নাজমুন নাহার
আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ভালোবাসা আমি খুঁজে পেয়েছি আমার বিশ্ব অভিযাত্রার মাঝে। বিশ্ব জয়যাত্রার মাঝে! এখন পর্যন্ত ১২৫ দেশে ভ্রমণের দুঃসাহসিক অভিযাত্রার কথা মনে পড়লে শুধু বারবার ভেসে আসে সেসব মানুষগুলো, বন্যপ্রাণী, সুউচ্চ পর্বত, সমুদ্র, ভৌগোলিক সব সৌন্দর্য আর প্রকৃতির কথা। যার মাঝে আমি খুঁজে পেয়েছি সত্যিকারের ভালোবাসা!
ছোটবেলা থেকেই আমার স্বপ্ন ছিল আমি বিশ্ব ভ্রমণ করবো! আমার সেই স্বপ্নকে সফল করার জন্য আমার সকল ধ্যান, সাধনা, প্রার্থনাকে একত্রিত করে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে পৃথিবীকে দেখার জন্য নেমে পড়েছি, আজও সেই যাত্রা অব্যাহত রয়েছে! আমি আমার এই যাত্রাকে ভালোবেসেছি বলেই অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করেছি! অনেক কঠিন পথ পাড়ি দিতে পেরেছি! শুধু কি তাই, দিবা-রাত্রি একাকার করে লক্ষ লক্ষ মাইল সড়কপথে পাড়ি দিয়েছি। এক নটিক্যাল মাইল থেকে আরেক নটিক্যাল মাইলে যাত্রা করেছি বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকা হাতে!
আমি মনে করি, এই পৃথিবী একটি মা, পৃথিবী নামক মায়ের গর্ভে বসবাস করছে পুরো মানবজাতি, আর এই মানবজাতির যে যোগ সূত্র সেটাই ভালোবাসা! আমার বিগত অভিযাত্রার মাঝে কিছু মানুষের ভালোবাসা কখনোই ভুলবো না!’
সম্প্রতি ঘুরে আসা পূর্ব আফ্রিকার সিয়েরা লিওন যাওয়ার জন্য যখন সেনেগালের সিয়েরা লিওন অ্যাম্বেসিতে ভিসার জন্য আবেদন করতে গেলাম তখন সেখানকার জুনিয়র অফিসার নানা অজুহাতে আমাকে ভিসা দেবে না বলে নিষেধ করলো। আমি চেষ্টার ত্রুটি রাখিনি, আমার সব কাগজপত্র দেখিয়েছি, মিশন ২০০-এর কথা বলেছি। কিন্তু কোনোভাবেই আমাকে ভিসা দেওয়ার জন্য রাজি হচ্ছে না! হটাত্ একজন ভদ্র মহিলা পাশের রুম থেকে বের হয়ে এলো। তার নাম আবিদজা, ফার্স্ট সেক্রেটারি। আমি চলে যাচ্ছিলাম দেখে এসেই আমার হাত ধরে বললো, ভেতরে আসো, আমি তোমার সব কথা শুনেছি, তোমাকে আমি ভিসা দেবো। তুমি আমাদের দেশকে দেখতে যাবে, তোমার মিশন পূর্ণ করবে। ওই মানুষটি আমাকে ভিসা দিলো, সিয়েরা লিওনে তার বাসায় থাকার ব্যবস্থা করলো। তাদের পরিবারের সাথে আমার দারুণ বন্ধুত্ব হলো। সেদিনই আমি খুঁজে পেলাম আমার পরিবারের বাইরে আরেকটি পরিবার। আমি আবিদজা পরিবারের মাঝে মানবজাতির সেই যোগসূত্রের মিল খুঁজে পেয়েছি।
পথে পথে বহু ঘটনার সূত্রপাত। আর ঘটনার মাধ্যমেই বহু মানুষের সাথে পরিচয়। যেন কোনো ঘটনা না করলে, পথে না নামলে এ সব মানুষের সাথে পরিচয় হতো না, এদের ভালোবাসা খুঁজে পেতাম না।
রাত ৩টার সময় যখন গিনি কোনাক্রিতে দুর্গম জঙ্গলের মাঝে আটকে থাকার পর হেঁটে হেঁটে ভোরবেলায় এক আদিবাসীর বাড়ির সামনে আশ্রয় নিয়েছি। হতদরিদ্র সেই মহিলার সেই ঘরের ভেতর কোনো খাট নেই, স্টোনের ওপর দু-পাশে দুটো বাঁশের কঞ্চির মাঝে একটা প্লাস্টিকের দোলনার মধ্যে ঘুমায়, তার সেই দোলনা খাটে আমাকে রেস্ট করার অফার দিলো, ক্ষুদার্ত অবস্থায় আমাকে কাঁচা বাদাম খেতে দিলো, আলু সেদ্ধ করে দিলো। সেই দরিদ্র মানুষটি একজন আগন্তুকের প্রতি যে ভালোবাসা দেখিয়েছে তা আমাকে বারবার মনে করিয়ে দিলো মানুষকে মানুষের মাঝে স্থান দেওয়ার এক অন্যরকম অনুভূতির কথা!
এভাবেই যখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যাই তখন নানাভাবে মানুষের সাথে দেখা হয়ে যায় ঘটনাক্রমে! অনেক সময় জানতাম না ১ ঘণ্টা পরে কি হবে, কোথায় থাকবো, কি করবো! যখনই কোনো নতুন দেশে বা নতুন শহরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হতাম, বলা যায় অজানার মাঝেই নিজেকে হারিয়ে ফেলতাম। কখনোই মনে অসঙ্কোচ, ভয় কাজ করতো না! বরং সকল অজানা মানুষ, প্রকৃতি আর সংস্কৃতির মাঝে আমি নতুন নতুন পজিটিভ শক্তি খুঁজে পেতাম!
মনে পড়ে যখন বতসোয়ানা থেকে সড়কপথে আমি সাউথ আফ্রিকার জোহান্সবার্গ যাচ্ছিলাম তখন আমার পাশের সিটে পরিচয় হওয়া এক যাত্রী আমাকে কিভাবে সাহায্য করেছিল। তার নাম ইতুমেলেং। আমরা যখন জোহান্সবার্গে পৌঁছেছিলাম তখন রাত প্রায় সাড়ে ১১টা। বতসোয়ানা থেকে জোহান্সবার্গ পর্যন্ত যাত্রাপথে সাউথ আফ্রিকার সেই সুন্দর অপূর্ব ভ্যালির মাঝে গড়িয়ে পড়া সন্ধ্যা থেকে শহরে পৌঁছানো পর্যন্ত অনেক গল্প করতে করতে এসেছিলাম। আমাদের দু’জনের মাঝে ওই অল্প সময়েই দারুণ একটা বন্ধন সৃষ্টি হলো। যে বন্ধন আমার মতো এক জন একাকী অভিযাত্রীকে ওই বিপদসঙ্কুল শহরের সকল মরণ থাবা বাঁচিয়ে দিলো! ওই শহরে প্রায়ই বিদেশিদের হটাত্ গুলি করে মেরে ফেলার মতো ঘটনা ঘটে। রাতে রাস্তায় বিদেশিদের হাঁটা নিরাপদ নয় জোহান্সবার্গ শহরে। তাই আমার মুখে একটা কালো চাদর জড়িয়ে আমাকে আড়াল করে মিনি বাস থেকে নামিয়ে ট্যাক্সিতে উঠলেন যেন কেউ বুজতে না পারে বিদেশি। তারপর ওই রাতে আমাকে হোস্টেল পর্যন্ত পৌঁছে দিলেন। সেই ভাতৃত্ববোধ আমাকে এখনো দূর থেকে টানে। দূরের মানুষগুলো এভাবেই ভালোবাসার টানে কাছে চলে আসে।
এছাড়াও যখন আমি কোনো পাহাড়ে যাই, সমুদ্রে যাই, তপ্ত মরুর বুকে যাই, আমি খুঁজে পাই প্রকৃতির অনাবিল ভালোবাসা। যে ভালোবাসা আমার বিশ্ব জয়যাত্রার পথে এক অদম্য শক্তি।
লেখক:বাংলাদেশের পতাকাবাহী পরিব্রাজক