সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির লক্ষ্যগুলো উন্নত করার মাধ্যমে বাংলাদেশে দারিদ্র্য হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব। বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের শহুরে প্রতি পাঁচ জনের এক জন দরিদ্র। কিন্তু তুলনামূলক শহুরে দরিদ্ররা সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা কম পাচ্ছে। শহরে ১৯ শতাংশ মানুষ দরিদ্র অবস্থায় থাকলেও তাদের মধ্যে ১১ শতাংশ সামাজিক সুরক্ষার কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। অন্যদিকে, গ্রামাঞ্চলে ২৬ শতাংশ মানুষ দরিদ্রাবস্থায় থাকলেও সুরক্ষা কর্মসূচি বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় রয়েছে ৩৬ শতাংশ মানুষ। অর্থাত্ গ্রামে দারিদ্র্য হারের চেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। উপকারভোগীদের সঠিকভাবে বাছাই করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থ বিতরণ করা সম্ভব হলে দেশের দারিদ্র্য হার ৩৬ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব। গতকাল ‘বাংলাদেশ সোশ্যাল প্রটেকশন পাবলিক এক্সপেনডিচার রিভিউ’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার এক ওয়েবিনারের আয়োজন করে বিশ্বব্যাংক।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ২০১৬ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য ব্যবহার করে দারিদ্র্যের এই হার উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। এর পরে বিবিএস প্রতি বছর ধারণাগত তথ্যেরে ভিত্তিতে দারিদ্র্যের হার কমে আসার তথ্য প্রকাশ করছে। বিবিএস এর সর্বশেষ হিসাবে দেশের দরিদ্র হার এখন ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। অবশ্য ২০১৬ সালের পর দেশের দরিদ্র পরিস্থিতির আর কোনো জরিপ হয়নি। করোনার সময়ে দেশের দরিদ্র হার বেড়ে যাওয়ার তথ্য বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণায় উঠে আসলেও সরকারি ভাবে দারিদ্র্যের তথ্য হালনাগাদ করা হয়নি। বিশ্বব্যাংক উল্লেখ করেছে, জাতীয়ভাবে খানার ডাটাবেইজ করার মাধ্যমে দরিদ্রদের সঠিক টার্গেট করা সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে আরো কম খরচে প্রকৃত দরিদ্রদের সহায়তা করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশের অপারেশনাল ম্যানেজার ড্যানডান চেন উল্লেখ করেন, গত এক দশকে বাংলাদেশ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি করেছে। বর্তমানে প্রতি ১০টি পরিবারের তিনটি এই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পাচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক কোভিড-১৯-এর ধাক্কা এই সুরক্ষা কর্মসূচির গুরুত্ব আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন, শ্রমবাজারে ঝুঁকি, অপরিকল্পিত নগরায়ন ইত্যাদির কারণে সামাজিক সুরক্ষার লক্ষ্যগুলোকে আরো সুনির্দিষ্টভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ গত ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) ২ দশমিক ৬ শতাংশ সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় করেছে। বাংলাদেশর সমান আয়ের অন্যদেশের মতোই এই খাতে খরচ ঠিক আছে। তবে এই কর্মসূচিতে কিছু ফাঁক রয়েগেছে। উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, দেশের প্রতি আট জন দরিদ্রের মধ্যে এক জন শিশু। অথচ এই খাতে যত ব্যয় হচ্ছে তার মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশ যাচ্ছে দরিদ্র শিশুদের জন্য। কর্মসূচিগুলোতে দরিদ্র তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্কদের অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে দুর্বলতা রয়েছে। এজন্য দরিদ্রের ধরন অনুযায়ী বরাদ্দের ধরনেও সংস্কার করতে হবে। প্রকল্প পরিকল্পনা, নকশা ও বিভিন্ন কর্মসূচির ভাতা বিতরণসহ বিদ্যমান কাঠামো কীভাবে উন্নত করা যায় সে বিষয়েও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সুবিধাভোগীরা যাতে সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা দ্রুত পায় সে ব্যবস্থা নিশ্চিতের পরামর্শ রয়েছে বিশ্বব্যাংকের। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন ধরনের ভাতা দেওয়ার জন্য গভর্নমেন্ট টু পারসন (জিটুপি) ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) বাড়াতে হবে। সরকারের কোষাগার থেকে তহবিল সুবিধাভোগীর কাছে স্থানান্তর করতে প্রায় দুই মাস সময় লেগে যায়। জিটুপি পদ্ধতিতে এই সময় ১০ দিনে নামিয়ে আনতে হবে।