কন্যাশিশুর অবস্থান বদলালেও রয়ে গেছে অনেক চ্যালেঞ্জ

আজ জাতীয় কন্যাশিশু দিবস

মোরশেদা ইয়াসমিন পিউ

সমাজে কন্যাশিশুদের অবস্থান বদলেছে। তবে রয়ে গেছে অনেক  চ্যালেঞ্জ। অতীতের মতো নানা কুসংস্কার আর বাধা সমাজে তেমন নেই। এখন আর কেউ কন্যাশিশুর জন্ম অভিশাপ মনে করেন না। তারা এখন শিক্ষা-সংস্কৃতি, খেলাধুলাসহ নানা ক্ষেত্রেই এগিয়ে। ফলে স্বল্পশিক্ষিত ও অশিক্ষিত পরিবারেও কন্যাশিশুদের গুরুত্ব বেড়েছে। মাধ্যমিক কিংবা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলে ছেলে শিক্ষার্থীর চেয়ে মেয়ে শিক্ষার্থীর ফলাফল বরাবরই ভালো। তবে দেশে কন্যাশিশুদের এত অগ্রগতির পরও নানা প্রতিবন্ধকতার ভেতর দিয়ে তাদের বেড়ে উঠতে হয়। এই বেড়ে উঠার পেছনে নিরাপত্তাহীনতা বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে কন্যাশিশুদের দ্রুত বিয়ে দেওয়াটাকেই সমাধান মনে করেন অভিভাবকরা।

তারা বলেন, যুগের সঙ্গে কন্যাশিশুদের গুরুত্ব বাড়লেও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এখনো বদলায়নি। আর তাই এখনো পদে পদে সহিংসতার শিকার হতে হয় কন্যাশিশুদের। প্রযুক্তি ব্যবহার করার কারণে কন্যাশিশুরা বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে, তারা পর্নোগ্রাফির শিকার হচ্ছে, এসব কারণে কন্যাশিশুদের করোনাকালে বেড়েছে বিষণ্ন্নতা এবং তা থেকে আত্মহত্যা। এখনো বাল্যবিবাহ এবং ধর্ষণের হার বলে দেয় সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি কন্যাশিশুদের অনুকূলে নেই। বিজ্ঞজনেরা বলছেন, সুন্দর সমাজ গড়তে কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সমাজে ধর্ষণ ও বাল্যবিবাহ বন্ধে জোরালো ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে রাষ্ট্রকে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাইমারি থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষায় বেড়েছে নারীর সংখ্যা। প্রশাসন থেকে সেনাবাহিনী কোথাও পিছিয়ে নেই নারীরা। তবে কন্যাশিশুকে একজন মানুষ হিসেবে বিবেচনার অমসৃণ পথ পেরুতে এখনো যেতে হবে অনেক দূর। শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রতিটি কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিতই সরকারের মূল লক্ষ্য।

আজ ৩০ সেপ্টেম্বর জাতীয় কন্যাশিশু দিবস। এ বছর প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে—‘আমরা কন্যাশিশু, প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ হব ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ব’।     

কন্যাশিশুর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বাল্যবিবাহ। বাল্যবিবাহের কারণে প্রতিবছর কন্যাশিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। করোনাকালে সেই প্রবণতা আরো বেড়েছে। বাল্যবিবাহের ফলে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার অন্যতম উদাহরণ যশোরের মণিরামপুরের পাড়িয়ালি বালিকা মাদ্রাসা। করোনা সংক্রমণে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে এই মাদ্রাসাটিও বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় আট মাস পর যখন অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়ার জন্য মাদ্রাসা খোলা হয়, তখন জানা যায় এ সময় ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির ২০ ছাত্রীর বিবাহ হয়ে গেছে। বেসরকারি সংস্থাগুলো বলছে, করোনাকালে দেশে বাল্যবিবাহ অস্বাভাবিকহারে বেড়েছে। গত মার্চে প্রকাশিত মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের জরিপে দেখা যায়, করোনাকালে গত বছর এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সাত মাসে দেশের ২১ জেলার ৮৪ উপজেলায় ১৩ হাজার ৮৮৬টি বাল্যবিবাহ হয়েছে।

এ বছর জানুয়ারিতে প্রকাশিত এডুকেশন ওয়াচের অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন ২০২১-এ ঝরে পড়ার ব্যাপারে উদ্বেগজনক তথ্য মেলে। গত বছরের অক্টোবরে জাতিসংঘের শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে বিশ্বে শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অষ্টম অবস্থানে এবং দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শীর্ষে। দেশে বাল্যবিবাহে শীর্ষে ঢাকা বিভাগ। জেলার মধ্যে শীর্ষে চাঁপাইনবাবগঞ্জ। সবচেয়ে কম বাল্যবিবাহ ছিল চট্টগ্রাম বিভাগে।

জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরামের সম্পাদক নাছিমা আক্তার জলি ইত্তেফাককে বলেন, কন্যাশিশুদের অবস্থান শহরে বদলালেও তৃণমূলে তাদের অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। এর মধ্যে বড় চ্যালেঞ্জ বাল্যবিবাহ, সেটা করোনাকালে আরো বেড়েছে। আছে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, কন্যাশিশুরাই আগামীতে উন্নত বাংলাদেশ গড়তে মূল ভূমিকা রাখবে। আগে কন্যাশিশু জন্ম দেওয়ার জন্য নারীদের অনেক নির্যাতনের শিকার হতে হতো। সমাজে দৃষ্টিভঙ্গির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। কন্যাশিশুরা এখন আর অপ্রত্যাশিত নয়। কন্যাশিশুরা শিক্ষিত হলে তারা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।