শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরলেন। তিনি যখন ফেরেন তখন আমার মনে উদয় হয়েছিল একটি বাক্য। ভেবেছিলাম, বাংলাদেশ নির্বাসন থেকে অস্তিত্বে ফিরল। আমার এমন ভাবনার উত্স ছিল ১৯৭২ সালের ১৭ জানুয়ারি টাইম ম্যাগাজিনের একটি প্রচ্ছদ প্রতিবেদন। সেখানে বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের সমার্থক করা হয়েছিল। ঠিক একইভাবে শেখ হাসিনাকেও আমি বাংলাদেশের সমার্থক ভেবেছিলাম এই জন্য যে, ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ছিনতাই হয়ে গিয়েছিল। শেখ হাসিনা দেশে ফিরেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতীক হয়ে। আমার ভাবনাটা যে অমূলক ছিল না, তার প্রমাণ কবি হাসান হাফিজুর রহমান শেখ হাসিনাকে বলেছিলেন, ‘আপনিই তো বাংলাদেশ’। তো সেই বাংলাদেশের পথচলা শুরু হলো যখন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬-এ আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক নির্বাসন থেকে ফিরে ক্ষমতায় অভিষিক্ত হলো। তার পরে আবার ছেদ পড়ল। কিন্তু মোটামুটিভাবে তিনি দলের নেতৃত্বে আছেন চার দশক। আর সরকারের নেতৃত্বে প্রায় ১৭-১৮ বছর। তো এই দীর্ঘ সময় তাকে পর্যবেক্ষণ করেছি এবং সেই পর্যবেক্ষণজনিত উপলব্ধির কিছু অংশ হলো এই—তিনি সম্মোহনী নেতা। তার সম্মোহনের আছে দুটো উপাদান। একটি হচ্ছে তিনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা। অর্থাত্ আহরিত সম্মোহন। আরেকটি হচ্ছে নিজস্ব কর্মকাণ্ড দিয়ে সেই সম্মোহনে সংযোজন করেছেন। তিনি সাহসী নেতা। তার সাহসের জন্যই আমরা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার করতে পেরেছি। তার সাহসের জন্যই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজাকারদের বিচার করতে পেরেছি। তার সাহসের জন্যই নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতু তৈরি করতে পেরেছি। আবার ধরা যাক, তিনি সৃজনী উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারী। যেমন, কমিউনিটি ক্লিনিক তার মস্তিষ্কপ্রসূত। যেমন, ভূমিহীন গৃহহীন মানুষের জন্য ঘর বানিয়ে দেওয়া এই ধারণাটিও তার মস্তিষ্কপ্রসূত। আবার মানবিক দিক থেকে যদি দেখি, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে তিনি ‘মানবতার জননী’ আখ্যা পেয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ এখন স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ পেয়েছে।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বের অর্জন যেমন আছে চ্যালেঞ্জও আছে। প্রথম চ্যালেঞ্জটি হচ্ছে—বৈষম্যপূর্ণ বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, এখনো উন্নয়ন হয়নি। উন্নয়ন হচ্ছে সমতাবৃত্তিক প্রবৃদ্ধি। কাজেই এই বৈষম্য নিরসনের চ্যালেঞ্জ শেখ হাসিনাকে কাঁধে নিতে হবে। সুশাসন নেই, শাসনও নেই। সেই দায়িত্বও তাকে নিতে হবে। তবে, তার অর্জন আর চ্যালেঞ্জ সব মিলিয়ে বাংলাদেশ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আলোর পথযাত্রী। জন্মদিনে আমার অভিনন্দন গ্রহণ করুন শেখ হাসিনা। লেখক :ইতিহাসবিদ, অধ্যাপক