ভুঁইফোঁড় সংগঠনের চাঁদাবাজিতে ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগ

প্রজন্ম লীগের অনুষ্ঠান বন্ধ করলেন ওবায়দুল কাদের

দলের নাম ভাঙিয়ে গড়ে উঠা ভুঁইফোঁড় সংগঠনগুলোর চাঁদাবাজিতে ক্ষুব্ধ কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউস্থ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ‘মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ’ নামে একটি সংগঠনের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গতকাল শনিবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগকে ‘এরা চাঁদাবাজ’ আখ্যা দিয়ে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের নাম জড়িয়ে গড়ে উঠা ভুঁইফোঁড় সংগঠনগুলোতে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের অতিথি হয়ে না যাওয়ার নির্দেশনাও দিয়েছেন তিনি।

বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শনিবার মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। এদিন সকালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলটির সম্পাদকমণ্ডলীর সভায় যোগ দিতে যথারীতি কার্যালয়ে আসেন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এ সময় কার্যালয়ের সামনে       ‘মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগে’র অনুষ্ঠান প্রস্তুতি তার চোখে পড়ে। পরে কার্যালয়ে ঢুকে দলের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়াকে প্রজন্ম লীগের অনুষ্ঠান বন্ধ করতে নির্দেশ দিলে সেই অনুযায়ী সভা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশনার পর সড়ক থেকে প্রজন্ম লীগের মঞ্চ সরিয়ে নেওয়া হয়।

সম্পাদকমণ্ডলীর সভায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মের ব্যাপারে আমাদের কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু লীগ আর আওয়ামী যখন যুক্ত হয় তখন এখানে আমাদের সংশ্লিষ্টতা এসে যায়। এখানে আমাদের ভাবমূর্তির বিষয়টা এসে যায়, কারণ এসব দোকান অনেকে খুলে থাকে চাঁদাবাজির জন্য, এগুলো আসলে চাঁদাবাজির প্রতিষ্ঠান। ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘সবাই করে তা না, কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান আছে, এরা চাঁদাবাজিনির্ভর। এরা দলের নাম ভাঙায়। কাজেই এসব সংগঠনের কোনো প্রকার আয়োজন, বৈঠক ও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী যেটাই হোক, আমি আমাদের কেন্দ্রীয় নেতাদের আহ্বান জানাব, আপনারা কোনো অবস্থাতেই ঐসব সংগঠনের সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থিত থাকবেন না।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আলোচনাসভা-সমাবেশের নামে অর্থ আয় করা, দলীয় নেতাদের কাছে গুরুত্ব পাওয়া এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে লাভবান হওয়ার চিন্তা থেকেই ভুঁইফোঁড় সংগঠনগুলো গড়ে ওঠে। নামসর্বস্ব এসব ‘রাজনীতির দোকানদাররা’ দলের কেন্দ্রীয় কিছু নেতার আশপাশে ঘোরাঘুরি করেন কিছুদিন। এরপর তাদের সঙ্গে সেলফি তোলেন। রাজনৈতিক কার্যালয়ের বাইরে ঘোরাঘুরিও করেন নিয়মিত। শীর্ষপর্যায়ের কোনো নেতার কাছে মুখটা পরিচিত হলেই খুলে বসেন রাজনীতির দোকান। এরপর চাঁদাবাজি, তদবির বাণিজ্যসহ নানা অপকর্মে জড়ান ‘রাজনীতির দোকানদাররা’। রাজধানী ও নিজ নিজ এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে নানা দুর্নীতিমূলক অনৈতিক কাজে জড়ান এক শ্রেণির ‘রাজনীতির দোকানদাররা’। মূলত দলের সুসময়ে তারা তত্পরতা দেখায়, কিন্তু খারাপ সময়ে তারা থাকেন না। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এসব সংগঠনকে বরাবরই ‘রাজনীতির দোকান’ বলে অভিহিত করে আসছেন।

জানা গেছে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভুঁইফোঁড় সংগঠন প্রতিষ্ঠার হিড়িক পড়ে যায়। কোনোমতে একটি সংগঠন বানিয়ে নামের শেষে ‘লীগ’ জুড়ে নিজেদের মূল দলের শরিক ভাবতে শুরু করে ভুঁইফোঁড় গোষ্ঠী। দিনকে দিন সংখ্যাটা বেড়েই চলেছে। পাড়া-মহল্লা, গ্রামে তো আছেই, শুধু রাজধানীতেই ‘লীগ’ জুড়ে দেওয়া সংগঠন পাওয়া যাবে কমপক্ষে ৩০০। অনুসন্ধানে কোনো ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি এসব সংগঠনের। শুধু ফেসবুকে একটি পেইজ কিংবা দিবসভিত্তিক কিছু ব্যানার-ফেস্টুন দেখা যায়।

আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রের ২৫ (২) ধারা অনুযায়ী আটটি সহযোগী সংগঠন হয়েছে। এগুলো হলো মহিলা আওয়ামী লীগ, কৃষক লীগ, আওয়ামী যুবলীগ, আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ, আওয়ামী যুব মহিলা লীগ, তাঁতী লীগ, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ এবং আওয়ামী মত্স্যজীবী লীগ। এর বাইরে ছাত্রলীগ ও জাতীয় শ্রমিক লীগ স্ব স্ব গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চলবে বলে গঠনতন্ত্রে স্বীকৃতি রয়েছে। এছাড়া গঠনতন্ত্রে স্বীকৃতি না থাকলেও স্বাধীনতা চিকিত্সক পরিষদ (স্বাচিপ) ও মহিলা শ্রমিক লীগকে দলটি ওন করে। ফলে সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম মিলে আওয়ামী লীগের স্বীকৃত ১২টি সংগঠন রয়েছে। আওয়ামী লীগের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো বাদ দিলে বঙ্গবন্ধু ও লীগ শব্দ যুক্ত বৈধ সংগঠন মাত্র ১৭টি। বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্ট এই ১৭টি সংগঠনকে অনুমোদন দিয়েছে। অবশ্য ট্রাস্ট অনুমোদিত ১৭টি সংগঠনের মধ্যে ১২টিই অঞ্চলভিত্তিক এবং একটি বিদেশে। এগুলো হলো : বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদ (সেগুনবাগিচা), বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদ (ধানমন্ডি), মুজিব সেনা পরিষদ (বনানী), বঙ্গবন্ধু একাডেমি, বঙ্গবন্ধু যুব পরিষদ (ধানমন্ডি), বঙ্গবন্ধু শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, বঙ্গবন্ধু শিশু কিশোর মেলা, বঙ্গবন্ধু সমাজ কল্যাণ পরিষদ (ঝিগাতলা), বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন (আমেরিকা), বঙ্গবন্ধু শিশু একাডেমি (খিলগাঁও), শেখ রাসেল মেমোরিয়াল সমাজ কল্যাণ সংস্থা (রামপুরা), বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন (পল্টন), বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থা, শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র (রায়েরবাগ), শেখ রাসেল স্মৃতি পাঠাগার (পিরোজপুর), বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা মঞ্চ (ফরিদপুর) ও শহীদ শেখ রাসেল স্মৃতি সমাজ কল্যাণ পাঠাগার (বরগুনা)। আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, এই ১৭টি সংগঠনের বাইরে ‘শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদ’কে স্বীকৃতি দেয় আওয়ামী লীগ।

জানা গেছে, বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বরের বাড়িটি ট্রাস্টের নামে লিখে দেয়। ১৯৯৪ সালে বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্ট গঠন করেন। ট্রাস্টের নীতিমালায় বলা হয়, বঙ্গবন্ধু বা তার পরিবারের সদস্যদের নাম ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান সামাজিক-সাংস্কৃতিক, স্বেচ্ছাসেবী ও দাতব্য কোনো সংগঠন গড়ে তুলতে চাইলে বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্ট থেকে অনুমোদন নিতে হবে। ট্রাস্ট গঠনের দুই বছর পর ১৯৯৬ প্রথমে বঙ্গবন্ধু বা পরিবারের সদস্যদের নামে সংগঠন অনুমোদন দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে উল্লিখিত ১৭টি সংগঠনকে অনুমোদন দেয় বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্ট। ২০১৫ সালের পর আর কোনো সংগঠন ট্রাস্টের অনুমোদন পায়নি। এখন অনুমতির আবেদন নেওয়াও বন্ধ করে দিয়েছে ট্রাস্ট।

প্রজন্ম লীগ নামে সাত সংগঠন

আওয়ামী লীগের নাম জড়িয়ে রাজধানীতে বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে  উঠছে বিভিন্ন সংগঠন। এর মধ্যে ‘প্রজন্ম লীগের’ নামেই রয়েছে অন্তত সাতটি সংগঠন। এই সাতটি সংগঠনের চারটি আবার ‘বাংলাদেশ আওয়ামী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ’ নামে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। এছাড়া বাংলাদেশ আওয়ামী প্রজন্ম লীগ, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ ও বাংলাদেশ আওয়ামী মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম লীগ নামে তিনটি সংগঠন সক্রিয় রাজধানীতে। ‘বাংলাদেশ আওয়ামী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের’ নামে যে চারটি সংগঠন রয়েছে তার একটির সভাপতি মো. ফয়জুল্লাহ ও সাধারণ সম্পাদক মো. রুকনুদ্দীন পাঠান। একই নামের পৃথক আরেকটি সংগঠনের নেতৃত্বে আছেন আসাদুজ্জামান দুর্জয় (সভাপতি), এবাদত মুন্সি (সাধারণ সম্পাদক)। তৃতীয়টির সভাপতির দায়িত্বে আছেন অ্যাডভোকেট কামাল হোসেন; সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রায়হান। এছাড়া বাংলাদেশ আওয়ামী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের চতুর্থ সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্বে আছেন রাজা মাহমুদ। অন্যদিকে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের সভাপতি ফাতেমা জামান সাথী, সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম স্বপন, বাংলাদেশ আওয়ামী মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম লীগের সভাপতি সাইফুর রহমান ছোট্ট ও সাধারণ সম্পাদক আজম। আর বাংলাদেশ আওয়ামী প্রজন্ম লীগের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন আবুল কালাম অনু।