চলচ্চিত্র শিল্পের বালিঘড়ি উল্টে গেছে!

তানভীর তারেক

 

ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির বালিঘড়ি উল্টে গেছে গত কয়েক বছরে। উঠতি থেকে প্রতিষ্ঠিত অভিনয়শিল্পীদের এখনকার মূল আগ্রহের জায়গা তাই এখন ফ্যান্টাসি নির্ভর ছবিতে নয়। বরং গল্প নির্ভর ছবিতেই আগ্রহ বেশি তাদের। এক সময় টিভি নাটক নির্মাণ থেকে যারা ফিল্ম করতে শুরু করেছিলেন, তাদের নানাভাবেই এফডিসি ঘরানার নির্মাতারা কটাক্ষ করতেন। একাধিক টকশোতে বিভিন্ন মন্তব্যে মানতে চাইতেন না যে, টিভি নাটক নির্মাতারাও ভালোমানের চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারেন! এমনকি শিল্পমানসম্পন্ন ছবি নির্মাণ করলেও এফডিসি ঘরানার নির্মাতারা বলতেন, ‘একে সিনেমা বলা যাবে না, পুরোটাই নাটকের মতো হয়েছে!’

অথচ আজ তারাই নিজেদের মেধাহীনতা এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের আপডেট না করতে করতে দূরে সরে গেছেন। স্মৃতির জাবর কেটেই দিন কাটাচ্ছেন! আজ চলচ্চিত্রের মূল আগ্রহের জায়গায় মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী, নুরুল আলম আতিক, গিয়াস উদ্দিন সেলিম, অমিতাভ রেজা চৌধুরীর মতো মেধাবী নির্মাতারা।

অন্যদিকে ‘সিনেমা হল সংকট’ শব্দটি এখন ভুল শব্দ। বরং বলা ভালো ‘সিনেমা হল প্রায়শূন্য’ ইন্ডাস্ট্রি চলমান। আর এই ইন্ডাস্ট্রিতে যখন আধুনিক ডিভাইস আর ফেস্টিভ্যালে দর্শকদের বুঁদ হওয়া চোখ তখন রাজত্ব তাদেরই।

এই স্রোতের বিপরীতে চলার যুদ্ধটা শুরু করেছিলেন তারেক মাসুদ, তানভীর মোকাম্মেল, মোরশেদুল ইসলামের মতো বরেণ্য নির্মাতারা। এরপরের প্রজন্মে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী একেবারেই ভিন্ন ব্যঞ্জনার চলচ্চিত্র নির্মাণ করে চমকে দেন। তরুণ দর্শকদের কোলাহল-তর্ক-মুগ্ধতার কেন্দ্রে চলে আসেন তারা। কালের খেয়ায় স্বপ্নবাজ নির্মাতা ফারুকীর একগোষ্ঠী সহকারীরাই আজ টিভি-সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। সুদুরপ্রসারী ভাবনায় পথ এগুলে যে এক সময় দারুণ এক সাফল্য পাওয়া যায় তাই প্রমাণ করেছেন নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।

এ প্রসঙ্গে নির্মাতা গিয়াস উদ্দিন সেলিম বললেন, ‘না আমার অবশ্য ফারুকীর মতো কোনো শিষ্য সাগরেদ নেই। তবে আমি একটু ভিন্ন অঙ্কে বিষয়টির ব্যাখ্যা দিতে চাই।’

সেলিম বলেন, ‘দেখুন, আমাদের চলচ্চিত্রের মূল বিকাশটা তো জহির রায়হান, খান আতাউর রহমান, আলমগীর কবিরদের হাত ধরে। তারা কিন্তু তাদের সিনেমায় আমাদের দেশের গল্প দেখাতেন। অর্থাত্ গ্রাম বাংলা, মফস্বলের গল্প। যা আমাদের সকলের শৈশব, তারুণ্যে এখনো উজ্জ্বল। এসব আমাদের যাপিত জীবনের গল্প। এরপর হঠাত্ করে কজন নির্মাতা আমাদের সিনেমায় হংকংয়ের গল্প ঢুকিয়ে দিলেন। অর্থাত্ আমি বলতে চাচ্ছি কুংফু ক্যারাতে তো আমাদের সমাজকে বহন করে না। এই উদ্ভট ফ্যান্টাসি হিট হতে লাগল। একের পর এক ছবি হতে লাগল। এরপর শুরু হলো তামিল, তেলেগু এবং মুম্বাই মসলার ছবি। অর্থাত্ আমাদের দেশের চলচ্চিত্র নির্মাতারা নিজের দেশের গল্প থেকে সরে গেলেন, ঢুকে গেলেন কপি-পেস্টের দুনিয়ায়। বলা নেই কওয়া নেই গান, নাচ ফাইট শুরু-এই উদ্ভট দৃশ্যকল্প কিন্তু স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে তেমন ছিল না। আপনি খেয়াল করে দেখবেন তারেক মাসুদ, মোরশেদুল ইসলাম থেকে শুরু করে আমরা যারা নতুন জেনারেশনের ছবি দেখাচ্ছি, তারা কিন্তু এদেশের গল্প বলার চেষ্টা করছি। মানে আমাদের নিজেদের সংস্কৃতির গল্প।’

নির্মাতা গিয়াস উদ্দিন সেলিম মূল বিষয়টিই তুলে ধরেছেন। কারণ এ সময় একাধিক বিদেশি অ্যাপের কল্যাণে দর্শকরা সারাবিশ্বের ছবি দেখছে। ফলে দর্শক চোখও ম্যাচিউরড হচ্ছে। এর কারণেই মূলত আমাদের চলচ্চিত্রের গল্পে দারুণ এক পরিবর্তন এসেছে। এছাড়া ২০ বছর আগে এদেশে ফিল্ম নিয়ে পড়াশোনা বা কোনো রেফারেন্স ছিল না। ধীরে ধীরে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়ার মতো নতুন অনুষদ গড়ে ওঠায় পট পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। আজ থেকে ৫/১০ বছরের ভেতরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র এর সুফল অনুভব করতে পারবে। একইসঙ্গে দুই ধারার ছবির যে সাংঘর্ষিক অবস্থান ছিল, সেই বালিঘড়িও আজ প্রায় উল্টে গেছে।

যার অবাক সাফল্য তরুণ নির্মাতা সাদের ছবি কানের অফিসিয়াল সিলেকশনে স্থান পাওয়া, মোস্তফা সারওয়ার ফারুকীর ছবিতে ইরফান খান, নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকীসহ একাধিক আন্তর্জাতিক তারকার সংযুক্ত হওয়া। এ আর রহমানের মতো অস্কার জয়ী মিউজিক প্রডিউডসার নির্মাতার সহ-প্রযোজক হিসেবে কাজ করা, মনপুরার মতো গ্রামবাংলার সরল প্রেমের গল্প বলে ব্লকবাস্টার হওয়া, অমিতাভ রেজার প্রথম ছবি আয়নাবাজি দিয়ে বাজিমাত করা। মার্কিন লেখকের গল্পে, মার্কিন প্রযোজকের ছবিতে অমিতাভের রিকশাগার্ল-এর নির্মাণ। এর বাইরে বিচ্ছিন্নভাবে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে প্রবাসে অনেকেই দেশের মুখ উজ্জ্বল করছে। তাদের ভেতরে অন্যতম একাধিক অস্কার জয়ী কারিগরী নির্মাতা নাফিস বিন জাফর, রুবাইয়াত, কামরান আহমেদ সাইমন থেকে শুরু করে অনেকে।

সাফল্যের অঙ্কে তাই যে শ্রেণির দর্শকরা হলবিমুখ হয়ে যাচ্ছেন বলে হা-হুতাশ চলছিল তাদের ফেরানোর কাজটিই করেছেন এ সময়ে এ সকল মেধাবী নির্মাতারা। সঙ্গে নিয়মিত সিনেমা পাগল দর্শক তো রয়েছেই। তাই নিজের দেশের গল্প, নিজের সংস্কৃতির গল্প বলেই পুরনো বালিঘড়ি উল্টে দিতে পেরেছেন তারা। এই তালিকার, এই ঘরানার নির্মাতার সংখ্যা এখন একাধিক।

অন্যদিকে দীর্ঘকালের হতাশাগ্রস্তরা প্রতিনিয়ত যখন সিনেমা শেষ হয়ে গেল! শেষ হয়ে গেল! বলে জপ করছিলেন তারা কাজ না করে হতাশার বুলি বলেই যাচ্ছেন। অন্যদিকে স্বাধীন ভাবনার নির্মাতারা একের পর এক এদেশের গল্প, কালচার নিয়ে বিশ্বায়ণের ঘোরে কাজ করছেন। স্বপ্ন দেখছেন। দেখাচ্ছেন নতুন বাংলাদেশকে।