফগানরা
কাবুলের রাস্তায় অনেক স্থানেই দেখা যাচ্ছে, ঘরের আসবাবপত্র নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন নাগরিকরা। এদের মধ্যে একজন শুকরুল্লাহ। তিনি চারটি কার্পেট নিয়ে এসেছেন। চামোন-হজোরির পুরোটা এলাকাতেই বালিশ, কুশন, ফ্যান, কম্বল, সিলভারওয়্যার, কারটেইনস, বিছানা, ম্যাট্রেস, কুকওয়্যার, শেলভস এবং আরো অনেক জিনিসপত্র পড়ে আছে। শুকরুল্লাহ বলেন, আমি চারটি কার্পেট কিনেছিলাম ৫৫৬ ডলারে। কিন্তু এখন বিক্রি করে ৫৮ ডলারও পাব না।
কথা রাখেনি তালেবান : জাতিসংঘ
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাশেলেট বলেন, গত মাসে কট্টর ইসলামপন্থি সংগঠন তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পর বিপজ্জনক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছেন দেশটির সাধারণ নাগরিকরা। তালেবান নারীদের ঘরে থাকতে বলছে, কিশোরীদের স্কুলে যেতে নিষেধ করছে এবং শত্রুদের ঘরে হানা দিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে। এতে নারীর পাশাপাশি জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অনেকে গভীর উত্কণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে সোমবার মিশেল ব্যাশেলেট আরো বলেন, গত তিন সপ্তাহে বহুবার নারী অধিকারের পক্ষে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেয় তালেবান। পরিবর্তে জনপরিসরে আফগান নারীদের উপস্থিতি ধীরে ধীরে বিলীন করে দেওয়া হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে রবিবার তালেবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ সংবাদসংস্থা ডিপিএকে জানিয়েছেন, তালেবান যোদ্ধাদের ইউনিফর্ম বা উর্দি পরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই মুহূর্তে তালেবান যোদ্ধাদের একটি বড় দল কাবুল বিমানবন্দরের সুরক্ষার দায়িত্বে। তাদের কিছুদিন আগেই উর্দি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাকি যোদ্ধারা সাদা পোশাকেই ঘুরছিলেন। এবার তাদেরও উর্দি পরতে হবে। মুজাহিদ ইঙ্গিত দিয়েছেন, ঐ তালেবান যোদ্ধাদেরই পুলিশে নিয়ে নেওয়া হবে। উর্দি পরলে কারা অন্যায় অত্যাচার করছে, তা স্পষ্ট হবে। ব্যবস্থাও নেওয়া যাবে।
কাতারের প্রতিনিধিদল আফগানিস্তানে
গত রবিবারই কাবুলে পৌঁছে কাতারের প্রতিনিধিদল। দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেই প্রতিনিধিদলের নেতা। কাবুলের রাজপ্রাসাদে তারা দেখা করেছেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে একাধিক বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে বলে তালেবান সূত্র সংবাদসংস্থাকে জানিয়েছেন। এই প্রথম সরকারিভাবে কোনো দেশের প্রতিনিধিদল আফগানিস্তানে গিয়ে তালেবান প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করল। তালেবান সূত্রের দাবি, বিশ্বের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং দেশের উন্নয়ন নিয়ে কথা হয়েছে।
খাবার কিনতে রাজধানী কাবুলের চামোন-হজোরি এলাকায় এভাবেই ঘরের আসবাবপত্র বিক্রি করছেন আফগানরা —সংগৃহীত