চমকে ওঠার মতো একটি ছবি। এই ছবি কথা না বলেও অনেক কথা বলে দিয়েছে। ছবিটিতে দেখা যায়, একজন নারী শিক্ষক তার অবুঝ শিশুটিকে পিঠের ওপর পোশাকের কোটরে বসিয়ে রেখে ক্লাস নিচ্ছেন, হাসিমুখে ব্ল্যাকবোর্ডে লিখছেন।
শিশুটি নিশ্চিন্তে ঘুমুচ্ছে মায়ের পিঠে মাথা এলিয়ে দিয়ে। ক্যালেন্ডারপিডিয়ার এই ছবি বর্তমানে চলমান অতিমারিতে একজন নিবেদিত শিক্ষকের আত্মনিবেদিত অবদানের কথা তুলে ধরেছে। আত্মনিবেদিত শিক্ষক এমনই হয়। হয়তো ভিন্নভাবে, ভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভঙ্গিতে। কিন্তু নিবেদন একটাই, নিজের কষ্ট ভুলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞান বিলানো।
৫ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী পালিত বিশ্ব শিক্ষক দিবসে এমনতরো শিক্ষকদের কথা বিবেচনায় রেখেই সম্ভবত ইউনেসকো এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করেছে ‘শিক্ষকেরাই শিক্ষা পুনরুদ্ধারের কেন্দ্রবিন্দুতে’। এই স্লোগানের মর্মার্থ একেবারেই সহজ। অতিমারিতে বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে মূল ভূমিকা পালন করতে হবে শিক্ষকদেরই।
বিশ্বের অনেক দেশে বিশ্ব শিক্ষক দিবসটি ৫ অক্টোবর পালন করা হলেও দিনটি কিন্তু সরকারি ছুটির দিন নয় এবং একই তারিখে অনেক দেশে পালন করাও হয় না। ঐচ্ছিকভাবে স্বতঃস্ফূর্ততার সঙ্গে পালন করা হয় বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকমের আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায় কয়েকটি দেশের কথা। স্কুল ছুটির দিন হওয়ায় অস্ট্রেলিয়া দিবসটি পালন করে অক্টোবরের শেষ শুক্রবার (যেমন এ বছর হবে ২৯ অক্টোবর)।
পূর্ব ইউরোপের কয়েকটি দেশে পালন করা হয় অক্টোবরের প্রথম রবিবার আর আরব বিশ্বের ১১টি দেশ দিবসটি পালন করে ২৮ ফেব্রুয়ারি। কোনো কোনো দেশ জাতীয় শিক্ষক দিবসের সঙ্গে মিল রেখে আন্তর্জাতিক শিক্ষক দিবসের আয়োজন করে। কোনো কোনো দেশ ভিন্ন নামেও দিবসটি পালন করে থাকে। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বলা হয় ‘শিক্ষক প্রশংসা দিবস’ (টিচারস্ এপ্রিশিয়েশন ডে)। পালন করা হয় মে মাসের প্রথম সপ্তাহের মঙ্গলবার।
শিক্ষক সমাজের অতুলনীয় অবদানের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ১৯৯৪ সালের ৫ অক্টোবর থেকে ইউনেসকোর অনুপ্রেরণায় পালিত হয়ে আসছে বিশ্ব শিক্ষক দিবস (আন্তর্জাতিক শিক্ষক দিবস হিসেবেও পরিচিত)। ১৯৯৬ সালের ৫ অক্টোবর ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ শীর্ষক সম্মলনে গৃহীত এবং ইউনেসকো ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠন (আইএলও) কর্তৃক স্বাক্ষরিত সুপারিশমালায়ও শিক্ষক দিবস পালনের জন্য ৫ অক্টোবর তারিখটি নির্ধারিত হয়।
দিনটি শিক্ষকদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের দিন, তাদের অবদানকে স্মরণ করার দিন, তাদের মর্যাদাকে স্মৃতির অতলান্তে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচানোর দিন। শতাধিক দেশ বিশ্ব শিক্ষক দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে পালন করে আসছে। কোনো কোনো দেশ এই দিবসে বিশেষ পোস্টাল স্ট্যাম্প ইস্যু করে দিবসটির মর্যাদাকে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে, যেমনটি করেছিল কানাডা সরকার ২০০২ সালে সামষ্টিকভাবে স্কুল শিক্ষকদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার লক্ষ্যে।
দিবসটিতে শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন রকমের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়, যেমন কবিতা আবৃত্তি, সংগীত পরিবেশন, ছাত্রশিক্ষক মিলে খেলায় অংশগ্রহণ, দুই পক্ষ একত্রে ছবি আঁকার প্রতিযোগিতায় বসে হাস্যরস করার মাধ্যমে প্রিয় শিক্ষকদের আনন্দিত করা, আরো কত কী! এই দিনে শিক্ষার্থীরা বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষকদের কাছে উপহার পাঠায়, মেসেজ পাঠিয়ে প্রশংসা করে, হাতে লেখা শুভেচ্ছা কার্ড পাঠিয়ে শ্রদ্ধা জানায়। সবকিছুর উদ্দেশ্য দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখা।
অতিমারিকালীন শিক্ষকদের নিবেদিত ও কঠোর পরিশ্রমের প্রতি সম্মান প্রদর্শনপূর্বক ইউনেসকো কর্তৃক নির্ধারিত প্রতিপাদ্যটি ‘টিচার্স অ্যাট দ্য হার্ট অব এডুকেশন রিকভারি’ দিয়ে বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, শিক্ষকদের গুরুত্ব দিয়েই অতিমারিতে মুখ থুবড়ে পড়া শিক্ষাব্যবস্থাকে সব দেশেই আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। শিক্ষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করা হলে শিক্ষাব্যবস্থার ধসে যাওয়া ভিত পুনর্নির্মাণ করা যাবে না। আর এর জন্য দরকার হবে দুনিয়াভর যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের প্রকট অভাবের বিষয়টি মাথায় রেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ।
দুই বছর আগের এক হিসাবে দেখা যায়, ২৬৪ মিলিয়ন শিশু আর কিশোরের অবস্থান শিক্ষাজগতের বাইরে। অতিমারির কারণে নিশ্চয়ই এই সংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে, যা আমরা এখনো জানি না। ২০৩০ সালের মধ্যে সার্বজনীন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার লক্ষ্য অর্জন করার জন্য প্রয়োজন ৬৯ মিলিয়ন নতুন শিক্ষক। শিক্ষকের শূন্যতা বেশি অধিকারবঞ্চিত জনগণ যথা প্রতিবন্ধী শিশু, মেয়েশিশু, যুদ্ধের শিকারসহ অন্যান্য শরণার্থী, অভিবাসী শিশু-কিশোর-তরুণ আর গ্রামেগঞ্জে, দূরদূরান্তে ও শহরের বস্তিতে বসবাসরত শিশুদের এলাকায়। এই বিশাল ঘাটতি পূরণ করতে হলে সচেতনতা বাড়াতে হবে সর্বমহলে, বিশ্বব্যাপী।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে উজ্জ্বল করতে হবে এই মহান পেশাকে, সর্বদিক থেকে—সম্মানে, ক্ষমতায়নে, প্রণোদনায়, স্মরণে আর প্রশংসায়—শুধু এই দিনেই নয়, বছরের প্রতিটি দিনে। নিশ্চিত করতে হবে যোগ্য শিক্ষকদের সব রকমের শিক্ষামূলক পরিকল্পনায় জড়িত করার বিষয়টিকে, যাতে তাদের সম্মান আর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হয়।
বাংলদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ অন্যান্য দেশের মতোই করোনা মহামারিতে তীব্র সংকটে নিপতিত। তাই বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন শিক্ষক সমাজের সঙ্গে মিলেমিশে তাদের সহযোগিতা নিয়ে সুচিন্তিত পরিকল্পনা গ্রহণ, যাতে শিক্ষা পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়। শিক্ষাবান্ধব প্রধানমন্ত্রী আর শিক্ষামন্ত্রীর সরাসরি উদ্যোগে ধীরে ধীরে শিক্ষাব্যবস্থা পুনরুজ্জীবনের কার্যক্রম চলছে।
সীমিত আকারে হলেও স্কুল খুলেছে। ক্রমান্বয়ে অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও খুলবে। জীবন পাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। তবে সমৃদ্ধ জাতি গঠন করতে হলে আর ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জন করতে হলে শিক্ষকসমাজের সুবিধা-অসুবিধাগুলো বিবেচনায় আনতে হবে। বিশেষ করে করোনার কারণে যেসব বেসরকারি শিক্ষক দুর্দশায় পতিত হয়েছেন, তাদের বিশেষ প্রণোদনার আওতায় আনা জরুরি।
প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা, টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল শিক্ষা আর মাদ্রাসা শিক্ষাসহ সর্বত্রই মর্যাদা আর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে, যদি আমরা মর্যাদাবান জাতি হিসেবে এগিয়ে যেতে চাই সামনের দিকে, উনিশ বছরের মধ্যে শামিল হতে চাই উন্নত দেশের কাতারে। মর্যাদার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকদের মানোন্নয়ন করতে পারলেই নিশ্চিত হতে পারে শিক্ষার সার্বিক গুণমান। এসব করার জন্য সিস্টেম লেভেলে থাকতে হবে চিন্তা আর দৃষ্টিভঙ্গির অগ্রসরমানতা; বৈষম্য ও বঞ্চনার বেড়াজাল থেকে শিক্ষকদের বের করে আনার মনমানসিকতা; শিক্ষাব্যবস্থার সকল পর্যায়ে মর্যাদা আর সুযোগ-সুবিধার সমতাবিধানের বিচক্ষণতা।
কোভিড মোকাবিলার মাধ্যমেই হতাশ না হয়ে সর্বাত্মক উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে সামনের দিকে। বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা-ভাবনার সঙ্গে সংগতি রেখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাষ্ট্র বিনির্মাণের দর্শন অনুসরণ করে শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন রূপে সাজিয়ে তোলা জরুরি। আর এসবের জন্যই প্রয়োজন হবে শিক্ষাসংক্রান্ত সব রকমের পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় শিক্ষকদের কিন্দ্রবিন্দুতে রাখার।
দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা যেসব শিক্ষক অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সমতাভিত্তিক মানসম্পন্ন শিক্ষা আর সবার জন্য জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ বিকাশের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন, সেসব নিবেদিত শিক্ষকের অবদানকে সম্মানিত করাই একুশের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের অঙ্গীকার হোক।
লেখক: শিক্ষাবিদ, সাবেক উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি)
ইত্তেফাক/এএএম