ব্রেইল সংস্করণ :পিস অ্যান্ড হারমোনি

ব্রেইল এক বিশেষ ধরনের লিখনব্যবস্থা। দুই হাতের সাহায্যে এই লিপির পাঠ গ্রহণ করতে হয়। দুর্বল দৃষ্টিশক্তি বা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশু ও ব্যক্তিদের পাঠদানের জন্য এই লিখন প্রক্রিয়া উদ্ভাবিত হয়েছে।

মানুষ নিরক্ষর বা দৃষ্টিহীন হলে যে জ্ঞানী হবে না, এ কথা মানা যায় না। প্রবাদ আছে, ইলিয়ড মহাকাব্য ‘অন্ধকবি’ হোমারের রচনা। এই মহাগ্রন্থ পাঠ করলে এ তথ্য স্বীকারে আমার মতো অনেকেই দ্বিধান্বিত হবেন। আমাদের বাউল সাধক ফকির লালন শাহের গানের অন্তর্গত তত্ত্ব ও লালন দর্শন আমাদের যুগপত্ মুগ্ধ ও বিস্মিত করে। আমরা জানি না, কোন বিদ্যালয়ে লালন শাহ পাঠ গ্রহণ করেছিলেন। ‘অন্ধজনে দেহ আলো’—এ কথা বহু উচ্চারিত, গভীরভাবে তাত্পর্যপূর্ণ এবং আমাদের তা মানবিক দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানায়। কিন্তু আমরা খুব কমই এই আহ্বানে সাড়া দিই। বস্তুত দেশের দৃষ্টিহীন ও নিরক্ষরদের শিক্ষিত ও সাক্ষর করে তোলার এবং তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টির দায়িত্ব আমাদের সবার। এতকাল সেই সুযোগ ছিল না। কিন্তু এখন তো সেই প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি (devise) আমরা পেয়েছি। কয়েকটি শিক্ষাকেন্দ্রের ওপর নির্ভর করে তাই দায়মুক্তির সুযোগ নেই। এই মানবিক দায়িত্ব আমাদের সবার। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই এক্ষেত্রে সুফল বয়ে আনতে পারে।

গ্রন্থ ‘পিস অ্যান্ড হারমোনি’ (২০২০) ব্রেইল পদ্ধতিতে মুদ্রিত বঙ্গবন্ধুর আত্মজা ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উত্সর্গীকৃত। গ্রন্থটির ব্রেইল সংস্করণের পরিকল্পক, সংকলক, ইংরেজি অনুবাদক ও সম্পাদক আনিস মুহম্মদ। প্রচ্ছদ শিল্পী মাসুক হেলাল। গ্রন্থবদ্ধ কবিতার সংখ্যা ৭১।

ইতিহাসে একটি কথা আছে :ইতিহাসের শিক্ষা সবাই গ্রহণ করতে পারে না। যারা পারে, তারা সৃষ্টি করে নতুন ইতিহাস। জাতির পিতা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই চেতনায় পুনর্জাত ও প্রতিজ্ঞাদীপ্ত হয়েছিলেন। সবার মধ্যে অবস্থান করেও তিনি চেতনায় ছিলেন ব্যতিক্রমী এবং নিজের প্রতিজ্ঞায় সুস্থির। সমকালীন রাজনৈতিক ধারা তাকে টানেনি। অভিজ্ঞতা দিয়ে তিনি বুঝেছিলেন যে, দ্বিজাতিতত্ত্বে মানুষে মানুষে বিরোধের প্রাচীর ক্রমান্বয়ে প্রসারিত ও দুর্লঙ্ঘ্য হয়ে উঠবে। ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের পরিচয়কে প্রাধান্য দিলে এদেশের মানুষ হবে আরো নিঃসঙ্গ ও পরস্পর দূরবর্তী। ধর্ম ও বর্ণের ঊর্ধ্বে মানুষ, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’। ভাষা-সংস্কৃতিগত বৈচিত্র্য তো থাকতেই পারে। এই ভূখণ্ডে সুদীর্ঘকাল ধরে যে জনগোষ্ঠী বংশপরম্পরায় বাস করে আসছে, এদেশের প্রকৃতি ও জল-হাওয়ায় যারা লালিত ও পুষ্ট হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও অচ্ছেদ্য আত্মীয়তার বন্ধন। তারা কখনোই পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। তারা একে অন্যের সহমর্মী, সমব্যথী ও আনন্দ-বেদনার সঙ্গী। তাদের রাষ্ট্র পরিচালনার প্রাধিকার এ দেশের মাটি ও মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর থাকতে পারে না। জল-জলা-জঙ্গল অধ্যুষিত বাংলার সন্তান বঙ্গবন্ধুরই কেবল সেই অধিকার রয়েছে। তার নেতৃত্বেই আমাদের দেশবাসীর স্বপ্ন ও অধিকার বাস্তবনিষ্ঠ রূপ পেয়েছে। এর জন্য তাকে অপরিসীম ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, সহ্য করতে হয়েছে জেল-জুলুমসহ অশেষ নিগ্রহ। পাকিস্তানি শাসক চক্র তাকে শুধু বন্দি ও কারারুদ্ধই করেনি; তাকে হত্যার যড়যন্ত্র পর্যন্ত করেছিল। কিন্তু কুচক্রীদের সব অপচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। তিনি ফিরে আসেন তার সোনার বাংলায়, তার বাংলার মানুষের কাছে। তিনি শুরু করেছিলেন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে; কিন্তু আরাধ্য সব কর্ম সম্পাদনের সুযোগ পাননি। একাত্তরের পরাজিত শক্তি ও তাদের এদেশীয় দোসরদের চক্রান্তে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তিনি সপরিবারে শহিদ হন। ব্যতিক্রম কেবল তার দুই কন্যা—শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। বিদেশে অবস্থানের কারণে এই জিঘাংসা তাঁদের স্পর্শ করতে পারেনি।

ব্যক্তিমাত্রেরই জন্ম-মৃত্যু রয়েছে। কিন্তু যেসব মানুষ ব্যক্তি-ঊর্ধ্ব তাত্পর্যবিশিষ্ট ও মহিমান্বিত, তাদের ক্ষেত্রে এ কথা বলা যায় না। বঙ্গবন্ধু সেই বিরল মহিমায় গৌরবান্বিত। তিনি শুধু আমাদের জাতিসত্তার স্থপতি, জাতিরাষ্ট্র গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা নন, সব নিপীড়িত ও স্বাধীনতাহীন জাতি ও মুক্তিকামী মানুষের প্রেরণা, শক্তি ও সাহসের অফুরন্ত উত্স।

বঙ্গবন্ধু যে প্রতিজ্ঞায় ও প্রত্যয়ে সোনার বাংলা গড়ার চেষ্টায় রত হয়েছিলেন, ১৫ই আগস্টের পর তা শুধু পরিত্যক্ত হয়নি বরং ইতিহাসের চাকা উলটো দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা হয়েছে। একাত্তরের পরাজিত শক্তির নখদন্ত বিস্তারে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে এ দেশ। সচেতন মানুষ নীরবে অশ্রুপাত করেছে—বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে একদা যারা মৃত্যুচিন্তাকে ছিন্নবস্ত্রের মতো পরিত্যাগ করে মরণপণ সংগ্রামে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, সেই সব বীর মুক্তিযোদ্ধা স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার উদ্দীপনাদীপ্ত জনতা। অতঃপর দেশের মানুষের আহ্বানে জন্মভূমিতে প্রত্যাবর্তন করেন শেখ হাসিনা, হাল ধরেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের। তিনি জাতির পিতার চেতনায় উজ্জীবিত এবং সেই একই সংকল্পে ও প্রত্যয়ে সুদৃঢ়।

মোট ৭১টি কবিতা এই গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। সংকলনবদ্ধ কবিতাগুলো ব্রেইল পদ্ধতিতে প্রকাশিত হওয়ায় এগুলোর পাঠকসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই গ্রন্থ প্রস্তুত ও প্রকাশে যারা নিয়োজিত হয়েছেন, তাদের প্রচেষ্টা ও প্রেরণা অবশ্যই প্রশংসনীয়।

n লেখক :মহাপরিচালক, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট