‘আমাদের ছেলে বেলায় কোনো ডিজিটাল পদ্ধতি ছিল না। প্রবীণ বয়সে এসে ডিজিটালাইজেশন দেখছি। প্রথমদিকে মানিয়ে নিতে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। আমি মনে করি, শিখিয়ে দেওয়ার মতো কেউ থাকলে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া যায়।’ ডিজিটাল সমতার বিষয়ে এভাবেই নিজের অভিমত জানালেন ষাটোর্ধ্ব মলুদা খান।
ইত্তেফাক অনলাইনকে মলুদা খান বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্যান্য ডিজিটাল প্রযুক্তি তরুণরা যেভাবে ব্যবহার করেন, প্রবীণরা সেভাবে করেন না। দুই প্রজন্মের মধ্যে একধরনের দূরত্ব আছে। তবে তরুণদের উচিত বিষয়টি নিয়ে হাসিঠাট্টা না করে প্রবীণদের সহায়তা করা।’
‘ডিজিটাল সমতা, সব বয়সের প্রাপ্যতা’ স্লোগানকে সামনে রেখে শুক্রবার (১ অক্টোবর) পালিত হচ্ছে বিশ্ব প্রবীণ দিবস। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় এক কোটি ৩০ লাখের বেশি প্রবীণ বা সিনিয়র সিটিজেন রয়েছেন। অপরিহার্য ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করতে গিয়ে তারা এই বয়সে সমস্যার সম্মুখীনও হচ্ছেন। আবার তরুণদের সঙ্গে একধরনের মানসিক দূরত্বও তৈরি হচ্ছে তাদের।
মলুদা খান
এই সমস্যার সমাধান ত্রিমুখী উপায়ে করা যায় বলে মনে করেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতার শিক্ষক আফতাব হোসেন। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সিনিয়র লেকচারার ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘আমরা যদি শ্রেণিকক্ষের কথাই ধরি, তাহলে দেখবো সিনিয়র শিক্ষকদের সঙ্গে তরুণ শিক্ষার্থীদের একটা দূরত্ব আছে। এই সংকট সমাধানে দুইপক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সিনিয়রদের কাছে আমাদের এক্সপেক্টেশন কিছুটা কম রাখতে হবে। আবার তাদের কাজে জুনিয়রদের সহায়তা করতে হবে। সহমর্মিতার জায়গা থেকে বিষয়টা দেখতে হবে।’
ইত্তেফাক অনলাইনকে এই শিক্ষক আরও বলেন, ‘‘এই দূরত্বকে এখন বলা হচ্ছে ‘ডিজিটাল ডিভাইড’। একদিকে সিনিয়ররা, অন্যদিকে তরুণরা। তবে তৃতীয় আরেকটি পক্ষ এখানে আছে। তারা হচ্ছেন সফটওয়্যার নির্মাতা। তারা যেন এগুলো বানানোর সময় সিনিয়রদের কথা মাথায় রাখেন। ব্যবহারপদ্ধতি সহজ করেন। এই তিন পক্ষের সমন্বয়েই কমতে পারে ডিজিটাল ডিভাইড।’
আফতাব হোসেন
আবৃত্তিশিল্পী মাসুম আজিজুল বাসার দাবি করেছেন, ‘সহমর্মিতা নয় তরুণদের দায়িত্বই হচ্ছে, প্রবীণদের সহায়তা করা।’ তিনি ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘অনেক জিনিস আছে, সিনিয়র সিটিজেনরা আমাদের শিখিয়েছেন। আমাদের বাবা-মা যখন আমাদের বড় করেছেন, তখন সেটা দয়া-মায়ার জায়গা থেকে করেননি। এটা তাদের দায়িত্ব ছিল। তরুণদেরও দায়িত্ব ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার প্রবীণদের শেখানো।’
মাসুম আজিজ আরও বলেন, ‘আরেকটি জিনিস হচ্ছে, প্রবীণরা ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভোগেন। মোবাইলের একটা অপশন প্রেস করলে কী ঘটবে, তা নিয়ে একধরনের দোনামোনায় ভোগেন। অনেক উচ্চশিক্ষিত সিনিয়র সিটিজেনও এই সমস্যার মুখোমুখি হন। প্রত্যেক ছেলেমেয়ে যদি তাদের বাবা-মাকে সামান্য সহযোগিতা করেন, তাহলেই প্রবীণরা এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারবেন।’
মাসুম আজিজুল বাসার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল সংসদের সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) সাবরিনা স্বর্ণা ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘যেহেতু মোটাদাগে তরুণরা ডিজিটাল্ প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রবীণদের চেয়ে এক্সপার্ট, তাই সহায়তার দায়িত্ব তাদেরই নিতে হবে। এটা করতে হবে একেবারে মাইক্রো লেভেল থেকে। পরিবার থেকে এই সহায়তা শুরু হলেই দুই প্রজন্মের দূরত্ব কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।’
সাবরিনা স্বর্ণা
তরুণ নাট্যকর্মী সুপ্তি দাস চৈতি বলেন, ‘সব কাজই এখন ডিজিটাল হয়ে গেছে। উদাহরণ হিসেবে করোনা টিকা নিবন্ধনের কথা ধরি। দেখা যাচ্ছে, আমি আমার বাবা-মায়ের জন্য টিকার রেজিস্ট্রেশন করে দিলাম। সেই টিকাকার্ড ডাউনলোড করতে তারা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। সন্তান দূরে থাকলে তারা প্রযুক্তি ব্যবহার নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন।’
সুপ্তি দাস চৈতি আরও বলেন, ‘সোশাল মিডিয়া প্রবীণরা ব্যবহার করেন কিন্তু তারা এটা নিয়ে সতর্ক নন। অনেক কিছু সেখানে দেখেই তারা বিশ্বাস করে ফেলেন, প্রতারণার শিকার হন। আবার সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমে তরুণদের অনেক আচরণই প্রবীণরা বোঝেন না। এখানে একটা দূরত্ব তৈরি হয়। আমার মনে হয়, প্রবীণদের ডিজিটালি শিক্ষিত করতে সরকারের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।’
ইত্তেফাক/এনই