নিজের সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি? নিজের চারিপাশ সম্পর্কে আমরা কতটুকু বুঝি? আমরা কি আমাদের সীমাবদ্ধতা বুঝিতে পারি? বিদ্যা অর্জনের কোনো সীমা-পরিসীমা নাই। কিন্তু অনেকেই কিছুমাত্র বিদ্যা অর্জন করিয়া নিজেকে জ্ঞানের সমুদ্রে তালেবর বলিয়া মনে করেন। এই ক্ষেত্রে আমরা মহামতি সক্রেটিসের একটি ছোট্ট উক্তি স্মরণ করিতে পারি। তিনি বলিয়াছেন, ‘সত্যিকারের জ্ঞান আমাদের সকলের নিকটই আসে, যখন আমরা বুঝিতে পারি যে আমরা আমাদের জীবন, আমাদের নিজেদের সম্পর্কে এবং আমাদের চারিপাশে যাহা কিছু আছে তাহার সম্পর্কে কত কম জানি।’ সক্রেটিসের এই কথার মতোই বলিতে হয়—আমরা অজ্ঞ। আমাদের জ্ঞানচক্ষু সামান্যই খুলিয়াছে। তিনি আরো বলিয়াছেন—“অতএব সে-ই ব্যক্তি জ্ঞানী, যিনি তাহার অজ্ঞতার ‘রকম ও পরিমাণ’ জানেন।” এই কথার সমীকরণ ধরিয়া আমরা এইরকম মীমাংসার রেখা টানিতে পারি যে, নিজেকে জ্ঞানে ঋদ্ধ করিতে হইলে নিজের ‘অজ্ঞতা’কে সকলের আগে জানিতে হইবে। কিন্তু যাহারা নিজেকে জানেন না, তাহারা নিজের অজ্ঞতাও জানেন না। সুতরাং আমরা পুনর্বার উচ্চারণ করিতে চাই সেই বিখ্যাত উক্তি—‘নো দাইসেল্ফ’—নিজেকে জানো।
আমরা যদি আমাদের সীমাবদ্ধতা না বুঝি তাহা হইলে আমরা যাহা নই, নিজেদের তাহাই ভাবি। ইহাই অজ্ঞতা। মাত্র ‘একটি কোষ’ হইতে আমরা প্রায় ৩০ হাজার বিলিয়ন কোষের পূর্ণাঙ্গ শরীরে পরিণত হইয়া থাকি। মস্তিষ্কের লক্ষ-কোটি নিউরন এক বিস্ময়কর জটিল ব্যবস্থাপনায় নিজেকে গঠিত করে এবং পরিচালিত করে শরীরের অতি জটিল সিস্টেমকে। আমরা কেহ কেহ জানি বটে কিছু কিছু। কিন্তু উহা জ্ঞানসমুদ্রে নুড়িপাথর কুড়াইবার মতো জ্ঞান। অথচ আমরা আমাদের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করিতে কুণ্ঠা বোধ করি। এমনকি, আমরা যে সীমিত, আমাদের যে অনেক সীমাবদ্ধতা—সেই সারসত্য আমরা জানিতেই চাহি না। মনে রাখিতে হইবে আমাদের প্রত্যেকের ভিন্ন ভিন্ন সামর্থ্য ও অর্জনের ক্ষমতা রহিয়াছে। মহান সৃষ্টিকর্তা কাউকে তাহার সাধ্যের বাহিরে কোনো কাজ চাপাইয়া দেন না। তিনি জানেন আমাদের সাধ্য কতখানি হইবে এবং তাহা তিনিই নির্ধারণ করিয়া দিয়াছেন। সুতরাং যাহা বহিবার সামর্থ্য আমাদের নাই, সৃষ্টিকর্তা সেই দায়িত্ব আমাদের উপর অর্পণও করেন না। এই জন্য মহাবিজ্ঞানী আইস্টাইন বলিয়াছেন—‘অর্জনের মূল্য অর্জনের মধ্যেই নিহিত।’ মহান সৃষ্টিকর্তাই আমাদের সম্মান প্রদান করেন। কিন্তু আমরা কি কখনো ভাবিয়া দেখিয়াছি—কেন তিনি সম্মান দেওয়ার পর কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাহা আবার ফিরাইয়া নেন? ইহা বুঝিতে হইলে প্রথম নিজেকে জানিতে হইবে, নিজেকে বুঝিতে হইবে। নিজেকে জানাটা সাময়িক কোনো বিষয় নহে। বরং নিজেকে জানার নিরন্তর চেষ্টা মানুষকে আমৃত্যু করিয়া যাইতে হয়। হাদিসেও বলা আছে—যে নিজেকে জানিল, সে তাহার রবকে জানিল। অর্থাত্, নিজেকে না জানিতে সৃষ্টিকর্তাকেও জানা যায় না। আবার নিজেকে জানার ভেতর দিয়া মহান সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমা সবচাইতে গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়।
নিজেকে যেমন জানিতে হইবে, তেমনি ভালোবাসিতেও হইবে নিজেকে। মহামতি গৌতম বুদ্ধ এই ক্ষেত্রে বলিয়াছেন যে, ‘নিজেকে তো বটেই পুরো মহাবিশ্বের যে কেহ আপনার অনুগ্রহ ও ভালোবাসা হইতে বঞ্চিত না হন।’ এই জগতের অত্যন্ত সুশৃঙ্খ নিয়ম রহিয়াছে। সৃষ্টিকর্তার নিয়মের বাহিরে কিছুই হয় না। আমাদের অর্জনগুলিও সেই নিয়মের মধ্যেই হইয়া থাকে। এই সকল বুঝিতে হইলে নিজেকে নিজের ‘সময়’ দিতে হইবে, নিভৃতে ভাবিতে হইবে। তখন নিজেও বুঝিতে পারিবেন, কোথায় আপনার সীমাবদ্ধতা।