জিয়ার লাশ নিয়ে সংসদে বিতর্ক

রাজধানীর চন্দ্রিমা উদ্যানের সমাধিতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের লাশ থাকা-না-থাকা নিয়ে এবার বিতর্ক গড়িয়েছে জাতীয় সংসদে। গতকাল বৃহস্পতিবার সংসদে ‘বাংলাদেশ জাতীয় আরকাইভস বিল, ২০২১’ পাশের প্রক্রিয়ায় জিয়ার লাশ নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক করেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ এবং বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ, মোশাররফ হোসেন ও ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। জাতীয় পার্টির (জাপা) ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীও এই তর্কে যোগ দেন। এছাড়া পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নিয়ে চন্দ্রিমার কবরে জিয়ার লাশ নেই বলে দাবি করেছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম। পয়েন্ট অব অর্ডারে শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, ‘চন্দ্রিমা উদ্যানে জিয়াউর রহমানের লাশ নেই, সেটা ৪০ বছর আগেই সিদ্ধান্ত হয়েছে। ১৯৮১ সালের ২০ জুন আমি নিজেই সংসদে বলেছিলাম জিয়ার লাশের ছবি প্রকাশ করতে। কিন্তু তা করতে পারেনি।’ স্পিকারকে উদ্দেশ্য করে শেখ সেলিম বলেন, ‘ওখানে যে বাক্সটা আছে, তা সরিয়ে লুই আই কানের নকশা বাস্তবায়ন করেন।’ আওয়ামী লীগের এই জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য বলেন, জিয়ার লাশ থাকলে তার স্ত্রী-সন্তানকে দেখানো হয়নি কেন? যদি লাশ থেকে থাকে, আগামী এক মাসের মধ্যে প্রমাণ দিতে হবে। ভবিষ্যতে সংসদে লাশ নিয়ে যাতে কোনো কথা না হয়, সেই ব্যবস্থা নিতে তিনি স্পিকারকে অনুরোধ করেন।  বিএনপি নেতাদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘আর দুই নম্বর রাজনীতি কইরেন না। জিয়াউর রহমান যে অপকর্ম করেছেন, তার পরিণতিতে দেখেন আপনাদের কী হয়।’

এর আগে বাংলাদেশ জাতীয় আরকাইভস বিল পাশের প্রক্রিয়ায় জিয়ার লাশ নিয়ে বিতর্কের সূচনা করেন বিএনপির মোশাররফ হোসেন। বিলটি বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাবের আলোচনাকালে তিনি বলেন, ‘জিয়াউর রহমানের লাশ সেখানে আছে কি নাই, সেটা বড় বিষয় নয়। সেখানে যে লাশ নাই, তা আপনারা (আওয়ামী লীগ) কীভাবে জানলেন? এত বছর ধরে ক্ষমতায় আছেন, এটা নিয়ে আগে কথা বলেননি কেন? এখন কেন বলছেন?’

বিলটি পাশের আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির এমপি হারুনুর রশীদ বলেন, জিয়াউর রহমানকে নিয়ে মন্ত্রী-এমপিরা বলছেন, তিনি নাকি মুক্তিযোদ্ধাই নন, তিনি নাকি পাকিস্তানের দোসর। জিয়াউর রহমান জেড ফোর্সের কমান্ডার ছিলেন। সরাসরি মাঠে যুদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন, পরনিন্দা, বিষোদ্গার ভালো নয়। সংসদের লবিতে পবিত্র কোরআনের আয়াত লেখা আছে, ‘তোমরা জানা সত্ত্বেও সত্য গোপন করিও না এবং সত্যের সঙ্গে মিথ্যা মিশ্রিত করিও না’। তিনি বলেন, তখনকার সংসদে আওয়ামী লীগের ৩৯ জন সদস্য ছিলেন। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জিয়াউর রহমানের জানাজায় তারাও উপস্থিত ছিলেন। সংসদে শোকপ্রস্তাব নেওয়া হয়েছিল। জিয়াউর রহমানের লাশের পোস্টমর্টেম হয়েছে, সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচারও হয়েছে। এগুলো সত্য ঘটনা। অহেতুক কথা বলে সময় নষ্ট করার দরকার নেই। তার এ বক্তব্যের সময় সরকারি দলের অনেক সদস্য হইচই করেন। তখন স্পিকারের উদ্দেশ্যে হারুন বলেন, ‘আমার বক্তব্য অসত্য হলে একপাঞ্জ করুন।’

হারুনের বক্তব্যের জবাবে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বলেন, সংসদ ভবন নিয়ে লুই কানের যে নকশা, সেখানে কোথায় রয়েছে যে চন্দ্রিমা উদ্যানে জিয়াউর রহমানের লাশ দাফন করতে হবে? বেগম জিয়া স্বামী মনে করে সেখানে কাকে শ্রদ্ধা জানান?  আপনারা দলের নেতা ভেবে সেখানে কাকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন? ওখানে কি কারো মৃতদেহ আছে? নাকি অন্য কারো মৃতদেহ আছে? বিএনপির এমপিদের উদ্দেশ্যে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী বলেন, আপনারা নিরপেক্ষ একটা কমিটি করেন। সরকার সহযোগিতা করবে। সত্য উদ্?ঘাটনে ভয়ের কী আছে?

বিল পাশের প্রক্রিয়ায় সংরক্ষিত আসনে বিএনপির এমপি ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, সবসময় ইতিহাস লেখে জয়ীরা। প্রকৃত ইতিহাস বের হতে ১০০ বছরও লাগতে পারে। তিনি বলেন, আরকাইভ করতে হলে স্বীকার করতে হবে জিয়াউর রহমান ছিলেন রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা, বীর উত্তম, সেক্টর কমান্ডার। সরকারের ব্যর্থতা, ভোট চুরি, গণতন্ত্রহীনতা ও বিভত্স লুটপাট থেকে মানুষের দৃষ্টিকে অন্যদিকে সরিয়ে নিতেই এই বিতর্ক করা হচ্ছে। রুমিন ফারহানার বক্তব্যের সময়ও সরকারি দলের সদস্যরা প্রতিবাদ জানান।

বিলটির ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে জাপার এমপি শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, ইতিহাস বিকৃতি তো বিএনপিও করে। তারা বলেন, স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা রয়েছে। আর তিনি (জিয়াউর রহমান) বেঁচে থাকতে কখনোই বলতে শুনেনি, দেখিনি উনি নিজেকে স্বাধীনতার ঘোষক বলেছেন। তাদের প্রথমে ইতিহাস বিকৃতি বন্ধ করতে হবে।

বিতর্কের পর বিল পাশ

জিয়াউর রহমানের লাশ নিয়ে বিতর্কের পর ‘বাংলাদেশ জাতীয় আরকাইভস বিল-২০২১’ পাশ হয়েছে। সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বিলটি পাশের প্রস্তাব করলে তা কণ্ঠভোটে পাশ হয়। বিলে নির্দিষ্ট ফির বিনিময়ে জাতীয় আরকাইভস থেকে তথ্য দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।