জলবায়ুর পরিবর্তন এখন ‘ভাঁওতাবাজি’ নহে

কবিগুরু বলিয়াছেন, ‘যতই সভ্যতা বৃদ্ধি হইয়াছে, ততই প্রকৃতির কার্যে মানুষের হস্তক্ষেপ বাড়িয়া আসিয়াছে; অবশেষে শিল্প ও বিজ্ঞানের উন্নতি-সহকারে মানব-বহির্ভূত প্রকৃতির উপরে মানুষের প্রভাব এতই প্রবল হইয়াছে যে, পুরাকালে ইন্দ্রজালেরও এত ক্ষমতা লোকে বিশ্বাস করিত না।’ আর ইহাই আজ আমাদের এই বসবাসের পৃথিবীর জন্য কাল হইয়া দাঁড়াইয়াছে। মানুষের উন্নয়নের জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য মানুষের যে অগ্রগতি, তাহা অস্বীকার বা উপেক্ষা করা যায় না; কিন্তু সেই অগ্রগতির প্রতিযোগিতার ফাঁদে পড়িয়া যদি প্রকৃতি তাহার স্বাভাবিক গতিতে চলিতে না পারে, তাহা হইলে প্রকৃতি তাহার মতো করিয়া প্রতিশোধ লইবে, ইহাই স্বাভাবিক। আর এই সত্যই মানবজগত্, বিশেষ করিয়া শিল্পের প্রতিযোগী রাষ্ট্রগুলি বুঝিয়া উঠিতে পারে নাই। 

তাহারই পরিণাম এখন হাড়ে হাড়ে অনুভূত হইতেছে। মাত্র কয়েক বত্সর পূর্বেও পরিবেশবিজ্ঞানী, গবেষকরা ভবিষ্যত্ সম্পর্কে সতর্ক করিয়া বলিয়াছিলেন, বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তন হইতেছে চক্রবৃদ্ধি হারে এবং আগামী ৫০ বত্সর পরে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ পানিতে ডুবিয়া যাইবে, অধিক বর্ষা, অধিক খরায় খাদ্য উত্পাদন কমিবে, দাবানলের ঘটনা অনেকাংশে বৃদ্ধি পাইবে; কিন্তু এখন তাহারা অতি উদ্বেগের সঙ্গে বলিতেছেন, যাহা ভাবা হইয়াছিল তাহার চাইতে অনেক গুণ দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়িতেছে। এতটাই দ্রুত যে তাহা কেহ কল্পনা করে নাই! আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি ঘোষণা করিয়াছেন, জলবায়ু এত দ্রুত পরিবর্তিত হইতেছে যে, এই হারে পরিবর্তন হইতে থাকিলে মানবজাতি ইহার সহিত খাপ খাওয়াইয়া লইতে পারিবে না। বাস্তবেও আমরা তাহাই দেখিতে পাইতেছি। গত কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্রে যে ভয়াবহ বন্যা, দাবানল ও বৃষ্টিপাত হইয়াছে তাহা স্মরণকালের তো বটেই, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘হিস্টোরিক’ বলিয়া জানানো হইয়াছে। ইউরোপ ও আমেরিকাসহ বেশ কয়েকটি দেশে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করিয়াছে, যাহা পূর্বে কখনোই ঘটে নাই। এই বত্সর দাবানলে যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, তুরস্ক, ইতালি, অস্ট্রেলিয়াসহ বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র ইহার সহিত দিনের পর দিন সপ্তাহের পর সপ্তাহ দাবানল প্রত্যক্ষ করিয়াছে, যাহা পূর্বে কখনো দেখা যায় নাই। যুক্তরাষ্ট্রে একের পর এক ঝড় আসিয়া ঝাঁপাইয়া পড়িতেছে। আর এই সকল কারণেই বিশ্বের বৃহত্ রাষ্ট্রগুলি যাহার পর নাই উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিয়াছে। জলবায়ু পরিবর্তন আমেরিকান জাতির প্রতি রক্তচক্ষু রাঙাইতেছে বলিয়া গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন উল্লেখ করিয়াছেন। অথচ তাহারই পূর্বসূরি সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প (রিপাবলিকান দলের) বিজ্ঞানীদের সতর্কতাকে উপেক্ষা করিয়া বলিয়াছিলেন, বিজ্ঞানীরা প্রকৃত ঘটনা জানেন না(!)। তিনি জলবায়ু পরিবর্তনকে একটি ব্যয়বহুল ভাঁওতাবাজি, অস্তিত্বহীন শঙ্কা বলিয়া উল্লেখ করিয়াছিলেন। তিনি অতি ব্যবসায়ী মানুষ, তাই তাহার মনে হইয়াছে ইহার পিছনে অন্যদের ব্যবসায়ী ষড়যন্ত্র রহিয়াছে। ইহাই তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হইয়াও পূর্ব হইতেই বিশ্বাস করিতেন। ২০১২ সালে তিনি বলিয়াছিলেন, জলবায়ু পরিবর্তন চীনের সৃষ্ট এবং ইহা করা হইয়াছে যাহাতে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প উত্পাদন প্রতিযোগিতায় টিকিয়া থাকিতে না পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বাইডেন প্রশাসন অত্যন্ত গুরুত্বের সহিত লইয়াছে। তাহারা ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসারণ ৫০ শতাংশ নামাইয়া আনিবার ঘোষণা দিয়াছে। হোয়াইট হাউজ ঘোষণা দিয়াছে, আগামী সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সহিত প্রেসিডেন্ট বাইডেনের আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু হইবে জলবায়ুর পরিবর্তন। আমরা চাই—ডোনাল্ড ট্রাম্প বাঁচিয়া থাকুন এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও তাহার বিরুদ্ধে ব্যবস্থার নেওয়ার চেষ্টা দেখিয়া যান।

তবে জলবায়ু পরিবর্তন এমন একটি বিষয় যাহাতে ভুগিতে হইবে ধনী-দরিদ্র সকল রাষ্ট্রের সকল মানুষকেই। তাই কেবল ধনী দেশগুলির দিকে তাকাইয়া থাকিলে চলিবে না, নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী এই জলবায়ু মোকাবিলায় ঝাঁপাইয়া পড়িতে হইবে।