আবারও বাংলাদেশি সিনেমায় কাজ করছেন কলকাতার জনপ্রিয় অভিনেতা রজতাভ দত্ত। শাপলা মিডিয়া ব্যানারে ‘প্রিয়া রে’ শিরোনামে একটি সিনেমার শুটিংয়ে অংশ নিতে চাদঁপুরে এসেছেন তিনি। চাঁদপুরের এক গ্রামীণ পরিবেশে গত মঙ্গলবার (২৮ সেপ্টেম্বর) থেকে শুটিং শুরু হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে শুটিং সেটে বসেই রজতাভ দত্ত সঙ্গে দীর্ঘ এ আলাপ করেছেন একঝাক সাংবাদিক। এসময় সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন এই অভিনেতা।
প্রশ্ন: পূজন মজুমদারের ‘প্রিয়া রে’ সিনেমায় আপনার চরিত্রটা কেমন হচ্ছে?
রজতাভ দত্ত: রোমান্টিক গল্পের সিনেমা। ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে এটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এই সিনেমায় নায়িকা কৌশানী মুখার্জির বাবা চরিত্রে অভিনয় করছি। নতুন এক অভিজ্ঞতা। শান্ত ও সেলিম খানের সঙ্গে এর আগে কাজ করেছি। পূজনের নির্দেশনায় এই প্রথম করছি। খুব ধরে ধরে কাজ করছি। সব মিলিয়ে শহুরে গল্পের বাইরে একদম গ্রামের কাহিনি নিয়ে ভালো একটা কাজ হচ্ছে।
প্রশ্ন: আনন্দবাজার পত্রিয়ায় দাবি করা হয়েছে, জয়া আহসান, মিথিলা, বাঁধনদের কারণে বেকার হয়ে যাচ্ছে কলকাতার নায়িকারা। এ ব্যাপারে আপনার ধারনা কি?
রজতাভ দত্ত: বোগাস কথাবার্তা। এ ধরনের রিপোর্টেরই কোনো ভিত্তি নেই। দেখুন, আনন্দবাজার তো কত কিছুই বলে, তাতে কি যায় আসে। ওরা তো বাংলা সিনেমা নিয়ে কখন ভালো কথা বলে না। সবসময় বলিউড, হলিউড নিয়ে মেতে থাকে। কে কোথায় গোসল করলো, কার কি হলো না হলো। বাংলা সিনেমা নিয়ে সব উল্টা-পাল্টা সংবাদ। তাদের রিপোর্ট নিয়ে আমি বলতে নারাজ। আমার কথা হলো যে যোগ্য তার কাজ কেউ কেড়ে নিতে পারে না। যারা মেধাবী তারা সবসময় সব জায়গায় কাজ কারবে, এগিয়ে থাকবে। জয়া আহসান দুর্দান্ত একজন শিল্পী। তার কাজ নিয়ে বলার কিছু নেই। দর্শক তাকে চাইছে। সেজন্যই পরিচালকরা তাকে নিচ্ছেন। যতদিন চাইবে নেবেন। এটা নতুন কিছু নয়। অনেক আগে থেকেই দুই বাংলার শিল্পীরা এপার ওপার করে কাজ করেছেন। কারণ বাংলা ভাষা আমার কথা বলি। আমাদের সাংস্কৃতিক আচারও প্রায় এক। এখান থেকে অনেকই কলকাতায় তুমুল জনপ্রিয়। জয়া ও মিথিলা ভালো করছে। বাঁধন গেল সম্প্রতি। আর চঞ্চল চৌধুরী, মোশাররফ করিম দারুণ জনপ্রিয় কলকাতায়। ওদের সিরিজগুলো খুব ভালো চলেছে। দর্শক পছন্দ করেছেন। ভবিষ্যতেও কাজ করবেন।
প্রশ্ন: ২-৩ বছর আগে যৌথ প্রযোজনায় প্রচুর ছবি হয়েছে। এখন যৌথ প্রযোজনা ছবির বিষয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় একটা শিথিলতা এসেছে। যার কারনে দুই বাংলার ছবি নির্মাণ কমে গেছে। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখেন?
রজতাভ দত্ত: নানা কারণে যৌথ প্রযোজনার বাজারটি জটিল হয়ে উঠেছে। এটা রাষ্ট্রীয় নীতিমালার ব্যাপার। আমার বলা উচিত না। আমি শিল্পী মানুষ। চেষ্টা করি অভিনয় করার। আমি বলতে পারি যে এত জটিলতা হওয়া উচিত নয়। আমরা কাজ করতে চাই। যৌথ প্রযোজনা কিন্তু দুই বাংলার সিনেমার জন্যই অনেক ইতিবাচক।
প্রশ্ন: অভিযোগ আছে যৌথ প্রযোজনার সিনেমার ক্ষেত্রে কলকাতার গণমাধ্যম নিরব থাকে। ওপারে খুব বেশি সিনেমা হলেও ছবিগুলো মুক্তি পায় না। এ ব্যাপারে রজতাভ দত্তের মতামত কি?
রজতাভ দত্ত: এটা হচ্ছে যারা বাজার বিশ্লেষণ করে তাদের ব্যাপার। গণমাধ্যমের প্রচারকে আমি গুরুত্ব দিতে চাই না। তবে সিনেমার বাজার অবশ্যই বিস্তৃত করা উচিত। নইলে তো উদ্যোগটা নষ্ট হয়।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের মতো কলকাতার সিনেমার বাজারও টালমাটাল অবস্থা। সেই সঙ্গে কমার্শিয়াল সিনেমা নিয়ে আপনার মতাতম কি?
রজতাভ দত্ত: ‘সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের রুচি বদলেছে। ভাবনা বদলেছে। চাহিদাও বদলেছে। লোকে এখন আর নায়ক-নায়িকার প্রেম, হিরো ভিলেনকে মেরে ফাটিয়ে দিচ্ছে- এসব দেখতে চায় না। তারা এখন সব গল্প ও চরিত্রে নিজেকে, নিজের প্রিয়-চেনাজানা মানুষদের রিলেট করতে চায়। যারা সে ধরনের ছবি বানাতে পারছেন তারাই এখন সফল হচ্ছেন। এখন সিনেমাটা চলে গেছে উরবান মানে শহুরে দর্শক অথবা সেই মেজাজের দর্শকদের নিয়ন্ত্রণে। তারা নিজেদের গল্প দেখতে চান। জীবনের বাস্তবতা খুঁজে ফেরেন। এজন্য ভিন্ন ধারার শহুরে আমেজের সিনেমাগুলো ভালো চলছে। তাছাড়া এখানে মাল্টিপ্লেক্সেরও একটা অবদান আছে। কমার্শিয়াল সিনেমাগুলো কিন্তু মাল্টিপ্লেক্সে খুব একটা চলে না। চললেও সেগুলো সাফল্য পায় না। এসব সিনেমা বেশি মুক্তি পায় নরমাল হলগুলোতে। সেগুলো অবস্থা, পরিবেশ এতো বাজে যে দর্শক যেতে চায় না। দর্শক এখন হাতের মুঠোয় সিনেমা পাচ্ছে। সকালে জাপানি, দুপুরে ফরাসি দেখে এসে রাতে একটা বাংলা ছবি খুঁজছে। বা পরিবার-বন্ধুদের নিয়ে দলবেঁধে মাল্টিপ্লেক্সে গিয়ে মজা করে একটা সিনেমা দেখছে। একটা উরবান সিনেমা অল্প খরচে বানিয়ে অল্প কটা মাল্টিপ্লেক্সে বানিয়ে মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে। কি দরকার এত হাঙ্গাম করে সিনেমা বানিয়ে এত প্রেশার নিয়ে লস গোনার। এগুলো ভাবতে হবে। সবার সমন্বয় না থাকলে হবে না।
প্রশ্ন: দুই বাংলায় একটা ‘ফাটাকেষ্ট’ যে পরিমাণে বিপ্লব ঘটিয়েছিলো। সব শ্রেণির মানুষ এই ছবিটি দেখেছে। এতোদিন চলে গেলো কিন্তু আরেকটা ‘ফাটাকেষ্ট’ কেন হয়নি?
রজতাভ দত্ত: যখন ‘ফাটাকেষ্ট’ নির্মাণ হয়েছে তখন এতো মাল্টিপ্লেক্স ছিলো না। মানুষ তখন এতো বেশি বিদেশ যেতো না। যারা বিদেশ যেতে পারতো না তারা সিনেমা হলে গিয়ে তাদের সেই ইচ্ছেটা পূরণ করছে। আমরা ছোট বেলা যে ব্যাটম্যান দেখেছি এখন যদি নোলানের ব্যাটম্যান দেখেন- তারও সুপার হিরোই করছে। কিন্তু তারা বাস্তবের একটা সেভ দেওয়ার চেষ্টা করছে। সেইটা বাংলায় এখনো করে ওঠা যায়নি। ‘ফাটাকেষ্ট’ হয়েছিলো ‘ফাটাকেষ্ট’ যখন নতুন ছিলো। এখন যদি আপনি ‘ফাটাকেষ্ট’ দেখতে যান তখন দেখবেন ‘ফাটাকেষ্ট’র ৪০টা কপি আপনি দেখেন। এখন ‘ফাটাকেষ্ট’ যাকে দিয়েই করান, যতো ভালোকরেই করান তা হবে না। নতুন কিছু করতে হবে।
প্রশ্ন: অভিনয়ের দীর্ঘ ক্যারিয়ার আপনার। নিজের কাজের তৃপ্তি কতটুকু আর স্বপ্নের এমন কোনো চরিত্র, যেটিতে এখনো কাজ করা হয়নি?
রজতাভ দত্ত: শিল্পী কখনো তৃপ্ত হয় না। এটাই শিল্পের ধর্ম। আর আমি ভাই কখনো অভিনয় করবো সেই স্বপ্নটাই দেখিনি। তাই যে কাজগুলো করেছি সবগুলোই আমার কাছে স্বপ্নের মতো। সেই ছোটবেলায় এক ম্যাজিশিয়ান দেখেছিলাম হাতের তুড়িতে সব বদলে দিচ্ছে। সবাইকে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে। তখন থেকেই ভাবতাম এমন করে সবাইকে অবাক করে দেয়া যায় কিছু করতে হবে। সেটা করার চেষ্টায় অভিনয়ে এসে গেলাম। কোনোদিন ভাবিনি আমি অভিনেতা হবো। হয়ে গেলাম এবং অভিনয় করে যাচ্ছি। আমি উপভোগ করছি।
ইত্তেফাক/বিএএফ