ক্লাসে একা হয়ে গেছে মেয়েটি!

ফজলে ইলাহী স্বপন, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি

করোনাকালীন বন্ধে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের ধরলা নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের সারডোব উচ্চবিদ্যালয়ে ৬৩ ছাত্রীর মধ্যে ১৮ জনের বাল্যবিবাহ হয়েছে। বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় বিদ্যালয়টির নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ৯ জন ছাত্রীর মধ্যে বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে আট জন ছাত্রী। নবম শ্রেণিতে অন্য ছাত্রদের সঙ্গে মেয়ে শিক্ষার্থী হিসেবে এখন ক্লাস করছে শুধু নার্গিস নাহার। বিদ্যালয়টির ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত ২২৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৬৩ জন ছাত্রী। এর মধ্যে কিছু শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে না আসায় কারণ জানতে গিয়ে কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে জানতে পারেন বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে ১৮ জন ছাত্রী।

বৃহস্পতিবার হলোখানা ইউনিয়নের সারডোব উচ্চবিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণিতে গিয়ে দেখা যায়, একমাত্র মেয়ে শিক্ষার্থী নার্গিস নাহারের মুখ ছিল মলিন। কারণ করোনাকালীন তারই আট জন সহপাঠী ছাত্রী আরফিনা, নুরবানু, নাজমা, স্বপ্না, হেলেনা, চম্পা, লুত্ফা ও চাঁদনীর বিয়ে হয়ে গেছে। সে জানায়, ক্লাস জুড়ে আমি একাই ছাত্রী। আমার কোনো বান্ধবী নেই। বাকিরা সব ছেলে সহপাঠী হওয়ায় কারো সঙ্গে মন খুলে কোনো কিছু শেয়ার করতে পারি না। অতি কাছের প্রিয় বান্ধবীদের বিবাহের কথা জানতে পেরে খুব কষ্ট পেয়েছি। এত অল্প বয়সে সহপাঠীদের বিয়ের বিষয়টি নিয়ে নিজের মধ্যেও শঙ্কা কাজ করছে।

সারডোব উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফজলে রহমান জানান, করোনাকালীন দীর্ঘ বন্ধের পর পাঠদান শুরু হলে ছাত্রীদের অনুপস্থিতির কারণ খুঁজতে গিয়ে প্রাথমিকভাবে জানা যায়, ১৮ জনের বাল্যবিবাহ হয়েছে। এর মধ্যে ১০ম শ্রেণির চার জন ছাত্রীর মধ্যে জেসমিন ছাড়া অন্য তিন জনেরই বাল্যবিবাহ হয়েছে। ৯ম শ্রেণির ৯ জনের মধ্যে আট জনের বিবাহ হয়েছে। এছাড়াও ষষ্ঠ শ্রেণির এক জন, সপ্তম শ্রেণির দুই, অষ্টম শ্রেণির চার জনের বাল্যবিবাহ হয়েছে।

হলোখানা ইউনিয়নের স্থানীয় ইউপি সদস্য বাকিনুর রহমান জানান, ধরলা নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের এই ওয়ার্ডটির সঙ্গে কুড়িগ্রাম জেলা সদরের যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই খারাপ। তাই দ্রুত সময়ে যে  কোনো প্রয়োজনে বিচ্ছিন্ন এই জনপদে প্রশাসনের লোকজনকে পৌঁছাতে বেগ পেতে হয়। মেয়েদের পরিবারের সদস্যসহ অভিভাবকরা অতি গোপনে অন্যত্র এসব বাল্যবিবাহ দেওয়ায় আমাদের কাছে সময়মতো খবর আসে না। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্লান বাংলাদেশের তথ্যানুযায়ী, জেলায় ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত বাল্যবিবাহ সংঘটিত হয়েছে ৩ হাজার ১৯টি। এছাড়াও এই সময়ের মধ্যে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ হয়েছে ১ হাজার ১৩৬টি।