পাগলে কী না কয়

আমাদের দেশে একটা বহুল প্রচলিত প্রবাদ হচ্ছে : পাগলে কী না কয়, ছাগলে কী না খায়। যদিও এই বাক্যটির সত্যতা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ পাগল আর যা-ই বলুক মিথ্যে কথা বলে না। হয়তো অসংলগ্ন মানে মতলবহীন অনেক কথা বলে। পাগলের প্রকার হয় না, আকারেই তার প্রকাশ। পাগলের শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রকারভেদও করা যাবে না, কারণ সব পাগলই স্বশিক্ষিত। সবার আছে নিজস্ব স্পেশালাইজেশন, আলাদা আলাদা। পাগলের তাই জাত নেই, কুলও নেই। একটু কান আর মন দিয়ে শুনলে বোঝা যাবে, পাগলের ভেতরে বাস করে এক-একজন দার্শনিক মানুষ। আমরা শুনতে ও বুঝতে চাই না বলেই পাগলের কথাকে ‘প্রলাপ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের এড়াতে চাই। সে তুলনায় আমাদের দেশের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা অনেক বেশি বাজে কথা, মিথ্যে কথা বলেন। ঠিক তেমনি ছাগল অনেক অখাদ, কুখাদ্য খেলেও অনেক কিছুই খায় না। যেমন কোনোদিন কোনো ছাগলকে মাংস খেতে দেখা যায়নি। বরং ছাগলের মাংস তো আমরা খাই। ছাগল কখনো ঘুষ খায় না, যা আমরা খাই। ছাগল কখনো ছয় ইঞ্চি কাঁটাওয়ালা ক্যাকটাস খায় না। এই ‘স্পেশাল ডিশ’টি খাওয়ার মতো হিম্মত এই পৃথিবীতে একজনেরই আছে। তার নাম উট।

যাহোক, ছাগল নয়, পাগলের আলোচনাতে আজ মনোনিবেশ করব। শুরুতেই বলে নেওয়া ভালো যে, আমাদের দেশে পাগল ও উন্মাদের সংখ্যা সীমাহীন বেড়ে গেছে। অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, ‘পাগল’ ও ‘উন্মাদের’ মধ্যে আবার পার্থক্য কী? পার্থক্য আছে। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ অনুযায়ী উন্মাদ মানে হচ্ছে—মত্ত, হতজ্ঞান, ভ্রষ্টবুদ্ধি, অবিবেচকতা, বিচার-মূঢ়তা ইত্যাদি। পক্ষান্তরে পাগল মানে হচ্ছে—অবোধ, দুরন্ত, অস্থির, চঞ্চল, প্রেমবিহ্বল ইত্যাদি। অর্থাত্ আমরা সহজ কথায় সহজভাবে বলতে পারি, সব উন্মাদের মাথা খারাপ, কিন্তু সব পাগলের মাথা খারাপ নাও হতে পারে। আরো সহজভাবে বলা যায়, সব উন্মাদই পাগল, কিন্তু সব পাগল উন্মাদ নয়। আমাদের সমাজে পাগলের সংখ্যা বেশি, কিন্তু সমস্যা হলো, উন্মাদের সংখ্যাও একেবারে কম নয়। তবে পাগলরা সমাজের জন্য খুব বেশি ক্ষতিকর নয়। একজন পাগলের সর্বোচ্চ মনের বাসনা হলো ট্রাফিক কন্ট্রোল করা। কিন্তু উন্মাদের মনে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের বাসনাও দেখা দিতে পারে। দেখা দিতে পারে দায়িত্বশীল পদে থেকে দায়িত্বহীন আচরণ করতে (আমরা এক বছর আগের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা হালের আফগানিস্তানের দিকে তাকালে এ ধরনের ‘উন্মাদের’ সন্ধান পেতে পারি)!

তবে চেহারা দেখে পাগল বা উন্মাদ চেনা যায় না। আচরণ এবং কথাবার্তায় বোঝা যায় কে পাগল আর কে উন্মাদ। ফল দেখে যেমন গাছ চেনা যায়, তেমনি আচরণ ও কথায় উন্মাদের পরিচয় পাওয়া যায়। পাগলের পাল্লায় পড়লে মারাত্মক কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু উন্মাদের খপ্পরে পড়লে সমূহ সর্বনাশ। অনেক সময় উন্মাদের উন্মত্ততার কারণে মারাত্মক ক্ষতি স্বীকার করতে হয়। উন্মাদের খপ্পরে পড়ে আমাদের লজ্জা-শরমের মাথা খোয়া যায়। সামাজিক স্থিতি ও সংহতিতে চরম আঘাত নেমে আসে।

প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই কমবেশি পাগলামির প্রবণতা আছে। কেউ একটু বেশি পাগল, কেউ একটু কম। কিন্তু অবাক ব্যাপার হচ্ছে, কাউকে সরাসরি পাগল বললে সে ভয়ানক খেপে যান। সেক্ষেত্রে ঠ্যাঙানি খাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। একই প্রতিক্রিয়া উন্মাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কারো আচার-আচরণ-কাজ যদি উন্মাদকেও হার মানায়, তবু তাকে উন্মাদ বলা যাবে না। বললে জন্মদাতার নামটাই হয়তো ভুলিয়ে দেবে। পাগল কিংবা উন্মাদের এজাতীয় আচরণের কোনো বস্তুনিষ্ঠ ব্যাখ্যা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায় না।

নানা কিসিমের পাগল আছে। কেউ শৌখিন পাগল, কেউ ভেকধারী পাগল, কেউ-বা ভাবের পাগল। কিন্তু উন্মাদের ক্ষেত্রে এমন কোনো বিভাজন বা শ্রেণি নেই। কে যে কখন উন্মাদ হবে বা উন্মাদের মতো আচরণ করবে, তা হলফ করে বলা যায় না। কিছু কিছু আদর্শবান ব্যক্তি আছেন, যারা সমাজে ‘পাগল’ হিসেবে খ্যাত। যে কোনো প্রতিষ্ঠানের সাফল্য ও খ্যাতি নির্ভর করে সেই প্রতিষ্ঠানে কতজন নির্ভরযোগ্য পাগল আছে তার ওপর। আগের দিনে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেক পাগল শিক্ষক ছিলেন। তাদের নাওয়া-খাওয়ার কোনো ঠিক-ঠিকানা ছিল না। ঠিক ছিল না পোশাক-পরিচ্ছদের। তারা দিনরাত মত্ত থাকতেন পড়া এবং পড়ানো নিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জি সি দেবের মতো ‘পাগল’রা পড়াতেন। তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুনামও ছিল। এখন তেমন পাগল আর দেখা যায় না। শিক্ষাঙ্গনে, প্রশাসনে, মন্ত্রিসভায়, সরকারে তেমন কোনো পাগল নেই। তাই সবখানে এখন চরম দুরবস্থা। এখন বরং চারদিকে উন্মাদেরই আধিক্য, তাদেরই জয়জয়কার। উন্মাদের কথায় ও কাজে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়ে, সর্বনাশের ধারা সূচিত হয়। আমাদের সমাজের বেশির ভাগ জায়গায় বর্তমানে উন্মাদের কায়কারবার চলছে।

এখানে আইনের দোহাই দিয়ে ঠান্ডা মাথায় মানুষ খুন করা হয়। খুনিদের বিচার নয়, খুনের বিচার যেন না হয়, সেজন্য চলে তোড়জোড়। অনেক ক্ষেত্রেই খুনি-ঘাতক, দেশবিরোধীরা হয় দেশপ্রেমিক। পক্ষান্তরে জ্ঞানী-গুণী-বুদ্ধিজীবী-প্রগতিশীলরা হন ‘দেশদ্রোহী’। আমাদের দেশে যে যত বড় চোর, তার গলা এখানে তত চড়া। এখানে প্রশাসনকে দলীয়করণ করা হয়, কিন্তু বলা হয়, প্রশাসনকে গতিশীল করা হচ্ছে। হামলা-মামলা-খুন-ধর্ষণ-চাঁদাবাজি-সন্ত্রাস-লুটপাটের সব আয়োজন সম্পন্ন করার পর বলা হয়, সুশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের কথা। নিজেদের যাবতীয় অপকর্মের দায় চাপানো হয় প্রতিপক্ষের ওপর। এখানে ষড়যন্ত্র আর মিথ্যাচার ছাড়া বিরোধী দলের কোনো কাজ নেই। এগুলো কতটুকু সুস্থ মস্তিষ্কের কাজ আর কতটুকু উন্মাদনা, আর কতটুকু বাটপাড়ি, সেটা একটুখানি ভেবে দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায়।

আসলে বর্তমানে আমরা একই সঙ্গে পাগল, উন্মাদ ও মতলববাজদের খপ্পরে পড়েছি। কিছু লোক আছে, যারা পাগলও নয়, উন্মাদও নয়; তাদের বলা যায় মতলববাজ বা স্ট্যান্টবাজ। তারা ইচ্ছে করেই বিতর্কিত সব কথা বলেন। যে কথায় কোনো সার নেই, পুষ্টি নেই, ভাবনার উপকরণ নেই, মানবজাতির কল্যাণের ন্যূনতম উপাদান নেই সেই সব কথা বলে তারা বিতর্কিত হতে চান। আলোচনায় থাকতে চান। খ্যাতিমান হতে চান।

আমাদের দেশে কমবেশি সবাই আসলে আলোচিত হতে চায়, কথা বলতে চায়, ভালো সাজতে চায়, অপরকে জব্দ করতে চায়, কোনো ইস্যু পেলে সেই ইস্যু নিয়ে পানি ঘোলা করতে চায়, সেই ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়। এই চাওয়ায় সততা নেই। আছে শুধু মতলব। এখন প্রশ্ন হলো, এই ভেকধারী পাগল, বদ্ধ উন্মাদ কিংবা মতলববাজ-বাটপাররা কি বাড়তেই থাকবে? তারা আমাদের সমাজ-সংসার এমনি রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করে তুলবে, আমাদের সুখ-শান্তি বিনষ্ট করবে আর আমরা নিরীহরা পিছু হটেই যাব?

পুনশ্চ : ভারতের বর্ধমান শহরের এক লোকের মাথায় নাকি একবার হঠাত্ গন্ডারের ভয় ঢুকেছিল। রাতের বেলায় বিছানায় শুলেই তার আশঙ্কা হতো, এই বুঝি গন্ডার তাড়া করতে এলো! তিনি অবশ্য নিজ বুদ্ধিবলে গন্ডার তাড়ানোর একটা কৌশল বের করেছিলেন। খেলার মাঠের রেফারিদের যেমন একটা হুইসেল বা বাঁশি থাকে তেমনি একটা বাঁশি তিনি কিনেছিলেন। তার নিজের মনগড়া ধারণা যে, গন্ডাররা হুইসেল শুনলে খুব ভয় পায়। সুতরাং গন্ডাররা যাতে কাছে ঘেঁষতে না পারে, ভয়ে দূরে থাকে, তাই তিনি পাঁচ-দশ মিনিট পরপর বাঁশি বাজাতেন। ভদ্রলোক নিজের গলায় একটা ফিতের সাহায্যে হুইসেলটা ঝুলিয়ে নিয়েছিলেন। যখনই তিনি মনে করতেন গন্ডাররা তার কাছাকাছি এসেছে, তিনি সঙ্গে সঙ্গে হুইসেলে ফুঁ দিতেন। দিনের বেলায় বাঁশি বাজানোর দরকার হতো না। কারণ সূর্যাস্তের আগে গন্ডাররা সাধারণত বেরোয় না, কিন্তু সূর্যোদয়ের আগেই তারা জঙ্গলে ফিরে যায়।

মুশকিল হয়েছিল বাড়ির লোকদের। হুইসেলের তীব্র আওয়াজে তারা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। কারো চোখের পাতা জুড়বার উপায় নেই। হুইসেলের শব্দে সবাইকে তটস্থ থাকতে হয়। অগত্যা ভদ্রলোককে নিয়ে যাওয়া হয় মাথার ডাক্তারের কাছে। মাথার ডাক্তার সরাসরি তাকে প্রশ্ন করেন, আপনি এত হুইসেল বাজান কেন?

ভদ্রলোক বললেন, হুইসেল শুনে গন্ডাররা ভয় পায়, তাদের দূরে রাখার জন্য। তা না হলে তো গন্ডারেরা আমাকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে। এতটুকু তথ্য ডাক্তারের জানা ছিল। এবার তিনি বলেন, কিন্তু গন্ডার কোথায়? বর্ধমান শহরের কয়েক শ মাইলের মধ্যেও তো কোনো গন্ডার নেই।

এবার রোগী একগাল হেসে বলেন, তাহলেই দেখুন, হুইসেলের ভয়ে গন্ডারগুলো কতদূর পালিয়েছে!

n লেখক : রম্যরচয়িতা