মো. রহমত উল্লাহ্
মানব সন্তানকে মানুষে পরিণত করার ঐকান্তিক তপস্যা হচ্ছে শিক্ষকতা। তাই পৃথিবীর সকল দেশেই শিক্ষকের প্রকৃত মর্যাদা সর্বাধিক। সামষ্টিক বিবেচনায় যে কোনো পেশার তুলনায় শিক্ষকতা অধিক সম্মানজনক।
কেননা শিক্ষকতা মূলত একটি ব্রত। তাই প্রতিটি সমাজেই অগণিত অপেশাদার শিক্ষক বিদ্যমান। শুধু পেশা হিসেবে শিক্ষকতায় সফলতা নেই, পরিতৃপ্তি নেই। শিক্ষাদান হচ্ছে অতি উত্তম পূণ্য কর্ম। মহান সৃষ্টিকর্তা নিজেই প্রধান শিক্ষক। বিভিন্ন ধর্মের প্রবর্তকগণ ছিলেন উত্কৃষ্ট শিক্ষক। অর্থাত্ উত্কৃষ্ট মানবেরাই উত্কৃষ্ট শিক্ষক। উত্কৃষ্ট মানব তথা উত্কৃষ্ট শিক্ষকের মর্যাদাও উত্কৃষ্ট। শিক্ষক ব্যতীত কোনো সমাজ নেই। সকল মানুষেরই শিক্ষক আছেন। যে সমাজের শিক্ষক যত বেশি উত্কৃষ্ট সে সমাজের মানুষ তত বেশি উত্কৃষ্ট।
বর্তমান বাস্তবতায় উত্কৃষ্ট শিক্ষকের সংখ্যা অনেকটা রাষ্ট্রীয় মর্যাদার উপর নির্ভরশীল। যে দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে শিক্ষকের সম্মান ও সম্মানি বেশি সে দেশে উত্কৃষ্ট শিক্ষকের সংখ্যা বেশি। যে দেশে উত্কৃষ্ট শিক্ষকের সংখ্যা বেশি সে দেশে উত্কৃষ্ট নাগরিকের সংখ্যা বেশি। উত্কৃষ্ট নাগরিক তৈরির লক্ষ্যে শিক্ষকের সম্মান ও সম্মানি সর্বাধিক নির্ধারণ করা কল্যাণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শিক্ষকের সার্বিক মর্যাদা তথা সম্মান ও সম্মানি সর্বাধিক হলেই সর্বাধিক যোগ্য লোক শিক্ষক হন। রাষ্ট্রের সর্বত্র ন্যায়-নীতি পরায়ন যোগ্য লোক নিশ্চিত করার পূর্বশর্ত হচ্ছে শিক্ষক হিসেবে সর্বাধিক ন্যায়-নীতি পরায়ন যোগ্য লোক নিশ্চিত করা। কোনো রাষ্ট্র যদি তা করতে ব্যর্থ হয় বা অনীহা দেখায় তো সেই রাষ্ট্রের নাগরিকদের সততা, সভ্যতা, যোগ্যতা ও দক্ষতা অনিশ্চিত। তাই শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হয়।
সামাজিক বা রাষ্ট্রীয়ভাবে শিক্ষকের মর্যাদা যতই উপরে নির্ধারণ করা হোক না কেন শিক্ষক নিজে উত্কৃষ্ট না হলে তা বজায় রাখা অসম্ভব। শিক্ষক নিজে নিকৃষ্ট হলে মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হয়। মর্যাদা বা ঘৃণা মানুষের অন্তর্নিহিত বিষয়। সর্বদা এটির বহিঃপ্রকাশ নাও ঘটতে পারে।
শিক্ষক উত্কৃষ্ট হলেই মানুষের কাছে বৃদ্ধি পায় তার প্রকৃত মর্যাদা। যে শিক্ষক যত বেশি উত্কৃষ্ট সে শিক্ষকের প্রকৃত মর্যাদা তত বেশি। দাপট প্রদর্শন ও শ্রদ্ধা অর্জন এক নয়। দাপটে প্রকৃত মর্যাদা নেই, শ্রদ্ধায় প্রকৃত মর্যাদা আছে। যে শিক্ষক তার শিক্ষার্থীকে যত বেশি সুশিক্ষা প্রদান করতে সক্ষম সে শিক্ষক তত বেশি শ্রদ্ধা অর্জন করতে সক্ষম। শিক্ষকের জ্ঞানের গভীরতায় ও দক্ষতার উচ্চতায় বিস্তৃত থাকে শিক্ষার্থীর শ্রদ্ধাবোধ। শিক্ষার্থীর মনে শিক্ষকের একটা চিত্র অঙ্কিত হয়। সেই চিত্রটি যত উত্তম হয় শিক্ষার্থী তত শ্রদ্ধাশীল হয়।
শিক্ষকের চিন্তা-চেতনা, চলা-বলা ও কাজ-কর্মের প্রতিফলন ঘটে শিক্ষার্থীর মনে।
শিক্ষক উত্তম চিন্তা ও কর্ম করতে ব্যর্থ হলে উত্তম মানুষ তৈরি করতে ব্যর্থ হন।
সমাজ ও রাষ্ট্রে উত্তম মানুষের অভাব হলেই শিক্ষকের মর্যাদার অভাব হয়। উত্তম মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেই শিক্ষকের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। এই উত্তম মানুষ তৈরির দায়িত্ব শিক্ষকের। যিনি শিক্ষক তিনি কোনোভাবেই অবহেলা করতে পারেন না এই দায়িত্বে।
কেননা শিক্ষকতা একটি ব্রত। নিয়োগপত্র পেলেই শিক্ষক হওয়া যায় না, শিক্ষক হয়ে উঠতে হয়।
লেখক:সাহিত্যিক,প্রাবন্ধিক ও শিক্ষাবিদ, অধ্যক্ষ-কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, ঢাকা।