বলা হয়ে থাকে, লক্ষ-কোটি বছর আগে এই পৃথিবীতে মানবসভ্যতার আবির্ভাবের পর থেকে দিনে দিনে মানুষের জীবনাচরণ, সাজ-পোশাকের পরিবর্তনের পাশাপাশি দৈহিকভাবে মানুষ নিজেদের গড়ে তুলেছে অনন্যভাবে। তবে প্রচলিত এই বিবর্তনের ধারণার বাইরে গিয়ে তুর্কি বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী উনার ট্যান এমন একটি সিনড্রোমের অবতারণা করেন, যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তিরা চতুর্ভুজ লোকোমোশন নিয়ে হাঁটেন, আদিম গল্প-বক্তৃতায় ব্যথিত হন এবং নতুন কোনো কিছু শেখার অক্ষমতায় ভুগে থাকেন।
বিজ্ঞানী উনার ট্যান এই উলটো বা বিপরীত বিবর্তনের ধারণাটি দক্ষিণ তুরস্কের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত উলাশ পরিবারের সদস্যদের বাহ্যিক আচার-আচরণ ও মানসিক দৃঢ়তার বৈপরিত্যকে ভিত্তি করে সর্বপ্রথম প্রস্তাব করেন। তিনি ঐ পরিবারের মোট পাঁচ জন সদস্যকে তাদের পা ও হাতের তালু ব্যবহার করে চতুর্ভুজ লোকোমোশনে হাঁটার বর্ণনা দিয়েছেন। এছাড়া পরিবারটির সব সদস্যকে নতুন কিছু শেখানোর বদলে পৌরাণিক তত্ত্ব, কাহিনি দ্বারা বেশি প্রভাবিত হওয়ারও অবতারণা করেছেন বিজ্ঞানী ট্যান।
নবজাতকদের ক্ষেত্রে এমন চলাফেরা স্বাভাবিক হলেও পূর্ণবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে হাত ও পা ব্যবহার করে হাঁটার ঘটনা বিরল। ট্যান এরূপ কৌশলে হাঁটাকে ‘বিয়ার ক্রল’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালে দক্ষিণ তুরস্কে এই সিনড্রোম দেখানো আরেকটি পরিবারের সন্ধান পান বিজ্ঞানী ট্যান।
চার জন পুরুষ ও দুই জন নারীর সমন্বয়ে গঠিত পরিবারটি সম্পর্কে রিপোর্ট করার সময় বিজ্ঞানী ট্যান বলেন, পুরুষেরা নারীদের চেয়ে এই সিনড্রোমে বেশি আক্রান্ত হতে পারেন। তিনি এটাও দাবি করেন, এই সিনড্রোম দেখানো মানুষের মধ্যে নেই কোনো সময়জ্ঞান, শেখার আগ্রহ, অভাব রয়েছে ভাষাগত যোগাযোগের সক্ষমতার এবং বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি ও শব্দ ব্যবহার করে তারা মূলত পারস্পরিক যোগাযোগ করে থাকেন।
পরিবারটি সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি আরো বলেন, পরিবারটির মধ্যে দুজন পুরুষ একেবারেই দাঁড়াতে পারেন না এবং অন্যরা দাঁড়াতে পারলেও দাঁড়ানো অবস্থায় একটি পদক্ষেপও ফেলতে পারেন না। এই সিনড্রোম দেখানো কম গুরুতর ভুক্তভোগীর ক্ষেত্রে দেখা যায় যে তারা হাঁটার সময় পায়ের আঙুল ব্যবহার করছেন, যেটা সাধারণত শিশুর দৈহিক বিকাশের প্রারম্ভিক পর্যায়ে হওয়ার কথা।
অনেক চিকিত্সাবিজ্ঞানী অবশ্য এরূপ সিনড্রোমকে অটোসোমাল রিসেসিভ ডিসঅর্ডারের মধ্যে আলোচনা করে থাকেন, যা মূলত বিবাহ ও প্রজনন সম্পর্কিত অন্য আরেকটি জটিলতা। তবে ট্যানের মতে, এই সিন্ড্রোমকে সেরিবেলার অ্যাটাক্সিয়ার প্রকারভেদে তার নিজস্ব শ্রেণিতে রাখা যেতে পারে। অর্থাত্, এই সিন্ড্রোমে যেহেতু ভুক্তভোগী ব্যক্তির সেরিবেলাম স্ফীত হয়ে ওঠার কারণে সে স্বেচ্ছায় চলাচলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, তাই এই সিনড্রোমকে আলাদা শাখায় আলোচনা করে এর প্রতিকার নিয়ে ভাবা উচিত।
স্নায়ুবিজ্ঞানী ও বিবর্তনবাদী মনোবিজ্ঞানী রজার কেইনস, মনোবিজ্ঞানী নিকোলাস হামফ্রে ও চিকিত্সাবিজ্ঞানী জন স্কয়েলস যুক্তি দিয়েছেন যে, এই সিনড্রোম দেখানো ব্যক্তিদের চলাচল মোটা দাগে দুুটি বিরল ঘটনা একত্রিত হওয়ার কারণে ঘটে থাকে।
প্রথমত আক্রান্ত ব্যক্তিরা শিশুকালে হাঁটুতে ভর দিয়ে প্রাথমিকভাবে হামাগুড়ি দেওয়ার পরিবর্তে পা ব্যবহার করে ‘বিয়ার ক্রল’ করার কৌশল রপ্ত করতে থাকে। দ্বিতীয়ত, জন্মগত মস্তিষ্কের দুর্বলতার কারণে তারা তাদের দুই পায়ে ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন বলে মনে করে। তবে উনার ট্যান প্রদত্ত এই সিনড্রোমকে অনেক বিবর্তনবাদী ও চিকিত্সাবিজ্ঞানী একটি স্পর্শকাতর বিষয়কে ভয়ংকরভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে উল্লেখ করে এরূপ মত দিয়েছেন যে, তত্ত্বটি নিছক জীবিত জীবাশ্মের স্বল্প কিছু দুর্বল ধারণার ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়েছে।
ট্যান প্রদত্ত এই তত্ত্বের সমালোচনা করে মনোবিজ্ঞানী নিকোলাস হামফ্রে বলছেন, প্রফেসর ট্যানের এই তত্ত্বে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে ‘বিবর্তন নামক জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ায় শুধু বিবর্তনমূলক থ্রোব্যাক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আবার তত্ত্বটিকে বৈজ্ঞানিকভাবে দায়িত্বজ্ঞানহীন আখ্যা দিয়ে মনোবিজ্ঞানী নিকোলাস হামফ্রে এরূপ আলোচনা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্যে মারাত্মকভাবে অপমানজনক হিসেবেও উল্লেখ করেছেন।
n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়