সুনামির আরেক নাম নীরব ঘাতক। উত্পত্তি নীরবে, আসেও চুপিচুপি; কিন্তু ধ্বংস করে যায় সরবে।
২০০৪ সালে ঘটে যাওয়া ইন্ডিয়ান সুনামি দিয়ে এই শতাব্দীতে সুনামির সঙ্গে মানুষের পরিচয়। ৯ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্প হয়েছিল তার আগে ভারত মহাসাগরের কোথাও, আর তাতে তৈরি হওয়া সুনামির শক্তি ছিল ২৫ হাজার অ্যাটম বোমা বিস্ফোরণের সমান শক্তি। তার আগেও সুনামি হয়েছে কিংবা হতো; কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে হয়ে যাওয়া সুনামির তীব্রতায় আড়াই লাখের চেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু সুনামিকে নতুন করে স্মৃতিতে তুলে আনে।
ইংরেজিতে বলে Tsunami। জাপানি শব্দ থেকে এই শব্দের উত্পত্তি। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি সুনামি হয় জাপানে। পৃথিবীর ৮০ শতাংশ সুনামি হয় প্রশান্তমহাসাগরে। আড়াই হাজার বছর আগে প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসে Thucydides মেডিটেরিনিয়ান সাগরে সুনামির কথা উল্লেখ করেছিলেন।
ভূমিকম্প থেকে অগ্ন্যুত্পাত, সাইক্লোন থেকে টর্নেডো, প্রাকৃতিক বিপর্যয়গুলো মানব ইতিহাসে যুগে যুগে ছিল। বিশ শতকে এসে মানুষ ধীরে ধীরে বোঝার চেষ্টা করছে এসব দুর্যোগকে। এদের মধ্যে সুনামি অন্যতম। এক একটি সুনামির দৈর্ঘ্য হতে পারে ৫০০ মাইল, উচ্চতায় হতে পারে ১০০ ফিট। একটা সুনামির বেগ হতে পারে সুপারসনিক জেটের চেয়েও দ্রুত। সময়ের ব্যাপ্তিতে কয়েক মিনিট থেকে ঘণ্টাখানেক চলতে পারে সুনামির তাণ্ডব।
কিন্তু কী করে সুনামি হয়, কেন হয়, কীভাবে হয়, কখন হয়, বিষয়গুলো পরিষ্কার করতে শুরুতে সুনামি কী—এটা দিয়েই শুরু করা যাক।
সমুদ্রের বিশাল জলরাশির একটা অংশ হঠাত্ ফুলে ফেঁপে অনেকগুলো বড় বড় ঢেউয়ের সিরিজ হয়ে উঠলে তাকে সুনামি বলে। সুনামি মানেই পাহাড়সম উচ্চতার বড় বড় ঢেউ, কেউ কেউ বলে ট্রেন অব ওয়েব। যে কারণে অনেকে সুনামিকে tidal wave বলে। ঢেউয়ের প্রবাহ। কেউ কেউ সুনামিকে বলে Killer wave; কিন্তু বিজ্ঞানীদের মতে tidal শব্দটি ভুল। কেন ভুল তার উত্তরটি রয়েছে—ঢেউ যে কারণে হয় সুনামি সে কারণে হয় না। সুনামি হয় অন্য কারণে।
সুনামি কেমন করে হয় তার বর্ণনা দেওয়ার আগে জেনে নিই ঢেউ কেমন করে হয়। সমুদ্রের ঢেউ শুধু বাতাসের কারণে হয় না। অনেকে ভাবে ঢেউয়ের পানি দুলে ওঠে কেবল বাতাসের কারণে। ঢেউ হয় চাঁদ এবং সূর্যের গ্রাভিটির কারণে। চাঁদের এবং সূর্যের গ্রাভিটি পৃথিবী পৃষ্ঠে থাকা জলকে তার দিকে টানে, আবার পৃথিবীর গ্রাভিটি জলকে তার দিকে টেনে ধরে রাখে। তৈরি হয় জলের প্রবাহ বা তরঙ্গ। এটাই ঢেউ। সে ঢেউগুলোর একটি নির্দিষ্ট মাত্রা আছে; কিন্তু সুনামির ঢেউ ভিন্ন রকম।
সুনামি দুইভাবে হয় বা হতে পারে। প্রাকৃতিক কারণে অথবা কৃত্রিম সৃষ্ট কারণে।
সুনামি হয় সমুদ্রের তলদেশে কোনো ভূমিকম্প হলে, কোনো অগ্ন্যুত্পাত হলে, সমুদ্রের তলদেশে থাকা বড় কোনো গ্লেসিয়ার হঠাত্ ধসে পড়লে অথবা কোনো বিশাল মেটেরয়েড ভূপৃষ্ঠে এসে সমুদ্রের কোনো অংশকে আঘাত করলে।
কৃত্রিম সৃষ্ট উপায়ের মধ্যে সমুদ্রের তলদেশে কোনো বড় বিস্ফোরণ ঘটালে, কোনো পরীক্ষামূলক বোমার বিস্ফোরণ ঘটালে সুনামি হতে পারে।
তারমানে সুনামির শুরুটা হয় সমুদ্রের ভূমিতে, ওপরে জলের মধ্যে নয়।
জাপানি ভাষায় সুনামিকে বলে কানজি। এর অর্থ পোতাশ্রয়ের ঢেউ। সুনামির ঢেউ ১০০ ফিট পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। সুনামির ঢেউ ঘণ্টায় ৫০০ মাইল বেগে ছুটতে পারে। ঢেউয়ের ব্যাপ্তি এবং দ্রুততা, শুধু এই দুটো দিয়েই বোঝা যায় শান্তশিষ্ট ঢেউ যখন দৈত্য হয়ে ওঠে, কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে।
কেমন করে সুনামি হয়—পুরো ব্যাপারটিকে বিজ্ঞানীরা পাঁচ ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথমে : সক্রিয়করণ, দ্বিতীয় : প্রস্তুতি, তৃতীয় : তৈরি হওয়া চতুর্থ : আত্মপ্রকাশ এবং পঞ্চম : পরিণতি।
সুনামির শুরু হয় কূল থেকে অনেক দূরে সমুদ্রের তলদেশে কোথাও। সি ফ্লোরে ভূমিকম্পজাতীয় কিছু হলে তলদেশের ওপরে থাকা মাত্র কয়েক মিটারের বিশাল জলরাশি একসঙ্গে হঠাত্ করে এলোমেলো হয়ে যায়। এই এলোমেলো জলরাশি তখনো ওপরের জলরাশি ঢেউয়ের ওপর প্রভাব ফেলে না। তলদেশের এই বিশাল জলরাশি ওপরের জলের চেয়ে দ্রুত প্রবাহিত হয়। সমুদ্রের ওপরের ঢেউগুলো যেখানে বাতাসের তোড়ে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার বেগে যায়, সেখানে সমুদ্রের গভীর তলদেশে এই জলের সে াত ঘণ্টায় ১ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত হয়ে দাঁড়ায়। সমুদ্রের উপরিভাগে এক একটি ঢেউয়ের ব্যাপ্তি যেখানে ১০০ মিটার পর্যন্ত হয় মাত্র, সেখানে সমুদ্রের তলদেশে এক একটি এমন ঢেউয়ের ব্যাপ্তি ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। আস্তে আস্তে এই বিশাল ঢেউ ওপরের জলরাশিকে প্রভাবিত করে কূলের দিকে ছুটতে থাকে। ওপরের ঢেউগুলো নিচের বিশাল ঢেউয়ের তরঙ্গে ফুলে ফেঁপে ১০ ফুট থেকে ১০০ ফুট পর্যন্ত হয়ে ওঠে এবং কূলের দিকে দ্রুত ছুটতে থাকে। এক একটি ঢেউ এমন উচ্চতায় পাঁচ থেকে ছয় মিনিট থাকে। সামনে ছোট ঢেউ কূলে এসে আছড়ে পড়লে পেছনের ঢেউ আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সুনামির ঢেউ প্রথমে এমন করে একবার বিশাল জলরাশি নিয়ে আঘাত করে সামনে যা পায়, ভেঙেচুরে দেয়। দ্বিতীয় ধাক্কাতে সেই ভাঙা অংশগুলোকে সমুদ্রে টেনে নেয়।
এমন করে হঠাত্ দৈত্যের মতো এসে এক কিলোমিটারের মতো কূলের কাছের যা কিছু আছে, ভেঙে গুঁড়িয়ে আবার সমুদ্রে ফিরে যায়।
সুনামি হলে সাঁতার কাটার চিন্তা করবেন না। হাতের কাছে শক্ত কোনো কিছু ধরে থাকবেন। যদি সেটাও সম্ভব না হয়, কিছু একটা ধরে ঢেউয়ের সঙ্গে ভাসতে চেষ্টা করবেন, তবুও ভুল করে সাঁতরাতে চেষ্টা করবেন না।
n লেখক :কথাসাহিত্যিক ও বিজ্ঞান
লেখক, লন্ডন, ইংল্যান্ড