শিফারুল শেখ
আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখলের এক মাস পার হলেও স্বীকৃতি আদায় করতে পারেনি তালেবান। ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত পাকিস্তান এবং প্রধান অংশিদার বলে তালেবানের আখ্যায়িত করা চীনও স্বীকৃতি দেয়নি। আর পশ্চিমা বিশ্ব তো এই স্বীকৃতি অনেক দূরে রয়েছে বলে জানিয়েছে। তাহলে কী তালেবান স্বীকৃতি পাবে না এমন প্রশ্ন আসাটাই স্বাভাবিক। তাহলে কী গৃহযুদ্ধ? কোনটি অপেক্ষা করছে আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষের সামনে?
এরকম অগণিত প্রশ্ন এখন তালেবানেরও সামনে। গোষ্ঠীটি নানা অঙ্গীকার করলেও কারও আস্থা অর্জন করতে পারছে না। কারণ তাদের ইতিহাস মানুষের কাছে পরিচিত। আবার এবার ক্ষমতায় এসেও অনেক অঙ্গীকার প্রথম সংবাদ সম্মেলনে করলেও তা রক্ষা করার চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। ফলে আফগানিস্তান স্বীকৃতিবিহীন রাষ্ট্রে পরিণত হলে তা দেশের মধ্যে মানবিক বিপর্যয় নিয়ে আসতে পারে। বিরোধী গোষ্ঠীগুলোও তালেবানের বিরুদ্ধে ক্ষেপেছে। বিক্ষোভের পাশাপাশি শুক্রবার তালেবানের গাড়ি লক্ষ্য করে বোমা হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
নারী অধিকার নিয়ে বিপদে তালেবান :তালেবানের প্রধান সমস্যা নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা। একদিকে শরীয়াহ আইন মেনে দেশ পরিচালনা এবং বিশ্বের দাবি মেনে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা। নারীদের পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গেলে শরীয়াহ আইনের কোনো মূল্য নেই। আবার শরীয়াহ আইন না মানলে ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো তাদের বলতেই পারে যে, ক্ষমতার লোভেই তালেবান শরীয়াহ আইনের কথা বলে ধর্মপ্রাণ মানুষকে যুদ্ধে নামিয়েছিল। ইতিমধ্যেই ছোট গোষ্ঠীগুলো বলতে শুরু করেছে, তালেবান যুদ্ধের মাধ্যমে জয় পায়নি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করেই ক্ষমতায় এসেছে। ফলে তালেবান উভয় সংকটে পড়েছে।
আফগানিস্তানে নারীরা আগের মতো ভীত নয়। এর আগের সরকারে আমলে তালেবান নারীদের শিক্ষা তো দূরের কথা ঘর থেকেই বের হতে দিত না। বের হলেও এমন বোরকা পরতে হতো যাতে চোখটাও ঢেকে রাখতে হতো। কিন্তু ২০০১ সালে তালেবান ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত হামিদ কারজাই এবং আশরাফ ঘানির সরকারের আমলে নারীদের অধিকার অনেকটাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নারীরা প্রতিবাদ করতে শিখেছে। পার্লামেন্টে নারীদের জন্য ২৭ শতাংশ আসন বরাদ্দ আছে। রাজনীতি, সরকার সব জায়গায় নারীদের বিচরণ লক্ষ্য করা গেছে। নারীরা যে কতো সাহসী তা দেখা গেছে তালেবান ক্ষমতা দখলের একদিন পরই কাবুলে রাস্তায় নারীদের প্রতিবাদ করার মাধ্যমে। তারা সরকারে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। তারা পোশাক নিয়েও অভিনব প্রতিবাদ জানিয়েছে। যা ২০ বছর আগে আফগান নারীদের দ্বারা কল্পনাও করা যেত না। নারীরা ক্রিকেট খেলছে, ফুটবল খেলছে, গান গাইছে। যদিও ফুটবল টিম ও সঙ্গীত শিল্পীরা পাকিস্তানে পাড়ি জমিয়েছে তালেবানের ভয়ে। বাংলাদেশের ব্র্যাকসহ বিভিন্ন এনজিও কাজ করছে যারা নারীদের স্বাবলম্বী করতে কাজ করেছিল। ফলে নারীদের সাহস আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানও সেই কথা স্বীকার করেছেন। বিশ্বের প্রধান ত্রাণ সংস্থাগুলো, আগের সরকারের বাজেটের ৮০% যাদের অর্থ থেকে এসেছে, তারাও বিষয়টার দিকে তীক্ষ নজর রাখছে। তালেবান মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়টি দৃশ্যত বন্ধ করে দিয়েছে। তার জায়গায় তারা এমন একটি বিভাগ চালু করেছে যার প্রধান কাজ কঠোর ধর্মীয় অনুশাসন প্রয়োগ করা।
সবাইকে সন্তুষ্ট করতে পারবে তালেবান? :পাকিস্তানে বিভিন্ন সময় হামলা চালিয়ে থাকে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। পাকিস্তানের সরকার চায় তালেবান এই গোষ্ঠীর নেতাদের তাদের হাতে তুলে দিক। কিন্তু তালেবানের দ্বারা সেটা অসম্ভব বলে মনে করা হয়। কারণ টিটিপিও তালেবানের ঘনিষ্ঠ হিসেবেই পরিচিত। লড়াইয়ে তাদেরও ভূমিকা আছে। রাশিয়া চায় আফগানিস্তানের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী যেন তাদের দেশে এবং সমর্থক দেশে ঢুকতে না পারে। তবে সামগ্রিকভাবে যে অঞ্চলটিকে রাশিয়া তাদের প্রভাব বলয়ের অংশ বলে বিবেচনা করে সেই মধ্য এশিয়া থেকে আমেরিকানদের চলে যাওয়া মস্কোর জন্য বড় একটি স্বস্তি।
মস্কোর রাজনৈতিক বিশ্লেষক আর্কাদি দুবনভের মতে, রাশিয়ার জন্য যেটা ভালো আমেরিকার জন্য তা খারাপ, আবার রাশিয়ার জন্য যেটি খারাপ, আমেরিকার জন্য তা ভালো। আমেরিকার জন্য আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি খারাপ এবং তা রাশিয়ার জন্য ভালো। এই দুই শক্তিকে ম্যানেজ করা তালেবানের জন্য কঠিনই হবে। চীন আফগানিস্তানে বিনিয়োগ করতে চায় এবং অবকাঠামো উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে চায়। অথচ সেখানে অবকাঠামো খাতে ভারতের বড় বিনিয়োগ রয়েছে। অন্যান্য দেশও বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাবে। চীন উইঘুর মুসলিম নিয়ে চিন্তিত যে তালেবান যেন তাদেরকে আশ্রয় না দেয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র উইঘুর মুসলিম নিয়ে চীনের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে থাকে। ফলে উইঘুরদের আফগানিস্তানে একেবারে নিষিদ্ধ করাটা কঠিন হবে।
পশ্চিমা বিশ্বের দাবিগুলো মানা তো সবচেয়ে বেশি কঠিন তালেবানের জন্য। কারণ তাতে তারা যে শরীয়াহ আইনের কথা বলে আসছে তা ঠিক রাখা সম্ভব নয়। আবার হাক্কানি গ্রুপ কট্টর। তারা নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে পরিচিত। পশ্চিমা বিশ্ব তাদের মানে না। কিন্তু তারাই মন্ত্রিসভার সদস্য। বড় চিন্তা সন্ত্রাসের হুমকি। যদিও আমেরিকা এবং তালেবানের মধ্যে যে চুক্তি হয়েছে তাতে বলা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র দেশগুলোর ওপর হামলা চালাতে কোনো জঙ্গি গোষ্ঠী যেন আফগানিস্তানকে ব্যবহার না করতে পারে তালেবান তা নিশ্চিত করবে, কিন্তু সেই ভরসা পশ্চিমারা করতে পারছে না। কাবুল বিমানবন্দরে হামলার ঘটনা প্রমাণ করে এসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আফগানিস্তানে তত্পর। আইএস দ্বারা উদ্বুদ্ধ বিভিন্ন গোষ্ঠী তাদের প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণ করার চাপে পড়তে পারে বলে জানান জাকার্তায় গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর পলিসি অ্যানালাইসিস অফ কনফ্লিক্ট (আইপিএসি) এর পরিচালক সানা জাফরি। তিনি বলেন, আইএসপন্থি গোষ্ঠীগুলো তালেবানের বিজয়ের নিন্দা করছে।