দৈনিক ১৩০ টাকা বেতনের কম্পিউটার অপারেটর ৪৬০ কোটি টাকার মালিক

২০০১ সালে টেকনাফ স্থলবন্দরে দৈনিক চুক্তিভিত্তিক ১৩০ টাকায় কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরি নিয়েছিলেন নুরুল ইসলাম। আট বছর পর ২০০৯ সালে সেই চাকরিও ছেড়ে দেন। তবে নিজের আস্থাভাজন আরেক জনকে ঐ পদে নিয়োগের ব্যবস্থা করে জড়িয়ে পড়েন দালালি সিন্ডিকেটে। মাত্র ১৩০ টাকা দৈনিক মজুরিতে কাজ করা নুরুল ইসলাম এখন ৪৬০ কোটি টাকার সম্পদের মালিক। রয়েছে একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট, গড়ে তুলেছেন নামে-বেনামে একাধিক প্রতিষ্ঠান। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর কাওরান বাজার র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সদর দপ্তরের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে একটি গোয়েন্দা সংস্থা ও র্যাবের  যৌথ অভিযানে সোমবার মধ্যরাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে মো. নুরুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়। নুরুল ইসলাম ভোলা সদরের পশ্চিম কানাই নগরের মো. আব্দুল মোতালেবের ছেলে।

র্যাবের দাবি, টেকনাফ বন্দরে নিজের অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে চোরাকারবারি, শুল্ক ফাঁকি, অবৈধ পণ্য খালাস ও দালালির কৌশল রপ্ত করেন নুরুল ইসলাম। বন্দরে দালালির বিভিন্ন সিন্ডিকেট গড়ে অবৈধভাবে অর্জন করেন সাড়ে ৪০০ কোটি টাকার বেশি সম্পদ। এছাড়াও নামে-বেনামে স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের সদস্যদের নামে রয়েছে ১৯টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। অভিযানে উদ্ধার করা হয় ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৫০০ টাকা মূল্যমানের জাল নোট, মিয়ানমারের ৩ লাখ ৮০ হাজার মূল্যমানের মুদ্রা, ৪ হাজার ৪০০ পিস ইয়াবা এবং নগদ ২ লাখ ১ হাজার ১৬০ টাকা।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নুরুল ইসলাম তার অপরাধ সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য দিয়েছেন বলে জানান খন্দকার আল মঈন। জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে র্যাবের এ কর্মকর্তা বলেন, সে ২০০১ সালে টেকনাফ স্থলবন্দরে দৈনিক ১৩০ টাকা চুক্তিভিত্তিক হারে কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরি নেয়। বন্দরে কর্মরত থাকাকালে নিজের অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে চোরাকারবারি, শুল্ক ফাঁকি, অবৈধ পণ্য খালাস, দালালি ইত্যাদির কৌশল রপ্ত করে। একই সঙ্গে দালালির বিভিন্ন সিন্ডিকেটে যুক্ত হয়। পরে নিজেই সেই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। ২০০৯ সালে চাকরি  ছেড়ে দিলেও দালালি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছে রেখে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।

বন্দরের দালাল সিন্ডিকেটের প্রধান নুরুল

নুরুল টেকনাফ বন্দর কেন্দ্রিক দালাল সিন্ডিকেটের প্রধান। তার সিন্ডিকেটে ১০-১৫ জন সদস্য রয়েছে, যারা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে দালালি কর্মকাণ্ড করে থাকে। এই সিন্ডিকেটটি পণ্য খালাস, পরিবহন সিরিয়াল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পথে অবৈধ মালামাল খালাসে সক্রিয় ছিল। সিন্ডিকেটের সহায়তায় পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে কাঠ, শুঁটকি, বরইয়ের আচার, মাছ ইত্যাদির আড়ালে অবৈধ পণ্য নিয়ে আসত। চক্রটির সদস্যরা টেকনাফ বন্দর, ট্রাকস্ট্যান্ড, বন্দর লেবার ও জাহাজের আগমন-বহির্গমন নিয়ন্ত্রণ করত। গ্রেফতার নুরুলের সঙ্গে চিহ্নিত মাদক কারবারিদের যোগসাজশ ছিল বলেও জানা গেছে।

ইনভয়েস কারসাজিতেও নুরুল

অবৈধ পণ্যের কারবারের জন্য হুন্ডি সিন্ডিকেটের সঙ্গে সমন্বয় এবং চতুরতার সঙ্গে আন্ডার ও ওভার ইনভয়েস কারসাজি করত নুরুল ইসলাম। অবৈধ আয়ের উত্সকে ধামাচাপা দিতে এমএস আল নাহিয়ান এন্টারপ্রাইজ, এমএস মিফতাউল এন্টারপ্রাইজ, এমএস আলকা এন্টারপ্রাইজ, আলকা রিয়েল এস্টেট লিমিটেড এবং এমএস কানিজ এন্টারপ্রাইজ নামে প্রতিষ্ঠান তৈরি করে সে।

ঢাকায় ছয়টি বাড়ি ও ১৩ ফ্ল্যাট

দালালি ও অবৈধ কার্যক্রমে অর্জিত অর্থে ঢাকা শহরে ছয়টি বাড়ি ও ১৩টি ফ্ল্যাট কিনেছে। এছাড়াও সাভার, টেকনাফ, সেন্টমার্টিন, ভোলাসহ বিভিন্ন জায়গায় নামে-বেনামে ৩৭টি জায়গা, প্লট, বাগানবাড়ি রয়েছে। অবৈধভাবে তার অর্জিত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪৬০ কোটি টাকা। নামে-বেনামে তার বিভিন্ন ব্যাংকে মোট ১৯টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। বর্তমানে নুরুলের জাহাজ শিল্প ও ঢাকার নিকটবর্তী বিনোদন পার্কে বিনিয়োগ রয়েছে বলেও জানা গেছে।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে কমান্ডার আল মঈন বলেন, নুরুল ইসলামের সঙ্গে ইয়াবা কারবারিদের বেচাকেনার তথ্যও আমরা পেয়েছি। তার ঢাকার বাসা থেকে ইয়াবাও জব্দ করা হয়েছে। কক্সবাজার ও টেকনাফ কেন্দ্রিক মাদক কারবারিদের সঙ্গে সখ্যতা রয়েছে।

কম্পিউটার অপারেটরের পদে থাকার সময় আমদানি-রপ্তানিকারক দুটি বেনামি প্রতিষ্ঠানে কাজ করে বিপুল অর্থ হাতিয়েছে। সরকার দলীয় কোনো পদ-পদবি না থাকলেও সখ্যতার ভিত্তিতে দালালির কাজ করত সে। তবে গোয়েন্দা নজরদারির ভিত্তিতেই এই প্রথম র্যাবের হাতে গ্রেফতার হয় নুরুল।

জাল টাকার ব্যাপারে জানতে চাইলে কমান্ডার আল মঈন বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ কেন্দ্রিক বাণিজ্য করার সুবাদে সে দেশের দালালদের সঙ্গেও তার যোগাযোগ ছিল। সে দেশের দালালদের মাধ্যমে জাল টাকার লেনদেন করত।