দেশে গ্যাসের চাহিদার চেয়ে সরবরাহ ঘাটতি আবারও বাড়ছে। ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরুর আগে যে পরিমাণ ঘাটতি ছিল, বর্তমানেও সেই একই পরিমাণ বা তার চেয়ে বেশি গ্যাস ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সর্বশেষ অর্থবছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার এলএনজি কেনা হয়েছে। চলতি বছরে এর পরিমাণ আরো বাড়বে। গ্যাস-সংকটের কারণে শিল্প উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক বাসাবাড়িতেও ঠিকভাবে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। বিদ্যুেকন্দ্রে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সরবরাহ বাড়াতে প্রতিদিন বিকাল ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত সিএনজি স্টেশনগুলো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। শিল্প ও বিদ্যুত্ উত্পাদন যত বাড়বে, গ্যাসের চাহিদাও তত বাড়বে। অথচ দেশে গ্যাসের প্রমাণিত মজুত ফুরিয়ে আসছে। জ্বালানি অনুসন্ধানে কাঙ্ক্ষিত পদক্ষেপ না থাকায় দেশীয় উত্স থেকে চাহিদা পুরোপুরি মেটানো অসম্ভব হয়ে গেছে। এমন প্রেক্ষাপটে ২০১৮ সাল থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি শুরু করে সরকার। সরকারি সংস্থা পেট্রোবাংলা এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সামিটের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের দৈনিক ৫০ কোটি ঘনফুট করে মোট ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে। শিল্প উত্পাদনের চাকা সচল রাখতে আপাতত সমাধান এই ব্যয়বহুল জ্বালানি। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, সেই ব্যয় বহন করতে হিমশিম খাচ্ছে জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা। অর্থের সংস্থান না থাকায় এ দুই টার্মিনালের পুরো সক্ষমতা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। অথচ সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ২০৪১ নাগাদ শুধু বিদ্যুেকন্দ্রের জন্যই দৈনিক ৩০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হবে।
ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের কয়েক জন শিল্প উদ্যোক্তা জানান, গত মার্চ থেকেই গ্যাসের সংকট বাড়তে শুরু করে। মে ও জুন মাসে তা কিছুটা কমলেও জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে তা বেড়েছে। গত ২০ দিন ধরে সংকট তীব্র হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা পেট্রোবাংলা সূত্রেও জানা যায়, গ্যাসের ঘাটতি কমাতে এলএনজি আমদানি শুরু হলেও তা পূর্ণ ক্ষমতায় করা যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় খোলাবাজার থেকে এলএনজি আমদানি বন্ধ রাখা হয়েছে। গত দুই সপ্তাহ ধরে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে দৈনিক এলএনজি সরবরাহ প্রায় ১০ কোটি ঘনফুট কমেছে। তিতাস গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির এক কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে তাদের আওতাধীন এলাকায় দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ১৯০ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে মিলছে সর্বোচ্চ ১৭০ কোটি ঘনফুট। অর্থাত্, দৈনিক ঘাটতি ২০ কোটি ঘনফুট। ফলে বিদ্যমান শিল্প কারখানা যেমন চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছে না, তেমনি গ্যাসের নিশ্চয়তা না পাওয়ায় অনেক শিল্প কারখানা যাত্রা শুরু করতে পারছে না। উত্পাদন ব্যাহত হওয়ায় কয়েকটি কারখানা বন্ধ হওয়ার পথে। গত সোমবার বিদ্যুত্ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানান, গ্যাস সংযোগের জন্য ২৫০টি শিল্প কারখানার আবেদন পড়ে রয়েছে, কিন্তু পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় সেগুলোতে এখন সংযোগ দেওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, চাহিদার চেয়ে সরবরাহ এখন কম রয়েছে। ঘাটতি দূর করতে এলএনজি আমদানি আরো বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশীয় উত্স থেকেও সংগ্রহ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। ব্যয়বহুল এলএনজি থেকে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ করা হলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, খরচ বেশি পড়লেও ব্যবসায়ীরা এখন গ্যাস চান। সেই সক্ষমতা তাঁদের রয়েছে। সরকার জোগান দেওয়ার চেষ্টা করছে।
এদিকে সাভার, জয়দেবপুর, আশুলিয়া, ময়মনসিংহ নারায়ণগঞ্জের কয়েক জন শিল্প উদ্যোক্তা জানান, দিনের কোনো কোনো সময়ে তাদের লাইনে গ্যাসের নির্ধারিত চাপ তিন ভাগের এক ভাগে নেমে আসে। তখন উত্পাদন বন্ধ রাখতে হয়। সে সময় নিজস্ব বিদ্যুত্ উত্পাদনের ক্যাপটিভ প্ল্যান্ট থেকেও বিদ্যুত্ উত্পাদন করতে পারে না ঐ শিল্পগুলো। ফলে শিল্প উত্পাদন, রপ্তানি কার্যক্রম ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জ্বালানি বিভাগের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, মহেশখালীতে আরেকটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। তবে বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম দ্রুত বাড়ছে। তাই বৈশ্বিক খোলা বাজার থেকে এলএনজি আমদানি স্থগিত করেছে সরকার। চুক্তিবদ্ধ দুই কোম্পানি—কাতারের রাসগ্যাস এবং ওমানের ওমান ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনালের (ওটিআই) কাছ থেকেই এখন এলএনজি আমদানি করা হবে। এর বাইরে কাতার কিংবা ওমানের অন্য আরেকটি কোম্পানি থেকে দীর্ঘ মেয়াদে এলএনজি আমদানি করার চুক্তি করা হবে। আগামী এক থেকে তিন মাসের মধ্যে এই চুক্তি করতে চায় সরকার। এমন পরিস্থিতিতে ১০টির বেশি কোম্পানি প্রস্তাবনা জমা দিয়েছে। এগুলোর মধ্যে ইএনওসি এবং এওটি নামে দুটি কোম্পানি রয়েছে। এওটি পাকিস্তানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকার পরও সম্প্রতি এলএনজি সরবরাহ করতে পারেনি। ঐ কর্মকর্তা বলেন, বিশ্ববাজারে যখন এলএনজির দাম বেশি থাকে, চুক্তিবদ্ধ কোম্পানির কাছ থেকে এলএনজি আমদানি করা অপেক্ষাকৃত ভালো। মূলত এমন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্যই দীর্ঘ মেয়াদে চুক্তি করা হয়। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে যখন দাম কমে যায়, তখন খোলাবাজার থেকে কিছু পরিমাণ আমদানি করা হলে অর্থ খরচ কম হয়। তিনি আরো বলেন, এলএনজি আমদানি বৃদ্ধির সঙ্গে আর্থিক সক্ষমতার সম্পর্ক রয়েছে। গত অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ২ হাজার ৮১২ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রদান করা হয়। এটি অর্থনীতিতে চাপ ফেলছে।
শিল্পের পাশাপাশি বিদ্যুত্, সিএনজি, সার এবং আবাসিকেও গ্যাসের সংকট চলছে। বিদ্যুতে সরবরাহ বাড়াতে প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা সিএনজি স্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার।
বর্তমানে দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা ৪৩০ কোটি ঘনফুট। গতকাল মঙ্গলবার পেট্রোবাংলা সরবরাহ করে ৩১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। ঘাটতি ছিল ১২০ কোটি ঘনফুট। ২০১৮ সালে যখন এলএনজি আমদানি করা হয়, তখন দেশে দৈনিক ৩৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ২৭৫ ঘনফুট। ঘাটতি ছিল ৮৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস। এলএনজি আমদানি শুরুর পর ঘাটতি অনেকখানি কমে গেলেও এখন তা আগের চেয়ে বেড়েছে। এর বড় কারণ দেশীয় উত্স থেকে জোগান কম থাকা। সাত-আট বছর আগেও দেশে দৈনিক গ্যাস উত্পাদন ২৭০ কোটি ঘনফুট থাকলেও বর্তমানে তা ২৪০-২৪৫ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। এ অবস্থায় সমুদ্রে গ্যাসপ্রাপ্তির বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও এখনো তা সন্ধানের কার্যক্রমই শুরু করা যায়নি।