পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ‘হকনগর (বাঁশতলা) শহিদ মিনার’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধ’। চারদিকে সবুজের সমারোহ। গলামোচড়ানো নদীর নয়নাভিরাম জলকেলি আর পাহাড়ে সাজানো বিস্তৃত এলাকা। হকনগর যেন রক্তের স্মৃতি ছোঁয়া এক কবিতার উপত্যকা!
স্মৃতিসৌধের প্রবেশপথে হকনগর মৌলা নদীর ওপর নির্মিত স্লুইসগেটটি একটি জলপ্রবাহ। পাহাড়ি ঝরনার মতোই এ স্লুইসগেট আলাদা সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে। স্লুইসগেট বেয়ে গড়িয়ে পড়া পানির শনশন শব্দে পুরো এলাকাই মুখর হয়ে থাকে।
অদূরেই দাঁড়িয়ে আছে ত্রিভুজ আকৃতির শহিদ মিনার। পাহাড় ঘেঁষা মৌলা নদীর তীরে শহিদ মিনার এলাকা এখন সুনামগঞ্জের অন্যতম পর্যটন এলাকা। সম্প্রতি এখানে নির্মিত হয়েছে ‘মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধ’। সবুজ পাহাড়ের সঙ্গে নীল আকাশে সাদা মেঘের মিতালি দেখে মনে হবে আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমিয়ে আছে।
এই শরতে শহিদ মিনারের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে দেখা মিলবে গুচ্ছগুচ্ছ কাশবন। উজানী নদীর কিনারে বসতবাড়ির আঙিনাতেও ফুটেছে কাশফুল। দূর থেকে দেখা যাবে, পাহাড়ে নেমে আসা মেঘমালা আর সমতলে সাদা কাশফুলের অনন্য সখ্য। নয়নাভিরাম সে দৃশ্য। শহিদ মিনার ঘুরে আসার পথে ভারতীয় সীমানার কোল ঘেঁষে বাংলাদেশের জুমগাঁও গারো পাহাড় (টিলা)। এটি অন্তত ২০০ বছরের পুরনো আদিবাসী অধ্যুষিত ছোট্ট এক পাহাড়ি গ্রাম। এককালে এখানে ব্যাপকভাবে জুম চাষ করতেন আদিবাসীরা।
হকনগর শহিদ মিনার এলাকা মুক্তিযুদ্ধকালীন ৫ নম্বর সেক্টরের সেলা (বাঁশতলা) সাব-সেক্টর সদর দপ্তর ছিল। ১৯৯৮ সালে এখানে সাব-সেক্টর কমান্ডার এ এস হেলালউদ্দিন তাঁর নিজস্ব অর্থায়নে শহিদ মিনারটি নির্মাণ করেন। এর আর্কিটেকচারাল ডিজাইন করেন বাংলাদেশ সরকারের অবসরপ্রাপ্ত আর্কিটেক্ট আমির হোসেন। পাশেই লাল-সবুজ পতাকায় আচ্ছাদিত মহান মুক্তিযুদ্ধে ১১ শহিদের কবর। কাছেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ও তাঁর অন্যতম সহচর আবদুল হক (এম এন এ হক)-এর ম্যুরাল। ২০১৯ সালের ২৬ মার্চ এখানে স্থানান্তরিত হয় ৫ নম্বর সেক্টরের বেসামরিক উপদেষ্টা জননেতা আবদুল হকের কবর। তাঁর নামেই এখানকার নামকরণ হয়েছে ‘হকনগর’।
মহান মুক্তিযুদ্ধে সেলা (বাঁশতলা) এই সাব-সেক্টরে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেন, ক্যাপ্টেন আকবর হোসেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা ইদ্রিস আলী, আবদুল হালিম, আবদুল মজিদ এবং বীরাঙ্গনা কাঁকন বিবি (নন গেজেট) ‘বীরপ্রতিক’ উপাধিতে ভূষিত হন।
হকনগর (বাঁশতলা) মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধ সুনামগঞ্জের দোয়রাবাজার উপজেলার বাংলাবাজার ইউনিয়নের সীমান্তে অবস্থিত।
মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী