গৃহযুদ্ধের পথে ভেনিজুয়েলা!

ভেনিজুয়েলায় বিরোধী নিয়ন্ত্রিত পার্লামেন্টের স্পিকার হুয়ান গুয়াইদোকে ‘অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ ৩০টি দেশ। কিন্তু দেশের ক্ষমতায় আছেন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। সেনাবাহিনীর সমর্থনও তার প্রতি। এখন আলোচনা চলছে দেশটিতে সিরিয়ার মতো গৃহযুদ্ধ বেধে যাবে কিনা। যদিও গুয়াইদো সেই ধরনের আশঙ্কা নাকচ করে দিয়েছেন। তবে বিশ্লেষকরা সেই আশঙ্কাকে উড়িয়ে দিচ্ছেন না।

সামরিক হস্তক্ষেপে বিপদ

যুক্তরাষ্ট্র সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পরিকল্পনা করেছে। হোয়াইট হাউসের এক সিনিয়র কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তারা কারাকাসের সেনাবাহিনীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র চায় সেনাবাহিনী গুয়াইদোকে সমর্থন দিক। তবে ব্লুমবার্গের সম্পাদকীয় বোর্ড বলছে, ভেনিজুয়েলার ইতিহাস থেকে জানা যায়, সেখানে সামরিক হস্তক্ষেপ কখনো সুফল বয়ে আনেনি। বরং পরিস্থিতি আরো খারাপ করে তুলতে পারে। আর সেই খারাপ পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ঠিকভাবে সামাল দিতে পারবে কিনা তা নিয়েও সংশয় আছে।

 

আন্তর্জাতিক সমর্থন নিয়ে বিতর্ক

কেনিয়ার জনপ্রিয় মিডিয়া দ্য স্টার জানিয়েছে, গুয়াইদোকে স্বীকৃতির বিষয়টি কারাকাসে নয়, ওয়াশিংটনে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত ২৩ জানুয়ারি গুয়াইদো নিজেকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা দেন। ১৯৫৮ সালের এই দিনেই স্বৈরশাসক মারকোজ পেরেজ জিমেনেজকে উত্খাত করা হয়েছিল। এমন একজন ব্যক্তিকে স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা যাকে গত সপ্তাহ পর্যন্ত ২০ শতাংশের কম মানুষ চেনে। তিনি কে সেই বিষয়টিই তাদের কাছে স্পষ্ট নয়। দুর্ঘটনাবশত ৩৫ বছর বয়সী গুয়াইদো পার্লামেন্টের বিরোধী নেতা নির্বাচিত হয়েছিলেন। মাদুরো সরকার বামপন্থি। আর ল্যাটিন আমেরিকায় বামপন্থি সরকারকে উত্খাতের রেকর্ড আমেরিকার আছে। কলম্বিয়া এবং ব্রাজিলের মতো ডানপন্থি সরকারগুলো যে বামপন্থিদের উত্খাতে সমর্থন দেবে সেটা নিয়ে বিস্ময়ের কিছু নেই। কিন্তু কানাডা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি এবং স্পেনের মতো দেশও ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপে সামিল হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদুরোর ক্ষমতায় থাকার নৈতিক অধিকার হয়তো নেই। তার আমলে অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে গেছে। গত বছরের নির্বাচনে তিনি প্রতারণা করে জিতেছেন। ৩০ লাখ মানুষ বা মোট জনসংখ্যার ১০ ভাগ মানুষ ভেনিজুয়েলা থেকে পালিয়েছেন। কিন্তু সেটা ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ সমস্যা, বিদেশি রাষ্ট্র বিশেষ করে আমেরিকার সমস্যা নয়। ল্যাটিন আমেরিকায় একটি খারাপ ইতিহাস আছে। তাহলো বামপন্থি সরকারকে উত্খাত। যেমন কিউবা (১৯৬০), নিকারাগুয়া (১৯৮১) এবং ভেনিজুয়েলা (২০০২)। এসব দেশের সরকার গঠিত হয়েছিল অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। আবার ব্রাজিল (১৯৬৪), চিলি (১৯৭৩) এবং আর্জেন্টিনায় (১৯৭৬) সরকার উত্খাতে সহায়তা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এসব দেশের সরকার ছিল গণতন্ত্র বিরোধী।

 

গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা

রাশিয়া এবং নিকোলাস মাদুরো গৃহযুদ্ধের আশঙ্কার কথা বলেছেন। কিন্তু গুয়াইদো তা নাকচ করে দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ ও কানাডা। তারা বিরোধী নেতা গুয়াইদোকে অর্থ এবং অস্ত্র দিয়ে সহায়তা দিতে পারে। এই সহায়তা দেশটিকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। আর এভাবে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হস্তক্ষেপের দিকে যেতে পারে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের সিনিয়র কর্মকর্তারা বলছেন, সামরিক হস্তক্ষেপ কাম্য নয়। সেনাবাহিনী মাদুরোকে পছন্দ করে, গুয়াইদোকে নয়। আর আফগানিস্তান, ইরাক এবং লিবিয়ায় এই প্রচেষ্টা সফল হয়নি। সেনাবাহিনী বিদেশিদের কথা শুনে হস্তক্ষেপ করে। কিন্তু পরে দেশগুলো গৃহযুদ্ধের সম্মুখীন হয়। ভালো কিছুর আশায় হস্তক্ষেপ করা হলেও শেষ পর্যন্ত কান্নার মাধ্যমে শেষ হচ্ছে। ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হস্তক্ষেপ করলে মাদুরোর মিত্র রাশিয়া, চীন এবং কিউবা অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করতে পারে। ফলে দু্ইপক্ষের মধ্যেই কঠিন লড়াই হবে।

 

নতুন নির্বাচন ও মাদুরো

মাদুরো যদি পুনঃনির্বাচনের দাবি মেনে নিয়ে নির্বাচনের ঘোষণা দিতেন তাহলে এটা স্পষ্ট হয়ে যেত যে, ২০১৮ সালের মে মাসের নির্বাচন ছিল কারচুপিতে ভরা এক প্রহসন। এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। স্পেনের নাভারা ইউনিভার্সিটির রাজনৈতিক বিশ্লেষক এমিলি জে ব্লাস্কো বলেছেন, মাদুরো যদি পুনঃনির্বাচনের দাবি মেনে নেন তাহলে এর অর্থ হচ্ছে, তাকে আসলে ক্ষমতা ছাড়তে হবে। কারণ পুনঃনির্বাচনের অর্থ হচ্ছে আগের নির্বাচনটিতে কারচুপির অভিযোগ মেনে নেওয়া। ভেনিজুয়েলাতে এরপর নির্বাচন হলে সেটিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করানোর কথা বলেছেন উরুগুয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট জোসে মুজিকা।