জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছাড়া গণতন্ত্র হয় না

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির নিজ পদে বহাল থাকিতে হাতে সময় ছিল মাত্র ছয় মাস। কারণ বিধানসভা নির্বাচনে নিজের পরাজয়ের পর মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ গ্রহণের ছয় মাসের মধ্যে তাহাকে যে কোনো একটি উপনির্বাচনের মাধ্যমে জয়ের বৈতরণি পার হইতেই হইত। সেই উপনির্বাচনে জয়ের শেষ দিনক্ষণ ছিল ৫ নভেম্বর। তবে করোনার কারণে গোটা ভারতের ৩১টি বিধানসভা কেন্দ্র ও তিনটি লোকসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচন বকেয়া থাকিলে মমতার দলের বিশেষ অনুরোধে দেশটির নির্বাচন কমিশন মমতার জন্য তাহার নির্দিষ্ট ভবানীপুর কেন্দ্রের উপনির্বাচন ঘোষণা করিয়াছিল গত মাসেই। আরো দুইটি কেন্দ্রে বিধানসভা নির্বাচনের সময় প্রার্থী মারা যাওয়ায় একই সঙ্গে তিনটি কেন্দ্রের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইয়াছে গত ৩০ সেপ্টেম্বর। গতকাল ইহার ফল ঘোষণা করা হইয়াছে এবং প্রত্যাশামতো মমতা ব্যানার্জি বিপুল ভোটের ব্যবধানের তাহার নিকটতম বিজেপি প্রার্থী প্রিয়াঙ্কার বিরুদ্ধে জয়লাভ করিয়াছেন। বাকি দুইটি কেন্দ্রেও জয় পাইয়াছে তৃণমূল কংগ্রেস।

মমতার মুখ্যমন্ত্রিত্ব টিকাইয়া রাখিবার জন্য ৫ নভেম্বরের পূর্বে উপনির্বাচন হইবে কি না—উহা লইয়া ব্যাপক সংশয় ছিল। তৃণমূলের অভিযোগ ছিল, পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দল বিজেপি কিছুতেই চাহিতেছিল না যে, এখনই উপনির্বাচন হউক। তবে পর্যবেক্ষক মহল মনে করে, ভারতের নির্বাচন কমিশনের চমত্কার দলনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি রহিয়াছে। মমতার কেন্দ্রে উপনির্বাচন প্রদানের ভিতর দিয়া সেই দলনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি আরো শানিত হইয়াছে। প্রকৃতপক্ষে, একটি দেশের গণতন্ত্রের শক্তির অন্যতম প্রধান দিক হইল—দেশটির নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা। ভারতে নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করা হইলেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্তৃত্ব নিজের হাতে লইয়া থাকেন। নির্বাচন কমিশনের হাতে অবাধ্য বা অমান্যকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের শাস্তির ক্ষমতা, বদলি করিয়া দেওয়ার শক্তি থাকে এবং কমিশন তাহা পালনও করিয়া থাকে। লক্ষণীয় বিষয় হইল, ভারতেও ক্ষমতাসীন সরকারের সুপারিশেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দিয়া থাকিলেও দেশটির রাজনৈতিক নেতাদের প্রজ্ঞা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির ভিত শক্ত থাকিবার কারণে নির্বাচন কমিশন আস্থার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হইয়াছে। তাহা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কারণে সেইখানে কেন্দ্র ও রাজ্যে ভিন্ন ভিন্ন দল ক্ষমতায় থাকিবার ভিতর দিয়া একটি ভারসাম্যও তৈরি হইয়া থাকে।

কিন্তু এই সকল প্রশাসনিক ব্যাপার-স্যাপারের সহিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আরো একটি বিষয় আমরা লক্ষ করিতে পারি। তাহা হইল—নির্বাচনের প্রচারণা, রিগিং কিংবা ছাপ্পা ভোট প্রতিহত করিতে বুথ পাহারায় দেশটির জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করিয়া থাকে। বিশেষ করিয়া পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনসমূহে জনগণের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো অপ্রতিরোধ্য। মমতার উপনির্বাচনে ভোট কম পড়িয়াছে বলিয়া বলা হইতেছে, কিন্তু এই কম ভোট কাস্টিংয়ের ভিতরেও মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, উল্লাস ও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করিবার যেই শরীরী ভাষা আমরা টেলিভিশনের পর্দায় দেখিতেছি, তাহাতে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায়—গণতন্ত্রের জন্য সাধারণ মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণ অপরিহার্য। সেইখানে কেন্দ্র-রাজ্য মিলাইয়া ত্রিস্তর নিরাপত্তা থাকিলেও যখন ভোটের বাজারে হাওয়া গরম হয়, তখন যে কোনো পক্ষের সমর্থকদের শীর্ণ-দুর্বল একজন নারীও তেজস্বিনী রূপ ধারণ করিয়া থাকেন। ইহার সহিত আমরা দেখিয়াছি—ভোট এখন হইবে কি হইবে না, ভোট না হইলে সাংবিধানিক সংকট দেখা দিবে কি দিবে না, কোন কাজটা উচিত কিংবা অনুচিত হইয়াছে—এই সকল বিষয় লইয়া যে কোনো দল যখন-তখন উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হইয়া থাকে। ইহার একটি বিচারিক মীমাংসাও আমরা দেখিতে পাই। তাহাতে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলি নিজেদের সংশোধন করিতেও কালবিলম্ব করে না। অর্থাত্ সকল দিক মিলাইয়া গণতন্ত্রের চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের গুরুত্বপূর্ণ দিক কখনই উপেক্ষিত হয় না।

সুতরাং তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির ক্ষেত্রে স্পষ্ট করিয়া বলা যায়, যতক্ষণ অবধি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ না ঘটিতেছে, ততক্ষণ অবধি সেই দেশে গণতন্ত্র শক্তিশালী হইবে না। নিজের ভোট নিজে দিতে না পারিলে ঘরে বসিয়া উহা লইয়া আক্ষেপ করিবার মাধ্যমে মস্তিষ্ক গরম করা যায় শুধু, ভোটের হাওয়া গরম করা যায় না। ছাপ্পা ভোট, রিগিং কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিংও আটকানো যায় না। অর্থাত্ তৃতীয় বিশ্বের যে কোনো দেশে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছাড়া গণতন্ত্রের মরা গাঙে জোয়ার আসিতে পারে না।