সংস্কৃতি একটি জাতি ও রাষ্ট্রের দর্পণস্বরূপ। এই সংস্কৃতির মাধ্যমেই একটি জাতি ও রাষ্ট্র বিশ্বদরবারে তাদের গৌরব ও ঐতিহ্য তুলে ধরতে পারে। কিন্তু বর্তমানে আমরা নিজস্ব সংস্কৃতি ভুলে ভিনদেশি সংস্কৃতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। সমাজসভ্যতার অনেক বিকাশ ঘটেছে। মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার ক্ষেত্র অনেক প্রসারিত হয়েছে। অজানাকে জানার অনেক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বিজ্ঞান তথা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি বা অবাধ তথ্যপ্রবাহের বদৌলতে। বিজ্ঞানের এই অভূতপূর্ব সাফল্য মানুষের দৈনন্দিন জীবনে অনাবিল প্রশান্তি যেমন এনে দিয়েছে, তেমনি এই প্রযুক্তি মানবিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধগুলো এবং নৈতিকতাকে দিনদিন অন্ধকারের অতল গহ্বরে তলিয়ে দিচ্ছে। বিজাতীয় অপসংস্কৃতির তাণ্ডবলীলায় হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ। উনিশ শতকের বাংলায় পাশ্চাত্য সংস্কৃতি উদ্দাম ভোগবিলাসিতা ও উচ্ছৃঙ্খলতার জন্ম দেয়। নতুন সংস্কৃতির উন্মত্ততায় সে সময় যে অনাচার ও উচ্ছৃঙ্খলতা দেখা দিয়েছিল, সেগুলো বর্জন করে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সদর্থক ইতিবাচক দিকগুলো গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন সমাজ সংস্কারক বাঙালি মনীষীরা।
আকাশ সংস্কৃতির এই যুগে কিছু কিছু টিভি চ্যানেলে এমন কিছু অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়, যা সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। পশ্চিমা ও ভারতীয় সংস্কৃতির ক্রমবর্ধমান আধিপত্যে বাংলাদেশের সংস্কৃতি আজ হুমকির মুখে। গণমাধ্যম থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র, ভার্চুয়াল মিডিয়া, সংগীত এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজাতীয় সংস্কৃতির আধিপত্য প্রচার করা হচ্ছে। প্রতিবেশি দেশের সিরিয়ালের ভয়াল থাবা যেন পুরো দেশকে গ্রাস করে ফেলেছে। টিভি সিরিয়ালের বিষয়বস্তুগুলো মনের অজান্তেই তাদের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। এর ফলে বর্তমানে আমাদের দেশে পরিবারগুলোর ভেতরে পারিবারিক সংঘাত অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশে কোরিয়ান সংস্কৃতির অনেক ভক্ত নাটক বা মিউজিক ভিডিওতে দেখা পছন্দের তারকাকে বাস্তব জীবনে অনুকরণ করে থাকে। তরুণদের বড় একটা অংশ বর্তমানে তাদের মতো করে জীবনধারায়ও পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে। ফলে বাংলাদেশে কোরিয়ান প্রসাধনী ও সৌন্দর্য পণ্যগুলোর চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কোরিয়ান সংস্কৃতি নতুন একটি পরিবেশের সঙ্গে সহজেই খাপ খাইয়ে নেয়, স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে কোরিয়ান তরঙ্গ মিশে এমন একটি হাইব্রিড (মিশ্র) সংস্কৃতি গড়ে তুলছে। সাংস্কৃতিক বিনিময়ের নামে তা যদি হয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, প্রশ্রয় দেওয়া হয় অপসংস্কৃতিকে আর এর বিরূপ প্রভাবে ধ্বংসের দিকে ধাবিত হয় দেশের তরুণ প্রজন্ম। তবে তা কোনো মতেই মেনে নেওয়া যায় না। ভালো কিছু গ্রহণ করতে কারোরই আপত্তি থাকার কথা নয়, কিন্তু অবাধে অপসংস্কৃতি প্রবেশে সব দ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়ার পক্ষেও কেউই সায় দেবে না। আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসনের ফলে আমাদের সংস্কৃতির মূল প্রাণ লোকসংস্কৃতি আজ হুমকির মুখে। আমরা বিদেশের সঙ্গে সংস্কৃতির আদান-প্রদানের বিরুদ্ধে নই, কিন্তু আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সমুন্নত রেখে তা করার পক্ষে। একটি জাতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য সাংস্কৃতিকভাবে আঘাত হানাই যথেষ্ট। আমাদের বিভিন্ন সামাজিক, পারিবারিক উত্সবগুলোতেও বিদেশি সংস্কৃতির ব্যাপক প্রভাব দেখা যায়। ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টমিনস্টারের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বিষয়ের অধ্যাপক দায়া কিষান থুসু তার media on the move বইয়ে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে প্রকাশিত বা প্রচারিত এসব গণমাধ্যমের প্রবাহকে Dominant Flow বা প্রভাবশালী প্রবাহ বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং এর মাধ্যমে সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদতত্ত্বেরই পুনরাবৃত্তি ঘটেছে, এখনো পশ্চিমা বিশ্বের উন্নত দেশগুলোই সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আধিপত্য বিস্তার করে যাচ্ছে।
আমাদের নতুন প্রজন্মসহ সব মানুষকে নিজের কৃষ্টি-সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সম্বন্ধে জানতে হবে, লালন করতে শিখতে হবে, অপরকে জানাতে ও শেখাতে হবে। দেশীয় সংস্কৃতি রক্ষার জন্য প্রয়োজন এর ব্যাপক প্রচার ও প্রসার। ভোগবাদী নগর সংস্কৃতির প্রবণতা ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর আগ্রাসী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে লোকসংস্কৃতিকে মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। ঐতিহ্যের শেকড় থেকে পুষ্টি সংগ্রহের মধ্য দিয়ে জাতিগত বিকাশের পথ খুঁজে বের করতে হবে এবং সব অশুভ শক্তিকে মোকাবিলা করতে হবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
ইত্তেফাক/কেকে